'বিসমিল্লাহ' এর ফজিলত সংক্রান্ত ৭টি ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন আমল: সচেতন হোন-সচেতন করুন
-------------
নির্দিষ্ট সংখ্যায় "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" পড়ার ফজিলত সংক্রান্ত বেশ কিছু আমল তথাকথিত বিভিন্ন ধর্মীয় বই-পুস্তকে পাওয়া যায় এবং লোকমুখেও প্রচলিত রয়েছে-যেগুলো সব দলিল বর্হিভূত ও ভিত্তিহীন।
দ্বীনি ক্ষেত্রে সচেতনতার উদ্দেশ্যে নিম্নে বিসমিল্লাহ এর ফজিলত সংক্রান্ত ৬টি প্রচলিত ভ্রান্ত কথা ও আমল তুলে ধরা হলো:
এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়ুন:
২১ বার 'বিসমিল্লাহ রাহমানির রাহিম' পাঠের ফজিলত!
------------------------
প্রশ্ন: "২১ বার বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" পড়ে ঘুমালে নাকি প্রতি নিশ্বাসে নেকি লিখা হয়। এটা কি সত্য?
উত্তর:
এটি বাতিল ও ভিত্তিহীন কথা।
এ প্রসঙ্গে সৌদি আরবে সাবেক গ্রান্ড মুফতি বিশ্ববিখ্যাত আলেম আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায রহ. বলেন,
إذا قرأت إحدى وعشرين مرة عند النوم حصل بها كذا وكذا، وإذا كتبت مائة وثلاثين مرة حصل بها كذا وكذا إلى غير ذلك كل هذه باطلة لا أساس لها، ولا صحة لها، بل هذا مما افتراه المفترون وكذبه الكذابون فلا يعول على ذلك ولا يلتفت إلى ذلك،
"কেউ যদি ঘুমের সময় ২১ বার বিসমিল্লাহ পড়ে তাহলে এই এই হবে, কেউ যদি তা ১৩০ বার লেখে তাহলে তার এই হবে এই হবে….এগুলো সব বাতিল ও ভিত্তিহীন কথা। মোটেও সহিহ নয়। এগুলো হল, মিথ্যারোপ কারীদের মিথ্যারোপ এবং মিথ্যুকদের মিথ্যাচার।
সুতরাং এ সমস্ত কথাবার্তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না।" (উৎস: শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট )
তবে ঘুমের পূর্বে যে সকল আমল রয়েছে সেগুলো করলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা তাকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করবেন এবং অনেক সওয়াব অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ। যেমন:
সুরা ইখলাস, নাস ও ফালাক পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া, আয়াতুল কুরসি, সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সূরা মুলক, সূরা কাফিরূন, ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আল হামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, তারপর ঘুমের দুআ সমূহ পড়ার পর ঘুমানো।
আল্লাহু আলাম।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স, সৌদি আরব
কোনো ব্যক্তি ঘুমের আগে একুশ বার বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে ঘুমালে, চুরি, জ্বিনের প্রভাব ও হঠাৎ মৃত্যু থেকে রক্ষা পাবে!"
পড়ার পদ্ধতি হচ্ছে, এক হাজার বার পড়ে, কমপক্ষে একবার দরুদ ও উদ্দেশ্য পূরণের জন্য দোয়া করবে। তারপর উক্ত পদ্ধতিতে আরো এক হাজার বার। এভাবে বার হাজার বার পূরণ করা।
আমাদের সমাজে প্রচলিত তথাকথিত ধর্মীয় বই-পুস্তকে এই জাতীয় বহু ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও বিদআতি আমলের ছড়াছড়ি রয়েছে। দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা এই সকল মিষ্টি মিষ্টি আমল করে সহজে জান্নাতে পৌঁছতে চায়। তারা সঠিক-বেঠিক যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজন অনুভব করে না। আর এই অজ্ঞতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ী এসব সস্তা ও কুসংস্কার পূর্ণ বই লিখে এবং তাবিজ বিক্রয় করে টু-পাইস কামিয়ে নিচ্ছে!
কিন্তু এখন সময় এসেছে, এ সকল স্বার্থান্বেষী ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর, যারা অজ্ঞ লোকদের কে দীনের সঠিক জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার পরিবর্তে তাদের অজ্ঞতাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। الله المستعان
মহান আল্লাহ এসকল জাহিলদের কে হেদায়াত করুন। আমীন।
-------------------
কোন কোন কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা বৈধ আর কোন কাজের শুরুতে অবৈধ
প্রশ্ন: সকল প্রকার কাজের শুরুতে কি ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হয়? এমনকি হারাম কাজের শুরুতেও কি বিসমিল্লাহ বলা বৈধ?
উত্তর:
সকল প্রকার দুনিয়াবী বৈধ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে হয়। হারাম বা মাকরূহ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হারাম বরং তা আল্লাহর সাথে ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল।
বিসমিল্লাহ বলার অর্থ উক্ত কাজে আল্লাহর সাহায্য ও বরকত কামনা করা। সুতরাং কেউ যদি আল্লাহর নিষিদ্ধ বা ঘৃণিত কাজে তার নিকট সাহায্য চায় বা বরকত কামনা করে তাহলে তা মহামহিম আল্লাহর সাথে বেয়াদবী করা হল না?
যেখানে হারাম কাজ করার আগে আল্লাহ তাআলার কথা স্বরণ করে সেখান থেকে দূরে সরে আসা আবশ্যক সেখানে বিসমিল্লাহ বলে হারাম কাজ করা কোনভাবেই বৈধ হতে পারে না।
(অনেক আলেমের মতে প্রাণী জবেহের সময় এই দুআ পড়া ওয়াজিব)
لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا أَتَى أَهْلَهُ قَالَ بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا فَقُضِيَ بَيْنَهُمَا وَلَدٌ لَمْ يَضُرُّهُ
“তোমাদের কোন ব্যক্তি যদি স্ত্রী সহবাসের সময় এই দু’আ পাঠ করে:
بِسْمِ اللهِ اللهمَّ جَنِّبْناَ الشَّيْطاَنَ وَجَنِّبِ الشَّيْطاَنَ ماَ رَزَقْتَناَ
‘শুরু করছি আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ্! আমাদেরকে শয়তান থেকে দূরে রাখ এবং আমাদেরকে যে সন্তান দান করবে তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখ।’ তবে তাদের জন্য যদি কোন সন্তান নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে শয়তান কখনই তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” (সহীহ বুখারী, অধ্যায়ঃ দু’আ, অনুচ্ছেদঃ স্ত্রী সহবাসের সময় যা বলতে হয়। হা/ ৫৯০৯। মুসলিম অধ্যায়ঃ বিবাহ অনুচ্ছেঃ সহবাসের সময় যা বলা মুস্তাহাব হা/ ২৫৯১)
عَنْ أَبِي الْمَلِيحِ عَنْ رَجُلٍ قَالَ كُنْتُ رَدِيفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَثَرَتْ دَابَّةٌ فَقُلْتُ تَعِسَ الشَّيْطَانُ فَقَالَ لَا تَقُلْ تَعِسَ الشَّيْطَانُ فَإِنَّكَ إِذَا قُلْتَ ذَلِكَ تَعَاظَمَ حَتَّى يَكُونَ مِثْلَ الْبَيْتِ وَيَقُولُ بِقُوَّتِي وَلَكِنْ قُلْ بِسْمِ اللَّهِ فَإِنَّكَ إِذَا قُلْتَ ذَلِكَ تَصَاغَرَ حَتَّى يَكُونَ مِثْلَ الذُّبَابِ.
আবূ মুলাইহ্ থেকে বর্ণিত, তিনি জনৈক ব্যক্তি (ছাহাবী) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমি একদা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সাথে তাঁর আরোহীর পিছনে বসা ছিলাম। এমন সময় আরোহীটি পা ফসকে পড়ে গেল। তখন আমি বললাম, শয়তান ধ্বংস হোক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বললেন: “শয়তান ধ্বংস হোক এরূপ বলো না, কেননা এতে সে নিজেকে খুব বড় মনে করে এমনকি ঘরের মত হয়ে যায় এবং বলে আমার নিজ শক্তি দ্বারা একাজ করেছি; বরং এরূপ মূহুর্তে বলবে ‘বিসমিল্লাহ্’। এতে সে অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায় এমনকি মাছি সদৃশ্য হয়ে যায়।” [ মুসনাদে আহমাদ হা/ ১৯৭৮২। আবু দাঊদ, অধ্যায়ঃ আদব-শিষ্টচার, অনুচ্ছেদঃ এরকম বলবে না আমার প্রাণ খবিস হয়ে গেছে। হা/ ৪৩৩০। শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেন, সহীহ তারগীব তারহীব হা/ ৩১২৯। সহীহ আবু দাউদ হা/ ৪৯৮২।)
আল্লাহু আলাম
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স, সৌদি আরব

No comments:
Post a Comment