সুদের উপর ঋণ দিয়ে আমরা মানুষের উপকার করছি.....
বিকাশ ব্যাবসা, ফোন, ফ্যাক্স ইত্যাদির জন্য ঘর ভাড়া দেওয়ার বিধান
-----------------
প্রশ্ন: অনেক মানুষ আছে যারা ব্যাক্তিগত ভাবে সুদি কারবার করে কোন ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান ছাড়াই। যেমন তারা মানুষকে ঋণ দেয় এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বাড়তি নিয়ে নেয়। এদেরকে যদি বলা হয়, এ সব সুদের পর্যায়ে পড়ে এবং এভাবে ইনকাম করাটা হালাল না তখন তারা এ যুক্তি দেখায় যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা তো এ রকমই। ব্যাংকগুলো সুদের উপর চলে। তারা বৃহৎ পর্যায়ে কাজ করে আমরা ক্ষুদ্র পর্যায়ে। আমরা তো সবাই মানুষের উপকার করছি। এদের কথার উত্তর কিভাবে দিতে পারি? দয়া করে জানাবেন।
রিলেটেড প্রশ্ন: যারা এ রকম ব্যবসা করে পাশাপাশি ফোন, ফ্যাক্স এবং বিকাশ লেনদেনের ব্যবসা আছে তাদের কে কি দোকান ভাড়া দেয়া যাবে?
উত্তর:
বিকাশ (Bkash) মূলত ব্রাক ব্যাংক এর শাখা। আর ব্রাক একটি সুপরিচিত সুদি ব্যাংক। সুতরাং কেউ যদি বিকাশের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে তাহলে সে মূলত সুদী ব্যাংকে কাজ করছে বলেই বিবেচিত হবে।
সুতরাং বিকাশ ব্যবসা করা যেমন জায়েজ নেই তেমনি বিকাশ ব্যবসার জন্য কাউকে ঘর ভাড়া দেওয়া জায়েজ নেই। অন্যথায় তা হারাম কাজে সহায়তা শামিল বলে গণ্য হবে। অথচ হারাম কাজে কোন ধরণের সাহায্য-সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ (সূরা মায়েদা: ২)
তবে ফোন ও ফ্যাক্স এর জন্য ঘর ভাড়া দেওয়ায় কোন আপত্তি নেই ইনশাআল্লাহ।
টাকা ঋণ দিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেয়া সুদের অন্তর্ভুক্ত। এটা হারাম ও কবিরা গুনাহ। কুরআন ও হাদিসে এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত সতর্কবাণী এসেছে। যেমন:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا ۗ وَأَحَلَّ اللَّـهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ۚ فَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَىٰ فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّـهِ ۖ وَمَنْ عَادَ فَأُولَـٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
"যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দণ্ডায়মান হবে, যেভাবে দণ্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছে: ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লা’হ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। আল্লাহ তা’আলা সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান খয়রাতকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ পছন্দ করেন না কোন অবিশ্বাসী পাপীকে। "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (বাকারা: ২৭৫ ও ২৭৬)
সুতরাং মুসলিমের জন্য কোনভাবেই সুদি কারবারে জড়িত হওয়ার সুযোগ নাই। চাই ব্যাংকিং খাতে হোক বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে হোক। ব্যাংকগুলোতে সুদি কারবার করে বলে তা ব্যক্তিগতভাবে তা বৈধ হয়ে যাবে না। হারাম হারামই। কে করল না করল তা দেখে আল্লাহ তাআলার এই অলঙ্ঘনীয় বিধান পরিবর্তন হবে না।
আর 'সুদ লেনদেনের মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয়' এটাও সুদ হালাল হওয়ার পক্ষে যুক্তি হতে পারে না। কেননা কুরআন বলছে, মদেও কিছু উপকারী দিক রয়েছে। কিন্তু তার ক্ষতিকর দিক বেশি। তাই বলে তো মদ হালাল হবে না। যারা পতিতাবৃত্তি করে তারাও যুক্তি দেখায় যে, তারাও না কি মানুষের উপকার করছে! এভাবে প্রত্যেক অন্যায়কারীর পক্ষেই যুক্তি আছে। কিন্তু যুক্তি দিয়ে হালাল-হারাম নির্ধারিত হয় না।
আমরা মুসলিম। মুসলিম মানে আত্মসমর্পণকারী। আল্লাহর যে কোন বিধানের সামনে বিনা প্রশ্ন আত্মসমর্পন করাই মুসলিমের কাজ। সুতরাং সুদের পক্ষে যুক্তি না খুঁজে আমাদের কতর্ব্য, নির্দ্ধিধায় এই বিধানকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করা এবং সুদি কারবারকে প্রত্যাখান করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হারাম থেকে বাঁচার তওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহু আলাম।
আরো পড়ুন: বিকাশের এজেন্ট বা কাস্টমার কেয়ারে চাকরি করার বিধান
প্রশ্ন: বিকাশের এজেন্ট বা কাস্টমার কেয়ারে চাকুরি করা কি জায়েজ?
▬▬▬◈◯◈▬▬▬
উত্তর:
নিম্নে বিকাশ কি, এতে সুদের সম্পৃক্ততা, বিকাশের এজেন্ট হিসেবে বা কাস্টমার কেয়ারে চাকুরি করার বিধান, বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন ইত্যাদি বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হল:
❑ বিকাশ কি?
বিকাশ (Bkash) মূলত ব্র্যাক ব্যাংক এর উদ্যোগে পরিচালিত মোবাইল ফোন ভিত্তিক অর্থ আদান প্রদান মূলক একটি পরিসেবা।
এ ব্যাপারে বিকাশের অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে বলা হয়েছে, “বিকাশ' ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড, বাংলাদেশ এবং মানি ইন মোশন, ইউএসএ এর একটি যৌথ উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং পরবর্তীতে ২০১৩ এর এপ্রিল মাসে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) ও 'বিকাশ' এর অন্যতম অংশীদার হয়।”
উল্লেখ্য যে, ব্র্যাক নামক এনজিওটি বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে স্যার ফজলে হাসান আবেদ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের এনজিও ব্যুরোর অধীনে নিবন্ধিত BRAC (Bangladesh Rural Advancement Committee) একটি বেসরকারি এনজিও সংস্থা। এই সংস্থার অধীনে পরিচালিত ব্যাংক হল, ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড (BRAC Bank Limited)।
❑ ব্র্যাক ব্যাংক এবং বিকাশে সুদ:
এ কথা সুবিদিত যে, ব্র্যাক ব্যাংক একটি সুদি ব্যাংক। সুতরাং তার উদ্যোগে পরিচালিত বিকাশে সুদ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বিকাশে সুদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, "আপনি বিকাশ একাউন্টে টাকা জমিয়ে বছরে ৪% পর্যন্ত ইন্টারেস্ট পেতে পারেন। উদাহরণ স্বরূপ, আপনার বিকাশ একাউন্টে যদি একটি মাস জুড়ে কমপক্ষে ১,০০০ টাকা থাকে, ঐ মাসে ২ টি লেনদেন করেন এবং ঐ মাসের গড় ব্যালেন্স যদি ১,০০০ থেকে ৫,০০০.৯৯ টাকার মধ্যে থাকে তাহলে আপনি ঐ মাসের গড় ব্যালেন্সের উপর ১.৫% বাৎসরিক হারে ইন্টারেস্ট পাবেন।" (বিকাশের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট)
আর এ কথা অজানা নয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ ভয়ানক হারাম, ধ্বংসাত্মক কবিরা গুনাহ এবং অভিশাপ যোগ্য কাজ হিসেবে পরিগণিত।
◈ ইসলামে সুদ হারাম:
আল্লাহ তাআলা কুরআনে সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন,
أَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)
◈ সুদ একটি ধ্বংসাত্মক পাপ:
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
اجتَنبوا السَّبعَ الموبقاتِ . قالوا : يا رسولَ اللهِ : وما هنَّ ؟ قال : الشِّركُ باللهِ ، والسِّحرُ ، وقتلُ النَّفسِ الَّتي حرَّم اللهُ إلَّا بالحقِّ ، وأكلُ الرِّبا ، وأكلُ مالِ اليتيمِ ، والتَّولِّي يومَ الزَّحفِ ، وقذفُ المحصَناتِ المؤمناتِ الغافلاتِ) [رواه البخاري]
‘‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, সেগুলো কী? তিনি বললেন,
১) আল্লাহর সাথে শিরক করা।
২) যাদু করা।
৩) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ তাআলা হারাম করে দিয়েছেন।
৪) সুদ খাওয়া।
৫) এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা।
৬) যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা।
৭) সতী-সাধ্বী ইমানদার নারীকে (ব্যভিচারের) অপবাদ দেয়া। (সহিহ বুখারি)
◈ সুদ একটি অভিশপ্ত কাজ:
জাবের রা. হতে বর্ণিত,
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ
“সুদ গ্রহীতা, সুদ দাতা, সুদের লেখক এবং সাক্ষী দ্বয়কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সকলেই সমান (গুনাহগার)।” [সহিহ মুসলিম]
সুতরাং ব্র্যাকের বিকাশ শাখায় এজেন্ট হিসেবে কাজ করা বা এর কাস্টমার কেয়ারে চাকুরি করা সুদি ব্যাংকের অধীনে চাকুরি করারই নামান্তর। এটা যেমন হারাম তেমনি তা প্রচার-প্রসার করা, বিজ্ঞাপন দেয়া, এ জন্য ঘর ভাড়া দেয়া, বিকাশ অ্যাপ রেফার করে বা বিকাশ অ্যাপে বার্ড নামক গেইম খেলে টাকা কামানো ইত্যাদি সবই হারাম। কারণ এগুলোর মাধ্যমে তাদের সুদি কার্যক্রমকে সমৃদ্ধ ও ব্যাপ্তিতে সহায়তা করা হয়। আর মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহায়তা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
❑ প্রশ্ন: বিকাশের মাধ্যমে টাকা বিকাশে টাকা লেন-দেন হয় সেটা কি বৈধ?
উত্তর: বিকল্প উপায় না থাকলে জরুরি প্রয়োজনে বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা যাবে।
❑ প্রশ্ন: বিকাশের সুদ বন্ধ করা কি কোনও সমাধান?
উত্তর: বিকাশের সুদ অপশন বন্ধ করা কোনও সমাধান নয়। কারণ গ্রাহক সুদ গ্রহণ না করলে উক্ত সুদের টাকা ব্র্যাক ব্যাংকের লাভের খাতায় যোগ হবে এবং এর মাধ্যমে তারা সুদি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে। সুতরাং তাদেরকে এ সুযোগ দেয়া ঠিক নয়। বরং যদি বিশেষ পরিস্থিতিতে বিকাশ একাউন্টে কারও টাকা জমা থাকে এবং এতে কিছু সুদ/ইন্টারেস্ট আসে তাহলে তা উত্তোলন করে গরিব-অসহায় মানুষের কল্যাণে সওয়াবের নিয়ত না করে দান করে দিবে (নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যায় করবে না)। তারপরও কোনও অবস্থায় ঐ সুদখোর ব্যাংকের জন্য তা ছেড়ে দেয়া উচিৎ নয়। অন্যথায় এমন পরহেজগার গ্রাহকের সুদের টাকায় ওরা নতুন উদ্যোমে সুদি কার্যক্রম ও তৎপরতা আরও বৃদ্ধি করবে। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল প্রকার হারাম কার্যক্রম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
---------------------
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার সউদী, আরব

No comments:
Post a Comment