এককালে গীবতের প্লাটফর্ম সেকেলে ছিল।এখন অনেকটা আপডেট হয়ে জায়গা করে নিয়েছে ভার্চুয়াল জগতে।আগে গীবত করতে অনেকটা শ্রম করতে হতো বললেই চলে,প্রথমে সবাই মিলেমিশে গোল হয়ে বসা,আরও কয়েকজনকে নিয়ে চায়ের দোকানে মজলিশ বসানো কিংবা বাড়ির উঠোন আর ছাদেই মহিলাদের গল্পের আড্ডায় মেতে উঠার মাঝেই ছলে বলে শয়তান মুখ দিয়ে গীবত করানোর কথা নতুন তো নয়..!
-অনেকেই বলেন আমিতো গালি দিচ্ছিনা,মিথ্যাও বলছিনা,হক কথা না বললে হয় নাকি,সবাইকেতো জানাতে হবে,সতর্ক করতে হবেতো নাকি....
-গীবতের মূল সজ্ঞাটাই হলো- অন্যের অনুপস্থিতিতে এমন কিছু বলা,যা সে উপস্থিত থাকলে শুনে কষ্ট পেত।এবার যত ভদ্র ভাষায় বলুন,মার্জিত করেই বলুন,ডিরেক্ট না হোক ইশারাতেই বলুন সেটা গীবত বলেই গন্য হবে।
-দুঃখের বিষয় সেটার জন্য আর মজলিস দরকার হয়না,চায়ের দোকানে ভিড় করতে হয়না,বাড়ির উঠোন বা ছাদেও মেয়েদের একত্রিত হতে হয়না।এখন সব আপডেট হয়ে সহজ হয়ে গেছে।
- ফেসবুকে কয়েক হাজার ফ্রেন্ড,আর আপনি অন্যকারও বিরুদ্ধে পোস্ট করছেন,যেটা আপনি না করলেও হতো,যার উদ্দেশ্য করলেন হয়তো সে তা দেখেনি পর্যন্ত।তবে বাকি ফ্রেন্ডরা শত শত হাহা রিয়েক্ট দিচ্ছে,কমেন্ট বক্সে কটুক্তি করছে,তাকে নিয়ে অকথ্য মন্তব্য, উপহাস করছে,আপনিও মজা নিয়ে কমেন্টের রিপ্লাই দিচ্ছেন।ফেসবুকে তুলকালাম করছেন নিজের টাইমলাইনে।অথচ আপনার মস্তিষ্কে এখন পর্যন্ত ডুকেইনি আপনি গীবত করে তার হক নষ্ট করছেন।আপনার যুক্তি হলো সে অপরাধ করেছে তা বললে দোষ কি,সে যেমন তাকেতো তেমনি বলব,এরকম বলা জায়েজ আছে আরও কত কি..!!
- আসলেই কি জায়েজ হচ্ছে আপনার জন্য? নাকি নেক সুরেতে শয়তানের ধোঁকায় নিপতিত হচ্ছেন..!
আজ যদি তাকে সংশোধনের উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে না বলে তাকেই বলতেন তাহলে হয়তো কাজে আসত।এরপরও যদি সে মানে,না বুঝে,আপনি ব্যার্থ হোন তাহলে আল্লাহর কাছে তার জন্য বা তাদের জন্য দোয়া করবেন।আপনার দায়িত্ব এখানেই শেষ।কিন্তুু তাদের না বুঝিয়েই আপনি তাদের কথা ভার্চুয়াল জগতে নেগেটিভ ভাবে প্রচার করেন তাহলে কি আপনার সওয়াব হবে?সাদাকা হবে?নাকি গীবতের গুনাহ হবে?ভেবে দেখেছেন?
তারা না বুঝলে আপনার দায়িত্ব সেখানেই শেষ।আল্লাহর উপর ছেড়ে দিবেন।এর থেকে বেশী আলোচনা করার কোনো অধিকার নেই আপনার।ইসলাম আপনাকে সেই অধিকার দেয়নি।
-অনেকেই বলেন কিছু ক্ষেত্রে গীবত করা জায়েজ আছে।
জ্বি আছে,কিন্তুু সেটা কি আপনার জন্য নাকি নির্দিষ্ট কিছু ব্যাক্তি-বর্গের জন্য?
[•] ছয়টি ক্ষেত্রে গীবত জায়েজ....
১- জুলুম থেকে বাঁচতে, অন্যকে বাঁচাতে। এমন ব্যক্তির কাছে গীবত করতে পারবে, যে এ বিষয়কে প্রতিহত করতে পারবে।
২- খারাপ কাজ বন্ধ করার জন্য সাহায্য চাইতে এমন ব্যক্তির কাছে গীবত করতে পারবে যিনি তা বন্ধ করার ক্ষমতা রাখেন।
৩- বিষয়টি সম্পর্কে শরীয়াতের সমাধান জানতে গীবত করে মূল বিষয় উপস্থাপন করা জায়েজ আছে। যেমন..বলা যে, অমুক ব্যক্তি আমার উপর জুলুম করেছে, তাই আমারও কি তাকে আঘাত করা জায়েজ আছে? ইত্যাদি......
৪- সাধারণ মুসলমানদের দ্বীনি ও দুনিয়াবী ধোঁকা ও খারাবী থেকে বাঁচাতে গীবত করা জায়েজ। যেমন সাক্ষ্য সম্পর্কে, হাদীস আসার ইতিহাস ও ইতিহাস বর্ণনাকারী সম্পর্কে, লেখক, বক্তা ইত্যাদি সম্পর্কে দোষ জনসম্মুখে বলে দেয়া, যেন তার ধোঁকা ও মিথ্যাচার থেকে মানুষ বাঁচতে পারে।
৫- প্রাকাশ্যে যদি কেউ শরীয়তগর্হিত কাজ করে, তাহলে তার খারাবী বর্ণনা করা এমন ব্যক্তির কাছে যারা এর দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচতে পারে। যেমন কেউ প্রকাশ্যে মদ খায়, তাহলে মানুষের সামনে তার সরাসরি বদনাম করা জায়েজ আছে। যেন এমন খারাপ কাজ করতে ভবিষ্যতে কেউ সাহস না করে।
৬- কারো পরিচয় প্রকাশ করতে। যেমন কেউ কানা। তার পরিচয় দেয়া দরকার। কিন্তু নাম কেউ চিনছে না। কিন্তু কানা বলতেই সবাই চিনে ফেলে। তখন কানা বলা বাহ্যিক দৃষ্টিতে গীবত হলেও এটা বলা জায়েজ আছে। এতে গীবতের গুনাহ হবে না।
[তাফসীরে রুহুল মাআনী- ১৪/২৪২, সূরা হুজরাত-১২]
- হকপন্থী আলেম ওলামরা সহ নির্দিষ্ট কিছু ব্যাক্তিরা এই সমালোচনা,বিরুদ্ধাচরন করতে পারবে।আপনার দায়িত্ব তাদের সাথে একমত হয়ে এক্যে ও প্রতিবাদে অটুট থাকা।যেনো তারা সমস্যা সমাধান বা সত্য প্রতিষ্ঠাতে জোড় হতে পারে।এটা আল্লাহর হুকুম,হাদিসের বাণী।
কিন্তুু আপনি সেটা করেননা।বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যা লক্ষণীয় সেটা হলো,দলাদলি,যেই দলকে সাপোর্ট করেন তার গুনগান যেই দলের বিরোধ করেন তার গীবত।অথচ আপনার দায়িত্ব হলো প্রকাশ্যে যে গীবত জায়েজ তাকে সমর্থন করে,এক্যজোড় হওয়া।কিন্তুু আমরা তা করিনা।টাইমলাইন কাঁপাতে নিজেই ফতোয়া দিয়ে বসি,ইচ্ছেমতো ঠাট্টা,বিদ্রুপ,কটাক্ষ, কটু কথা,উপহাস করে গুনাহ কামাই করি,তাও হকের পক্ষে নয়।তুচ্ছ বিষয় বস্তুুর জন্য,ব্যাক্তিগত ক্ষোভে’র জন্য।নিজের মতামত অন্যদের সাথে না মেলার জন্য।ভার্চুয়াল জগতকে এখন ব্যাবহার করা হয় গীবতের প্লাটফর্ম হিসাবে।
কখনো ভেবে দেখেছেন আপনি যে পোস্ট করেছেন গীবত করার উদ্দেশ্য সে পোস্ট যতজন দেখে শুনে শেয়ার বা কপি করে নিজের টাইমলাইনে প্রকাশ করে গীবত করবে সেই গুনাহের জন্য আপনিও একটা ভাগিদার বা অংশীদার থাকবেন?ফেরেশতারা সবকিছু লিপিবদ্ধ করছে।আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন।সেদিন নিজের ভালো আমল গুলো অন্যকে দিয়ে দিতে হবে,আর ভালো আমল না থাকলে অন্যের বদ আমলের ভার নিতে হবে।পারা যাবেতো বদ আমলের ভার নেওয়া?
- আর বলে বেড়াই....
আমরাতো হক কথা বলছি।এটাই সত্য...
আসলে এটাই শয়তানের ধোঁকা।আপনার প্রতিটা কথার জন্য হিসাব নেওয়া হবে,আদম সন্তানের প্রত্যেক কথার মুল্য নির্ধারণ করা হবে।দৈনন্দিন ও প্রাত্যাহিক জীবনে হাত, পা,চোখ ছাড়াও ছোট মুখের বুলি প্রকাশ করে কত যে মানুষের হক নষ্ট করা হয়,কষ্ট দেওয়া হয়,ঠাট্টা, মশকারি,উপহাস করে গুনাহ কামাই করা হয় দুই কাঁধের ফেরেশতা আর আল্লাহ্ই জানেন।এমন যদি হয়ে থাকে তবে সুযোগ আছে,যাদের গীবত হয়েছে তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে,তা সম্ভব না হলে তাদের গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতে হবে এবং নিজেও আল্লাহর কাছে গীবতের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। পরবর্তীতে গীবত থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে।আর যদি ব্যাক্তি ভুলে যায় সে কাদের গীবত করেছিল বা মনে না থাকে তাহলে এভাবে পানাহ চাইতে হবে,...
আমি যতজনের গীবত করেছি তাদের সবাইকে ক্ষমা করুন সাথে আমাকেও।এতে গীবত থেকে দায়মুক্ত হওয়া সম্ভব।
- সবকিছুর ক্ষমা আছে,পদ্ধতি আছে।সেটা প্রয়োগ করতে হবে।ভার্চুয়াল জগতকে দ্বীনের খেদমতে কাজে লাগান।দ্বীনের বিরুদ্ধে বা মুসলিম ভাই-বোনদের হক নষ্টের জন্য অপব্যাবহার করবেননা।
|| ফরহাতে দিল মেহের ||
___________________________________
No comments:
Post a Comment