___________________________________
সুরা আল-বাক্বারার শেষ দুইটি আয়াত (২৮৫+২৮৬) “আমানার রাসুলু. . .থেকে শেষ পর্যন্ত” - তেলাওয়াত করার অনেক ফযীলতের কথা বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া শেষ আয়াতে অত্যন্ত জরুরী কয়েকটি দুয়া রয়েছে, এই দুয়াগুলো কবুল হওয়ার ওয়াদাও করা হয়েছে।
___________________________________
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমাকে আল্লাহর আরশের নীচের একটি ধন-সম্পদের ভান্ডার থেকে সুরা বাক্বারার শেষ দুই আয়াত দেওয়া হয়েছে। আমার পূর্বে তা কাউকে দেওয়া হয়নি, আমার পরেও অন্য কাউকে তা দেওয়া হবেনা।” আন-নাসায়ী, ইবনে হিব্বান, শায়খ আল-আরনাউ’ত বলেন, হাদীসটি সহীহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ আকাশ ও জমীন সৃষ্টি করার দুই হাজার বছর পূর্বে একটা কিতাব লিখেছেন। সেই কিতাব থেকে সুরা বাক্বারার শেষ দুইটি আয়াত নাযিল করা হয়েছে। এই দুইটি আয়াতের মাধ্যমেই সুরা আল-বাক্বারাহ সমাপ্ত করা হয়েছে। যেই ঘরে তিন রাত সুরা বাক্বারার শেষ দুইটি আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, শয়তান সেই ঘরে প্রবেশ করতে পারে না।” তিরমিযীঃ ২৮৮২, আল-হাকিমঃ ২০৬৫, হাদীসটি ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ।
একদিন জিবরাঈল আ’লাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বসে ছিলেন। এমন সময় উপরের দিকে একটি আওয়ায শুনতে পেয়ে তিনি নিজের মাথা তুললেন এবং বললেন, “এটি আসমানের একটি দরজা, যা আজই খুলে দেওয়া হল; আজকের দিন ছাড়া কখনও তা খোলা হয়নি। এখন সেই দরজা দিয়ে একজন ফেরেশতা অবতরণ করলেন। তিনি বললেন, তিনি এমন একজন ফেরেশতা যিনি পৃথিবীতে অবতরণ করলেন, আজ ছাড়া অন্য কোন দিন তিনি অবতরণ করেননি। এরপর সেই ফেরেশতা নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে সালাম দিয়ে বললেন, “আপনি দুইটি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, যা আপনাকে দেওয়া হয়েছে কিন্তু আপনার পূর্বে অন্য কোন নবীকে দেওয়া হয়নি। তা হলো সুরা ফাতেহা এবং সুরা বাক্বারার শেষ অংশ। এই দুইটি নূরের যে কোন হরফ (দুয়া) আপনি পাঠ করবেন, তা আপনাকে দেওয়া হবে।” সহীহ মুসলিমঃ ১৭৬০।
___________________________________
রাতের বেলা সুরা বাক্বারার শেষ দুই আয়াত তেলাওয়াত করলে তাহাজ্জুদ সালাতের সমান সওয়াব পাওয়ার আশা করা যায়ঃ
রাসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতের বেলা সুরা বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পড়বে, সেটা তার জন্য যথেষ্ঠ হবে।” সহীহ বুখারীঃ ৫০১০, সহীহ মুসলিমঃ ৮০৭।
ক্বুরআন ও হাদীসের অনন্য সংকলন ‘রিয়াদুস সালেহীন’ এর লেখক ও সহীহ মুসলিমের ভাষ্যকার, ইমাম আন-নববী রহি’মাহুল্লাহ বলেছেন, “এই হাদীসের অর্থ কেউ বলেছেন, ক্বিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ সালাতের জন্য যথেষ্ঠ হবে। কেউ বলেছেন, শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য যথেষ্ঠ হবে। কেউ বলেছেন, বালা-মুসিবত থেকে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে। তবে সবগুলো অর্থ সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” শারহুন নববী আ’লা সহীহ মুসলিমঃ ৬/৩৪০, হাদীস ৮০৭।
সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার, আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদীস, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহি’মাহুল্লাহ ইমাম নববীর এই অভিমত সমর্থন করে বলেন, “উপরের সবগুলো অর্থ নেওয়া সঠিক। আল্লাহ ভালো জানেন। প্রথম অর্থটি (তাহাজ্জুদের সমান সওয়াব পাওয়া যাবে) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহ আ’নহু থেকে একটি মারফু হাদীসে স্পষ্ট ঊল্লেখ রয়েছে।” ফাতহুল বারীঃ ৮/৬৭৩, হাদীস নং-৫০১০।
এ কারণে আলী রাদিয়াল্লাহ আ’নহু বলেন, “আমার মতে যার সামান্যও জ্ঞান-বুদ্ধি আছে, এই দুইটি আয়াত পাঠ করা ছাড়া তার নিদ্রা যাওয়া অনুচিত।” মানাকিবুস সাহাবা, ইমাম নববী সহীহ বলেছেন, আল-আযকার।
হজরত আবু মাসউদ রাদিয়াল্লাহ আ’নহু বর্ণনা করেন, রাসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতের বেলা সুরা বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তার জন্য এই দুটি আয়াত যথেষ্ট হবে; অর্থাৎ সারারাত সে জিন ও মানুষের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবে এবং প্রতিটি অপ্রিয় বিষয় থেকে তাকে হেফাজত করা হবে।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
___________________________________
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
(২৮৫) রাসুল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে, যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমুহের প্রতি এবং তাঁর প্রেরিত নবী-রাসুলগণের প্রতি। তারা বলে, “আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোন তারতম্য করিনা।” তারা আরো বলে, “আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। আমাদেরকে তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।”
(২৮৬) আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায়, যা সে করে। (মুমিনরা বলে) “হে আমাদের পালনকর্তা! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না। হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করো না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছিলে। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দ্বারা ঐ বোঝা বহন করিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নাই। আমাদের পাপ মোচন কর। আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমিই আমাদের মাওলা (মালিক)। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে তুমি বিজয়ী কর।” (আমিন)
___________________________________
ইমাম ইবনে কাসীর রহি’মাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন, “মুআ’য রাদিয়াল্লাহু আ’নহু এই সুরা শেষ করে ‘আমীন’ বলতেন।’’
সুতরাং, সুরা বাক্বারার শেষ দুইটি আয়াত পড়ে এর মধ্যে দুয়াগুলো কবুলের জন্য “আমিন” বলা যাবে। আর সুরা বাক্বারার শেষ দুইটি আয়াত মাগরিবের পরে বা রাতের বেলা ঘুমানোর পূর্বে যেকোন সময়ে পড়লে এর ফযীলত পাওয়া যাবে।
___________________________________
শানে নুযূলঃ
সাহাবারা ক্বুরআনের প্রতিটা আয়াত গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের জীবনের সাথে বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী ছিলেন। সহীহ মুসলিম, প্রথম খণ্ড, অনুচ্ছেদ-৫৮, ২৩৭নং হাদীসে সাহাবীদের অন্তরে ঈমানের প্রতি দৃঢ়তা ও আনুগত্যের সুন্দর উদাহরন ফুটে উঠেছে! মহান আল্লাহ ঈমানদারদের কত সন্নিকটে, কত মহান দয়ালু তার নমুনাও স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে।
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আ’নহু থেকে বর্ণিত। যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সুরা বাক্বারার ২৮৪ নম্বর অর্থাৎ এই আয়াতটি নাযিল হলো, “আকাশ সমূহে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর। তোমরা নিজেদের মনের কথা প্রকাশ করো বা লুকিয়ে রাখো, আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের কাছ থেকে তার হিসাব নেবেন। তারপর তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন, এটা তাঁর ইচ্ছার অধীন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর ওপর সর্ব শক্তিমান।” সাহাবীদের কাছে এই আয়াত বড়ই কঠিন মনে হলো। তাই তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে গেলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাদেরকে সালাত, সাওম, জিহাদ, সাদকা ইত্যাদির বোঝা চাপিয়া দেয়াও হয়েছে, যা আমাদের জন্য এমনিই কষ্টকর। আবার এখন আপনার উপর এই আয়াত নাযিল হয়েছে, যা আমাদের সামর্থ্যের বাইরে।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তাহলে কি তোমরা পূর্ববর্তী দুই কিতাবধারী সম্প্রদায় (ইয়াহুদী ও খ্রীস্টানদের) মতো বলতে চাও? যেমন তারা বলেছিল, “আমরা আদেশ শুনেছি, কিন্তু মানব না।” সুরা আল-বাক্বারাহঃ ৯৩।
বরং তোমরা বলো, “আমরা আদেশ শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা তোমার কাছে গুনাহ মাফ করার জন্য প্রার্থনা করছি। আর আমাদেরকে তোমার দিকেই ফিরে যেতে হবে।”
যখন সাহাবীরা আয়াতটি পড়ে নিলো এবং তাদের অন্তরেও এর দাগ কাটলো, মহান ক্ষমতাবান আল্লাহ তাআ’লা এর পরক্ষণেই এই আয়াত নাযিল করলেন, “রাসুল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে, যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমুহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোন তারতম্য করিনা। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। আমাদেরকে তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।” সুরা বাক্বারাহঃ ২৮৫।
অতঃপর যখন তারা পরিপূর্ণভাবে মনে-প্রানে এই নির্দেশ মেনে নিলেন, পরে তা আল্লাহ তাআ’লা ২৮৪ নম্বর আয়াত মানসুখ (রহিত) করে দিলেন, এবং নাযিল করলেন, “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায়, যা সে করে। (মুমিনরা বলে) হে আমাদের পালনকর্তা! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না। হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করো না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করে।, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দ্বারা ঐ বোঝা বহন করিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নাই। আমাদের পাপ মোচন কর। আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমিই আমাদের মাওলা। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে তুমি বিজয়ী কর।” বাক্বারাহঃ ২৮৬।
আল্লাহ তাআ’লা বললেন, “হ্যা”। অর্থাৎ (২৮৬ নাম্বারে উল্লেখিত) তোমাদের এই আরজি ও আরাধনা আমি কবুল করলাম।
___________________________________
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবাইকে ক্বুরআনুল কারীমের এই বরকতময়, সম্মানিত আয়াত দুইটি পাঠ করার এবং সে অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত মুসিবত, বিপদ-আপদ, রোগ-শোক অতিক্রম করে শান্তিময় ও সুখের জীবন লাভে ধন্য করুন। আমিন।
___________________________________
#শেয়ার_করুন
©সিরাতল মুস্তাকিম

No comments:
Post a Comment