Saturday, May 15, 2021

ঈদে মেহদি রঙ্গে সাজ: কতিপয় ইসলামি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা


(মেহদি ব্যবহারের কতিপয় জরুরি নির্দেশনা-যা জানা জরুরি প্রতিটি নারীর)
▬▬▬◆◯◆▬▬▬

আমাদের বাঙ্গালী সমাজে মেহদি ছাড়া নারীদের ঈদ কল্পনা করা যায় না। মেহেদির রং যেন ঈদ উৎসবে আনে এক ভিন্ন মাত্রা। ছোট শিশু, কিশোরী, যুবতী, মধ্যবয়স্কা ইত্যাদি প্রায় সব নারীদের মধ্যে এর ব্যবহার দেখা যায়। তারা চুলে, হাতে, পায়ে, হাত বা পায়ের আঙ্গুলে এবং শরীরে বিভিন্ন স্থানে মেহদির মাধ্যমে বিভিন্ন নকশা অঙ্গন করে। বর্তমানে টিউব মেহেদির কল্যাণে খুব সূক্ষ্ম কারুকাজ করা হয়। যাহোক মেহদি সজ্জা আমাদের নারীদের এক চির চেনা রীতি। সত্যিকার আর্থে এই সাজসজ্জা ইত্যাদি নারীদের স্বভাবজাত প্রবণতা। ইসলামে তাতে নিষেধ করে না। তবে এ ক্ষেত্রে কতিপয় বিষয় লক্ষ রাখা জরুরি। যথা:

◈ ১) সাধারণ মেহদি, রং ইত্যাদি ব্যবহার করলে তাতে কোন সমস্যা নেই। কারণ এগুলো ব্যবহার করলেও ওযু-গোসলের ক্ষেত্রে অনায়াসে চামড়ায় পানি পৌঁছে যায়। তবে বর্তমানে বাজারে একপ্রকার কেমিক্যাল যুক্ত কৃত্রিম টিউব মেহদি পাওয়া যায় যা ব্যবহার করলে চামড়ার উপর একটা পাতলা আবরণ পড়ে। এতে ওজু-গোসলে সমস্যা হবে। তাই নামাজী নারীগণ অবশ্যই এসব মেহদি ব্যবহার থেকে দূরে থাকবে। কখনো ব্যবহার করলেও এগুলো অবশ্যই সাবান, শ্যাম্পু, কেমিক্যাল বা অন্য কোন উপায়ে তুলে ফেলতে হবে। অন্যথায় ওজু-গোসল শুদ্ধ হবে না।
তবে যে সব নারীদের সালাত নেই (যেমন: ঋতুমতী বা প্রসূতি মহিলা বা ছোট বাচ্চা) তাদের জন্য এগুলো ব্যবহারে সমস্যা নেই।

◈ ২) বাজারের মেহদি ক্রয়ের সময় তাতে হারাম বা ক্ষতিকারক ক্যামিক্যাল মিশানো আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া। কারণ বর্তমানে বাজারে এমন অনেক নকল মেহদি পাওয়া যায় যা ব্যবহার করলে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা তাতে নানা ধরণের চর্মরোগ সৃষ্টি হয়। হাতে মেহদির সুন্দর আল্পনা আঁকতে গিয়ে তা বীভৎস রূপ ধারণ করতে পারে।

 বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলেন, ‘সরাসরি মেহেদি গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করে যারা নিজেরা মেহেদি ব্যবহার করে তাদের এ ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি থাকে না। কিন্তু বাজারে নকল ও ভেজাল অনেক টিউব মেহেদি বেচা-কেনা হয়। এসবের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক মেহেদির লেশমাত্র থাকে না, বরং বিষাক্ত নানা রাসায়নিক রং দিয়ে এই মেহেদি তৈরি করে বাজারজাত করা হয়। এগুলোর মধ্যে এসিড জাতীয় ক্ষতিকর উপাদান থাকে, যা মানুষের ত্বক ঝলসে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে বাজারের সব মেহেদি ব্র্যান্ডই যে বিষাক্ত বা ক্ষতিকর তা ঢালাওভাবে বলা যাবে না। তবে দেখে-শুনে পরীক্ষিত ও ভালো ব্যান্ডের মেহদি ক্রয়ের চেষ্টা করতে হবে।
এ ক্ষত্রে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ পরামর্শ দিয়েছেন, একবারে পুরো হাত বা নির্দিষ্ট নকশা ধরে মেহেদি না লাগিয়ে শুরুতে সামান্য একটু মেহেদি কোথাও লাগিয়ে স্কিন টেস্ট করা যেতে পারে। যদিও এ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখতে না-ও পাওয়া যেতে পারে। অনেকের স্কিনে তাৎক্ষণিক ক্ষতির লক্ষ্মণ দেখা দিলেও, অনেকেরই ধীরে ধীরে কিংবা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পরেও ক্ষতি হতে পারে। তাই মেহেদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক ও সচেতন থাকা খুবই জরুরি। এ ছাড়া যাদের ত্বকে এলার্জির সমস্যা আছে তাদেরও মেহেদি পরিহার করা উচিত। 

◈ ৩) মেহদির মাধ্যমে ট্যাটু অঙ্গনের মত করে শরীরে অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীক, প্রাণীর ছবি, ড্রাগনের মাথা, প্রাণীর কার্টুন, নারী-পুরুষের ছবি, বয় ফ্রেন্ড-গার্ল ফ্রেন্ড এর নাম, অশ্লীল বাক্য ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় অথবা বিপরীত লিঙ্গের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মেহদি লাগানো জায়েজ নাই।

◈ ৪) অন্যে মহিলাকে মেহদি দ্বারা সাজানোর সময় তার লজ্জা স্থানের দিকে তাকানো বা তার স্পর্শকাতর স্থান স্পর্শ করা হারাম।

◈ ৫) যখন আপনি জানতে পারবেন যে, কোন মহিলা সাজগোজ করে পরপুরুষের সামনে প্রদর্শনী করে বেড়াবে তখন তাকে এ ক্ষেত্রে কোনও ধরণের সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না। অর্থের বিনিময়ে হোক বা বিনামূল্যে হোক। কারণ তা গুনাহের কাজে সহযোগিতার শামিল। অথচ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহায়তা করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّـهَ
“সৎকর্ম ও তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতির কাজে একে অন্যের সহায়তা কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর।” (সূরা মায়িদা: ২)
সুতরাং কারো ব্যাপারে যদি আপনি জানতে পারেন যে, সে হাতে মেহদি পরে সাজগোজ করে পরপুরুষের সামনে প্রদর্শনীয় করে বেড়াবে তখন তার হাতে মেহদি লাগিয়ে দেয়া আপনার জন্য জায়েজ হবে না। করলে গুনাহের কাজে সহযোগিতার কারণে গুনাহগার হবে হবে। আল্লাহ ঐ সকল মহিলাকে হেদায়েত করুন। আমিন।

▬▬▬◆◯◆▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড সেন্টার, সৌদি আরব

------------------------------
প্রশ্ন: ছেলেরা কি মেহেদী মাখতে পারবে,না কি মাখলে গোনাহ হবে?
▬▬▬🌐🕋🌐▬▬▬

উত্তর: পুরুষদের জন্য মেহেদি ব্যবহার করা জায়েজ নেই। কেননা এটা নারীদের বৈশিষ্ট্য। কাজেই পুরুষদের মেহেদি ব্যবহার করা হলে নারীদের সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করা হয়; যা ইসলামী শরীয়তের সম্পূর্ণরূপে হারাম। 

গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
হাদিস নম্বরঃ ৫৮৮৫

🧶 পুরুষের নারীর বেশ ধারণ এবং নারীর পুরুষের বেশ ধারণ প্রসঙ্গে। 

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সব পুরুষকে লা’নত করেছেন যারা নারীর বেশ ধরে এবং ঐসব নারীকে যারা পুরুষের বেশ ধরে। (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৪৫৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৩৫৩)

‘আমরও এরকমই বর্ণনা করেছেন। আমাদের কাছে শু‘য়বা এ সংবাদ দিয়েছেন।

হাদিসের মানঃ সহিহ।

ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বলেন,
‎قال في ( المجموع 1/352 ) : " أما خضاب اليدين والرجلين بالحناء فمستحب للمتزوجة للأحاديث المشهورة فيه وهو حرام على الرجال إلا لحاجة التداوي ونحوه , ومن الدلائل على تحريمه قوله صلى الله عليه وسلم : ( لعن الله المتشبهين بالنساء من الرجال ... ) الحديث " .
মেহেদী দ্বারা দুই হাত পা রঙ্গিন করা বিবাহিত নারীদের জন্য মুস্তাহাব। এই ব্যাপারে অনেক প্রসিদ্ধ হাদীস রয়েছে। তবে এটা পুরুষদের জন্য ঔষধ বা এজাতীয় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র ছাড়া সাধারণভাবে হারাম। হারাম হওয়ার অন্যতম দলিল হল রাসূল সাল্লাল্লাহু ইসলামের বাণী,
"আল্লাহর লা'নত সে সব পুরুষদের ওপর যারা নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।" (আল মাজমূ ১/৩৫২)
আল্লামা আব্দুর রহমান মোবারকপুরী রহিমাহুল্লাহ বলেন,
‎4- وجاء في ( تحفة الأحوذي 5/456 ) : " وأما خضب اليدين والرجلين فلا يجوز للرجال إلا في التداوي " .
"হাত পা মেহেদী দ্বারা রঞ্জিত করা রোগের চিকিৎসা ব্যতীত সাধারণভাবে পুরুষদের জন্য বৈধ নেই।" (তুহফাতুল আহওয়াজী ৫/৪৫৬)

🧶 শাইখ সালেহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ এ ব্যাপারে বলেন-

‎أن خضاب الرجل بمناسبة الزواج أو غيره محرم ، بل من كبائر الذنوب ؛ لما فيه من المشابهة بالنساء " انتهى .
"বিবাহ উপলক্ষে অথবা অন্য কোন সময়ে পুরুষদের জন্য মেহেদি ব্যবহার করা হারাম, কাবীরা গুনাহ। কেননা এর মাধ্যমে নারীদের সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করা হয়।" (ফাতাওয়া নুরুন আলাদ দারব ১১/৪১৫-৪১৬)

🧶 উপরোক্ত আলোচনায় এটাই স্পষ্ট হয়ে গেল যে শুধুমাত্র চিকিৎসা ব্যতীত পুরুষের জন্য মেহেদি ব্যবহার করা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েজ, হারাম, কাবীরা গুনাহ। কাজেই কোন ব্যক্তি মেহেদি ব্যবহার করলে সে গুনাহগার হবে কিন্তু এতে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে না। 
➖➖➖➖

উত্তর প্রদানে: শাইখ মোঃ হযরত আলী।

No comments:

Post a Comment

মহিলাদের মসজিদে গমন : একটি পর্যালোচনা

জমহুর আলিমগণ একমত যে, মহিলাদের মসজিদে সালাত আদায় করা অপেক্ষা ঘরে সালাত আদায় করা উত্তম। এ ব্যপারে বেশ কয়েকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে সহিহ সনদে । এ...