Wednesday, January 6, 2021

'বিসমিল্লাহ' এর ফজিলত সংক্রান্ত ৭টি ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন আমল


 'বিসমিল্লাহ' এর ফজিলত সংক্রান্ত ৭টি ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন আমল: সচেতন হোন-সচেতন করুন

-------------
নির্দিষ্ট সংখ্যায় "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" পড়ার ফজিলত সংক্রান্ত বেশ কিছু আমল তথাকথিত বিভিন্ন ধর্মীয় বই-পুস্তকে পাওয়া যায় এবং লোকমুখেও প্রচলিত রয়েছে-যেগুলো সব দলিল বর্হিভূত ও ভিত্তিহীন।
দ্বীনি ক্ষেত্রে সচেতনতার উদ্দেশ্যে নিম্নে বিসমিল্লাহ এর ফজিলত সংক্রান্ত ৬টি প্রচলিত ভ্রান্ত কথা ও আমল তুলে ধরা হলো:
❌ ১. প্রতি নিঃশ্বাসে নেকি: "একুশ বার 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' পড়ে ঘুমালে প্রতি নিশ্বাসে নেকি লিখা হয়!
এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়ুন:
২১ বার 'বিসমিল্লাহ রাহমানির রাহিম' পাঠের ফজিলত!
------------------------
প্রশ্ন: "২১ বার বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" পড়ে ঘুমালে নাকি প্রতি নিশ্বাসে নেকি লিখা হয়। এটা কি সত্য?
উত্তর:
এটি বাতিল ও ভিত্তিহীন কথা।
এ প্রসঙ্গে সৌদি আরবে সাবেক গ্রান্ড মুফতি বিশ্ববিখ্যাত আলেম আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায রহ. বলেন,
إذا قرأت إحدى وعشرين مرة عند النوم حصل بها كذا وكذا، وإذا كتبت مائة وثلاثين مرة حصل بها كذا وكذا إلى غير ذلك كل هذه باطلة لا أساس لها، ولا صحة لها، بل هذا مما افتراه المفترون وكذبه الكذابون فلا يعول على ذلك ولا يلتفت إلى ذلك،
"কেউ যদি ঘুমের সময় ২১ বার বিসমিল্লাহ পড়ে তাহলে এই এই হবে, কেউ যদি তা ১৩০ বার লেখে তাহলে তার এই হবে এই হবে….এগুলো সব বাতিল ও ভিত্তিহীন কথা। মোটেও সহিহ নয়। এগুলো হল, মিথ্যারোপ কারীদের মিথ্যারোপ এবং মিথ্যুকদের মিথ্যাচার।
সুতরাং এ সমস্ত কথাবার্তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না।" (উৎস: শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট )
তবে ঘুমের পূর্বে যে সকল আমল রয়েছে সেগুলো করলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা তাকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করবেন এবং অনেক সওয়াব অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ। যেমন:
সুরা ইখলাস, নাস ও ফালাক পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া, আয়াতুল কুরসি, সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সূরা মুলক, সূরা কাফিরূন, ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আল হামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, তারপর ঘুমের দুআ সমূহ পড়ার পর ঘুমানো।
আল্লাহু আলাম।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স, সৌদি আরব
❌ ২. চুরি ও জ্বিন শয়তানের প্রভাব থেকে আত্মরক্ষা:
কোনো ব্যক্তি ঘুমের আগে একুশ বার বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে ঘুমালে, চুরি, জ্বিনের প্রভাব ও হঠাৎ মৃত্যু থেকে রক্ষা পাবে!"
❌ ৩. মুশকিল আসান ও প্রয়োজন পূরণ: ১২ হাজার বার বিসমিল্লাহ পড়ার বরকতে মুশকিল আসান হবে এবং প্রয়োজন পূর্ণ হবে!
পড়ার পদ্ধতি হচ্ছে, এক হাজার বার পড়ে, কমপক্ষে একবার দরুদ ও উদ্দেশ্য পূরণের জন্য দোয়া করবে। তারপর উক্ত পদ্ধতিতে আরো এক হাজার বার। এভাবে বার হাজার বার পূরণ করা।
❌ ৪. মেধা ও মুখস্থশক্তি বৃদ্ধি: মেধা বা মুখস্থশক্তি দুর্বল কোনো ছাত্র যদি সাতশ ছিয়াশি বার বিসমিল্লাহ পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে, সূর্য উদয়ের সময় তা পান করে তাহলে তার মেধা ও মুখস্থ শক্তি বৃদ্ধি পাবে!
❌ ৫. বালা মুসিবত থেকে ফসল রক্ষা এবং তাতে বরকত লাভ: যে ব্যক্তি ১০০ বার 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' লিখে ক্ষেতে-খামারের দাফন করে রাখে, আল্লাহ তাআলা সব ধরণের বালা-মুসিবত থেকে ফসলের হেফাজত করেন। ফসলের বরকত বৃদ্ধি করে দেন!
❌‌ ৬. যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ৬শ বার লিপিবদ্ধ করে সঙ্গে রাখবে, আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদের ওপর সে ব্যক্তির প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, কেউ তার ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হবে না!
❌ ৭. যে ব্যক্তি `বিসমিল্লাহ` লেখা আছে এমন কোনো কাগজের টুকরা আল্লাহ তায়ালার তাজিমের উদ্দেশ্যে হেফাজত করেন, আল্লাহর কাছে তার নাম সিদ্দিকদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয় এবং তার পিতামাতার শাস্তি লাঘব করা হয়, যদিও তারা মুশরিক হয়ে থাকে!
আমাদের সমাজে প্রচলিত তথাকথিত ধর্মীয় বই-পুস্তকে এই জাতীয় বহু ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও বিদআতি আমলের ছড়াছড়ি রয়েছে। দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা এই সকল মিষ্টি মিষ্টি আমল করে সহজে জান্নাতে পৌঁছতে চায়। তারা সঠিক-বেঠিক যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজন অনুভব করে না। আর এই অজ্ঞতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ী এসব সস্তা ও কুসংস্কার পূর্ণ বই লিখে এবং তাবিজ বিক্রয় করে টু-পাইস কামিয়ে নিচ্ছে! ‌
কিন্তু এখন সময় এসেছে, এ সকল‌ স্বার্থান্বেষী ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর,‌ যারা অজ্ঞ লোকদের কে দীনের সঠিক জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার পরিবর্তে তাদের অজ্ঞতাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। الله المستعان
মহান আল্লাহ এসকল জাহিলদের কে হেদায়াত করুন। আমীন।
-------------------
কোন কোন কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা বৈধ আর কোন কাজের শুরুতে অবৈধ
➖➖➖➖➖➖➖➖
প্রশ্ন: সকল প্রকার কাজের শুরুতে কি ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হয়? এমনকি হারাম কাজের শুরুতেও কি বিসমিল্লাহ বলা বৈধ?
উত্তর:
সকল প্রকার দুনিয়াবী বৈধ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে হয়। হারাম বা মাকরূহ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হারাম বরং তা আল্লাহর সাথে ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল।
বিসমিল্লাহ বলার অর্থ উক্ত কাজে আল্লাহর সাহায্য ও বরকত কামনা করা। সুতরাং কেউ যদি আল্লাহর নিষিদ্ধ বা ঘৃণিত কাজে তার নিকট সাহায্য চায় বা বরকত কামনা করে তাহলে তা মহামহিম আল্লাহর সাথে বেয়াদবী করা হল না?
যেখানে হারাম কাজ করার আগে আল্লাহ তাআলার কথা স্বরণ করে সেখান থেকে দূরে সরে আসা আবশ্যক সেখানে বিসমিল্লাহ বলে হারাম কাজ করা কোনভাবেই বৈধ হতে পারে না।
🌀 কখন বিসমিল্লাহ্‌ বলা মুস্তাহাব?
🔸 ১) টয়লেটে প্রবেশের পূর্বে: بِسْمِ اللـهِ اللَّهُمَّ إنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الـخُبْثِ والـخَبَائِثِ তবে বিসমিল্লাহ ছাড়াও দুয়াটি বর্ণিত হয়েছে।
🔸২) ওযুর শুরুতে بِسْمِ اللهِ
🔸 ৩) খাওয়ার সময় بِسْمِ اللهِ
🔸 ৪) প্রাণী যবেহ্‌ করার সময়: بِسْمِ اللَّـهِ وَاللهُ أكْبرُ
(অনেক আলেমের মতে প্রাণী জবেহের সময় এই দুআ পড়া ওয়াজিব)
🔸 ৫) স্ত্রী সহবাসের সময়। ইবনু আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا أَتَى أَهْلَهُ قَالَ بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا فَقُضِيَ بَيْنَهُمَا وَلَدٌ لَمْ يَضُرُّهُ
“তোমাদের কোন ব্যক্তি যদি স্ত্রী সহবাসের সময় এই দু’আ পাঠ করে:
بِسْمِ اللهِ اللهمَّ جَنِّبْناَ الشَّيْطاَنَ وَجَنِّبِ الشَّيْطاَنَ ماَ رَزَقْتَناَ
‘শুরু করছি আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ্‌! আমাদেরকে শয়তান থেকে দূরে রাখ এবং আমাদেরকে যে সন্তান দান করবে তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখ।’ তবে তাদের জন্য যদি কোন সন্তান নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে শয়তান কখনই তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” (সহীহ বুখারী, অধ্যায়ঃ দু’আ, অনুচ্ছেদঃ স্ত্রী সহবাসের সময় যা বলতে হয়। হা/ ৫৯০৯। মুসলিম অধ্যায়ঃ বিবাহ অনুচ্ছেঃ সহবাসের সময় যা বলা মুস্তাহাব হা/ ২৫৯১)
🔸 ৬) নৌযানে আরহণের সময় بِسْمِ اللَّهِ مَجْرَاهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ (সূরা হূদ- ৪১)
🔸৭) পত্র লিখার সময় بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ (সূরা নমল- ৩০)
🔸 ৮) রাস্তায় চলতে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেলে বিসমিল্লাহ। যেমন এ মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي الْمَلِيحِ عَنْ رَجُلٍ قَالَ كُنْتُ رَدِيفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَثَرَتْ دَابَّةٌ فَقُلْتُ تَعِسَ الشَّيْطَانُ فَقَالَ لَا تَقُلْ تَعِسَ الشَّيْطَانُ فَإِنَّكَ إِذَا قُلْتَ ذَلِكَ تَعَاظَمَ حَتَّى يَكُونَ مِثْلَ الْبَيْتِ وَيَقُولُ بِقُوَّتِي وَلَكِنْ قُلْ بِسْمِ اللَّهِ فَإِنَّكَ إِذَا قُلْتَ ذَلِكَ تَصَاغَرَ حَتَّى يَكُونَ مِثْلَ الذُّبَابِ.
আবূ মুলাইহ্‌ থেকে বর্ণিত, তিনি জনৈক ব্যক্তি (ছাহাবী) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমি একদা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সাথে তাঁর আরোহীর পিছনে বসা ছিলাম। এমন সময় আরোহীটি পা ফসকে পড়ে গেল। তখন আমি বললাম, শয়তান ধ্বংস হোক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বললেন: “শয়তান ধ্বংস হোক এরূপ বলো না, কেননা এতে সে নিজেকে খুব বড় মনে করে এমনকি ঘরের মত হয়ে যায় এবং বলে আমার নিজ শক্তি দ্বারা একাজ করেছি; বরং এরূপ মূহুর্তে বলবে ‘বিসমিল্লাহ্‌’। এতে সে অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায় এমনকি মাছি সদৃশ্য হয়ে যায়।” [ মুসনাদে আহমাদ হা/ ১৯৭৮২। আবু দাঊদ, অধ্যায়ঃ আদব-শিষ্টচার, অনুচ্ছেদঃ এরকম বলবে না আমার প্রাণ খবিস হয়ে গেছে। হা/ ৪৩৩০। শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেন, সহীহ তারগীব তারহীব হা/ ৩১২৯। সহীহ আবু দাউদ হা/ ৪৯৮২।)
🔸 ৯) সূরা তওবা ছাড়া যে কোন সূরা পড়ার শুরুতে بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ
🔸১০) মসজিদে প্রবেশের সময় بسم اللهِ، وَالصَّلاةُ وَالسَّلامُ عَلَى رَسُولِ الله ، اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أبْوَابَ رَحْمَتِكَ
🔸 ১১) মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় بِسْمِ اللَّهِ وَالصَّلاةُ وَالسَّلامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ إنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ، اللَّهُمَّ اعْصِمْنِي مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيم
🔸১২) এছাড়াও দুনিয়াবী যে কোন বৈধ কাজের শুরুতে।
আল্লাহু আলাম
✒✒✒✒✒✒✒✒
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স, সৌদি আরব

No comments:

Post a Comment

মহিলাদের মসজিদে গমন : একটি পর্যালোচনা

জমহুর আলিমগণ একমত যে, মহিলাদের মসজিদে সালাত আদায় করা অপেক্ষা ঘরে সালাত আদায় করা উত্তম। এ ব্যপারে বেশ কয়েকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে সহিহ সনদে । এ...