__________________________________________
এক.
(১) আমার পরিচিত কয়েকজন “সুলতান সুলায়মান” নামে একটি টিভি সিরিয়ালের কথা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। না দেখে শুধুমাত্র বর্ণনা শুনেই আমি নিশ্চিত, এ ধরণের অনুষ্ঠান যেখানে বাদ্য যন্ত্র বাজানো হয়, নারীদের চেহারা প্রদর্শন করা হয়, মানুষের মন ভুলানোর জন্যে বানোয়াট মিথ্যা কাহিনীকে সত্যি ঘটনার মতো করে দেখানো হয়, ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বিষয় দেখানো হয়, এইগুলো দেখা সম্পূর্ণ হারাম এবং গুনাহর কাজ। এইগুলো হচ্ছে নেক সুরতে শয়তানের ধোকা। মানুষ ইসলামী অনুষ্ঠান মনে করে গুনাহ দিয়ে আমলনামা পূর্ণ করছে। ওয়াল ইয়াজু বিল্লাহ।
(২) অনুরূপভাবে, উমার রাদিয়াল্লাহু আ’নহুর জীবনী নিয়ে বানানো “উমার সিরিজ” একই কারণে দেখা হারাম। সেটা আরো বেশি জঘন্য, কারণ সেখানে উমার (রাঃ) এর চরিত্রকে অভিনয় করে দেখানো হয়েছে। আহলে সুন্নাহর আলেমরা কোন সাহাবীকে অভিনয় করে দেখানো হারাম এবং এটা সম্মানিত সাহাবীদের ব্যক্তিত্বের অসম্মান বলে বিশ্বাস করেন। আপনারা এইগুলো দেখবেন না, এইগুলো যারা বানায় তারা আল্লাহওয়ালা কোন লোক নয়, বরং জাহেল এবং ফাসেক মুসলমান, এমনকি টাকা উপার্জনের জন্য অনেক সময় কাফের-মুশরেকরাও এইগুলো বানিয়ে মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়।। আমাদের ছোটবেলায় অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পাওয়া, মুসলিমদের সম্পর্কে ও ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রচারকারী টিভি সিরিজ “আলিফ লায়লা” বানিয়েছিলো ভারতীয় মুশরিকরা। অনেক মুসলমানরা মনে করে, এইগুলো মুসলিমদের সাহিত্য বা বিনোদন, আসলে এইগুলো বিনোদন নাম দিয়ে শয়তান মুসলমানদেরকে বোকা বানাচ্ছে।
(৩) রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকে চলে আসা আহলে সুন্নাহর চিরন্তন ধারাকে পরিবর্তন করে ইসলামকে “নতুন রূপ” দেওয়ার মতবাদে বিশ্বাসী, এমেরিকান বক্তা ইয়াসির ক্বাদী উমার সিরিজ দেখে লজ্জিত না হয়ে উল্টা দাবী করেছিলো, এটা দেখে নাকি তার ঈমান বেড়ে গেছে! হারাম অনুষ্ঠান দেখে যার ঈমান বেড়ে যায়, এমন উস্তাদের কাছ থেকে যারা দ্বীন শিখবে, সেই সমস্ত মুসলমানদের ঈমানের কি অবস্থা হবে তা খুব সহজেই অনুমেয়। আল্লাহু মুস্তাআ’ন।
(৪) পাকিস্থানী দুইটি টিভি চ্যানেল Ary QTV ও মদীনাহ চ্যানেল - এইগুলো চালায় বেরেলুবী কবর-মাযার পূজারীরা। আপনারা এদের চ্যানেলের সুন্দর নাম দেখে ধোকায় পড়বেন না। এরা স্পষ্ট কুফুরী, শির্ক, বিদআ’ত ও হারাম অনুষ্ঠান প্রচার করে। বোকা পুরুষদের মনোরঞ্জন করা জন্য লিপস্টিক আর মেকাপ দেওয়া বেপর্দা নারীদেরকে দিয়ে গজল, নাত নামক “লাহুয়াল হাদীস” প্রচার করে, গান-বাজনা বা বিভিন্ন হারাম অনুষ্ঠান প্রচার করে, যেখানে নারীদেরকে প্রদর্শন করা হয়। এদের দেখাদেখি বাংলাদেশি বিভিন্ন টিভি চ্যানেল যেখানে দিন রাত ২৪ ঘন্টা অশ্লীল প্রোগ্রাম দেখিয়ে শয়তানকে খুশি করা হয়, তারা মাঝে মাঝে কিছু বিদআ’তি আলেম ভাড়া করে শিরক ও বিদাত প্রচার করছে। আপনারা এদের ব্যপারে সতর্ক থাকুন এবং অন্যদেরকেও সতর্ক করুন।
(৫) নারীদের দ্বারা প্রচারিত সংবাদ দেখা পুরুষদের জন্য হারাম। এমনকি যদিওবা তারা মাথায় রুমালের মতো একটা কাপড় পেঁচিয়ে হিজাব করার দাবী করে, এই হিজাব হিজাব নয়। এটা তাদের মনগড়া হিজাব, যা আল্লাহর কাছে কস্মিনকালেও গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের বিশেষ একটি রাজনৈতিক ইসলামী দলের অনুসারীরা মনে করে, মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে টিভিতে সংবাদ প্রচার করা জায়েজ আছে। এমনকি তাদের একজন ইসলাম প্রচারকারী সেই দলের একটি টিভি চ্যানেলে এটাকে “জায়েজ” বলে ফতোয়াও দিয়েছিলেন। আলেম হিসেবে পরিচিত কোন ব্যক্তি যদি এমন কথা বলেন, স্বাভাবিকভাবে তা
র শ্রোতারা বিভ্রান্ত হবেন।
(৬) সবচাইতে উত্তম ও নিরাপদ হচ্ছে বাসায় টিভি না রাখা, মোবাইলে গেমস না রাখা, বরং বাসায় কুরআনী পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা। আপনার বাচ্চাকে যদি মোবাইলের গেমস না দিলে সে ঠান্ডা না হয়, কার্টুন না দেখে খেতে পারেনা - ২/৪ বছর বয়সেই হারাম কাজে আসক্ত হওয়ার জন্যে আপনিই দায়ী থাকবেন। মনে রাখবেন, আপনি যে রকম বীজ বপন করবেন, সেইরকম ফল পাবেন। আর গাছ সোজা হয়ে বেড়ে উঠার জন্যে ছোটবেলাতেই একটা লাঠি দিয়ে সোজা করে বেধে দিতে হয়। আপনি যদি এটা না করেন, গাছ যদি বাকা হয়ে বড় ও শক্ত হয়ে যায়, তখন শত চেষ্টা করেও আর সেটাকে সোজা করা যায় না। ঠিক তেমনি, সন্তান যদি আল্লাহর অবাধ্য, বেয়াড়া হয়ে বড় হয়, পরে শত চেষ্টা করেও সংশোধন করতে পারবেন না। সন্তানের জন্যে আফসোস আর দুঃখ করে কবরে যেতে হবে।
আল্লাহ আমাদের ও আমাদের পরিবারকে হেফাজত করুন, আমিন।
__________________________________________
দুই.
(১) আমরা সবাই মৃত্যু পথযাত্রী, সুতরাং অনন্ত পথে যাত্রা শুরুর পূর্বে গাফিলতি না করে দ্রুত নেক আমল সংগ্রহ করে নিন। দুনিয়া খেল-তামাশার জন্য নয়, প্রতিটা মানুষের জীবনের একটা উদ্দেশ্য দিয়ে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আমাদের উচিত আমাদের মহান রব্বের সেই মহান ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
(২) আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে সবচাইতে সহজ হচ্ছে আল্লাহর যিকির, যদিও আল্লাহর কাছে এটা অনেক মূল্যবান ও দামী। আমাদের জীবনে প্রতিটা মুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে, ঘুমানোর পূর্বে, খাওয়ার পূর্বে ও পরে, ওযু গোসলের পূর্বে ও পরে, সালাতের পরে, সকালে ও সন্ধায়, বিপদ ও কষ্টের সময়ে এমন অসংখ্য সুন্নতী দুয়া ও যিকির রয়েছে। আপনারা এইগুলো শেখার জন্যে হিসনুল মুসলিম বইটা সংগ্রহ করুন। এই বইয়ের সবগুলো দুয়া সহীহ হাদীস থেকে সংগ্রহ করা। আপনারা এই বইটি বারবার পড়তে পড়তে আস্তে আস্তে প্রয়োজনীয় সবগুলো দুয়া মুখস্থ করার চেষ্টা করুন। বইটি আহসান পাবলিকেশান থেকে প্রকাশিত। এছাড়া পীস পাবলিকেশান থেকে শব্দার্থ সহ বেড়িয়েছে, যা অর্থসহ বুঝে মুখস্থ করার জন্যে উপকারী হবে। আপনাদের যেটা ভালো লাগে কিনতে পারেন।
(৩) টিভি সিরিয়াল “উমার সিরিজ” কাতার ভিত্তিক একটা টিভি চ্যানেল MBC কর্তৃক নির্মিত হয়েছিলো। উমার সিরিজ কাতারে বানানো হোক, দুবাইয়ে হোক, লন্ডনে কিংবা এমেরিকাতে বানানো হয়, যেকোন অবস্থাতেই হারাম। সাহাবাদেরকে অভিনয় করে দেখানো হয়, মিউজিক বাজানো হয়, নারীদেরকে প্রদর্শন করা হয় - এমন যেকোন অনুষ্ঠান দেখা হারাম।
আল্লামাহ সালিহ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-ফাউজান হা’ফিজাহুল্লাহকে উমার সিরিজ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন, “বর্তমান যুগের আলেমদের মাঝে ইজমা রয়েছে অর্থাৎ, সমস্ত আলেমরা এই ব্যপারে একমত যে, কোন ব্যক্তির জন্যে একজন সাহাবীর চরিত্র অভিনয় করে দেখানো জায়েজ নয়”
সমস্ত আলেমদের ফতোয়া উপেক্ষা করে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে যেই সমস্ত লোকেরা উমার সিরিজ বানিয়েছে, শায়খ ফাউজান তাদেরকে অর্থলোভী ব্যবসায়ী বলে আখ্যা দিয়েছেন। সুবহা’নাল্লাহ! চিন্তা করে দেখুন, সমস্ত আলেমরা একমত সাহাবীদেরকে অভিনয় করে দেখানো হারাম এবং এটা সাহাবীদের মর্যাদাহানি করা হয়। সেখানে ইয়াহুদী-খ্রীস্টানদের অধীনে দ্বীন শেখা এমেরিকান কোন ব্যক্তি (ইয়াসির ক্বাদী) যদি “উমার সিরিজ দেখা হারাম” বলে আলেমরা ভুল করছেন এই কথা বলে, “আলেমরা বর্তমান যুগের মাসলা মাসায়েল বুঝতে পারছেন না” এই কথা বলে আলেমদেরকে তুচ্ছ করে, তাহলে এমন ব্যক্তিকে আপনারা কি বলবেন? সে কি একজন দ্বাইয়ী, নাকি একজন JOKER?
(৫) এক ভাই The Message সিনেমা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। উপরে উল্লেখিত কারণ সমূহের কারণে একইভাবে The Message সিনেমা দেখা নাজায়েজ। এই সিনেমার উপরে ইতিঃপূর্বে আমি শায়খ সালিহ আস-শুহাইমি হা’ফিজাহুল্লাহর ফতোয়ার অনুবাদ আমাদের পেইজে পোস্ট করেছিলাম, ফা লিল্লাহিল হা'মদ। সুতরাং, মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার জন্যে, দ্বীন শিখার জন্যে The Message সিনেমা মানুষের মাঝে প্রচার করা অনুচিত। হারাম কাজে কোন বরকত নেই, যদিও আপাতদৃষ্টিতে সেটা দেখতে যতই ভালো মনে হোকনা কেনো।
ওয়া সোয়াল্লাল্লাহু ও সালাম্মা আ’লান-নাবী।
__________________________________________
#শেয়ার_করুন
©সিরাতল মুস্তাকিম

No comments:
Post a Comment