Wednesday, January 6, 2021

ইবন তাইমিয়া(র.)

 


প্রাচীন দামেশক শহর। একজন বাবা তার পরিবারের সাথে বাইরে ঘুরতে যাবার আয়োজন করছিলেন। সবাই মিলে বনভোজনে যাবে। তিনি সবাইকে বেরোবার জন্য তৈরি হতে বলছিলেন কিন্তু ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অগত্যা ছেলেটাকে ছাড়াই তারা বনভোজনে গেলো। বেলা শেষে সবাই ফিরে এলো। সবাই ওকে বকছিলো কেন সে সবার সাথে গেলো না। ছেলেটার হাতে তখন ছিলো একটা বই। বইটার দিকে ইঙ্গিত করে সে বললোঃ “বাইরে ঘোরাঘুরি করে তোমাদের কোনো লাভই হয়নি। ওদিকে তোমরা যখন ছিলে না, আমি তখন এই বইটা মুখস্ত করে ফেলেছি!”

.
ছেলেটার ভিন্ন ধরণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, প্রখর স্মরণশক্তি, আর উপস্থিত বুদ্ধি দেখে দামেশকবাসী অবাক হয়ে যেতো। এগুলো তাকে দামেশকবাসীর কাছে খুব প্রিয় করে তুলেছিলো। তার বয়স খুব বেশি ছিল না, কিন্তু তার সুনাম আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিলো। একবার আলেপ্পো (হালাব) শহরের একজন আলেম দামেশকে এলেন। তাঁকে মুবারকবাদ জানাতে দামেস্কের আলেম ও নামি ব্যক্তিরা এগিয়ে এলেন। তিনি তাঁদেরকে বললেন, “সব জায়গায় শুনছিলাম যে একটা ছেলে নাকি ভীষণ তাড়াতাড়ি অনেক কিছু মুখস্ত করে ফেলে। আমি ঐ ছেলেটাকে দেখতে এসেছি।”
.
তাঁরা তাঁকে ছোট একটা মক্তবে নিয়ে এলেন যেখানে ঐ ছেলেটা কুরআন হিফজ করতে আসতো। আলেপ্পোর আলেম সেখানে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষন পর ছেলেটা কাঠের একটা টুকরা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো। তিনি তাকে ডাকলেন। ছেলেটা এলো। তিনি ওর হাত থেকে কাঠের টুকরাটি নিলেন। বললেনঃ “বাবা, এখানে একটু বসো। আমি তোমাকে কিছু হাদিস লিখতে দেবো।” তিনি ছেলেটাকে কিছু হাদিস লিখতে দিলেন। এরপর তাকে বললেন সেগুলো পড়ে শোনাতে। ছেলেটা কাঠের টুকরায় লিখে সেখান থেকে সেগুলো পড়তে আরম্ভ করলো। শায়খ বললেন, “এবার তুমি হাদিসগুলো বলো।” ছেলেটা এবার নিজ স্মৃতি থেকে একটু আগে লেখা হাদিসগুলো বলতে লাগলো। এবং হুবহু সেভাবে বলে গেলো যেভাবে একটু আগে কাঠের টুকরায় লিখেছিলো! আলেম বললেন, “বাবা, লেখাগুলো মুছে ফেলো।” এবারে তিনি আরো কিছু হাদিস বললেন। এবং আগের মতো সেগুলো একবার লিখে এরপর না দেখে বলতে বললেন। ছেলেটা আগের মতোই কাঠের উপর থেকে একবার পড়লো, এরপর হুবহু মুখস্ত হাদিসগুলো বলে দিলো। সেই আলেম দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন, “এই ছেলে যদি দীর্ঘ জীবন পায়, সে খুব বড় একটা জায়গায় যাবে। এর মতো এমন কাউকে আমরা আগে কখনো দেখিনি।”
.
পরবর্তীকালে সেই ছেলেটি পরিচিত হয়েছিলো “মজলুম আলেম” নামে। তিনি আহমাদ ইবন তাইমিয়া(র.)। তিনি তাঁর সময়ের সেরা আলেমদের থেকে ইলম শিখেছিলেন। তিনি পড়াশুনা করেন হাম্বলী মাযহাবের উপর এবং এ ব্যাপারে [দক্ষতায়] কেউ তাঁকে অতিক্রম করতে পারেনি। তিনি বুখারী, মুসলিমসহ নবী(ﷺ) এর হাদিসের প্রধান প্রধান সকল কিতাব অধ্যায়ন করেছিলেন। ইবন তাইমিয়া(র.) এমন একজন দ্বীনদার ব্যক্তি ছিলেন যিনি ইবাদতের বিভিন্ন দিকগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। কোনো কিছুই তাঁকে আল্লাহর বন্দেগী থেকে দূরে রাখতে পারতো না। তাঁর রাতগুলো কাটতো একাকী অবস্থায় আল্লাহর ইবাদতে, কুরআন তিলাওয়াতে, সলাত আদায়ে, আল্লাহর নিকট কাতর প্রার্থনায় এবং শেষ রাতে তাহাজ্জুদে।
.
ইবন তাইমিয়া(র.) তাঁর জীবদ্দশায় বহু বই লিখে গিয়েছেন। তাঁর রচিত কিতাবের সংখ্যার ৩০০র অধিক। তিনি বিপুল ইলমের অধিকারী ছিলেন এবং বহু শ্রেণীর কিতাব রচনা করেছেন। তিনি প্রত্যেক দিন ৪টার উপরে খাতা লিখে শেষ করতেন। একদিন তিনি ৭০ পৃষ্ঠার ‘রিসালাহ আল হামাওয়িয়্যাহ’ কিতাবটি লিখে ফেললেন। এই কিতাবটি তিনি যুহর ও আসরের সলাতের মাঝের সময়ে লিখে শেষ করেছিলেন! কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে যে ৭টি বছর তিনি ছিলেন, এ সময়ের মাঝেই তিনি তাঁর কিতাবগুলো লিখেছিলেন। শুধু ‘কিতাবুল ঈমান’ বাদে। এই কিতাবটি তিনি মিসরে থাকাকালে লিখেছিলেন।
.
যাবতীয় নেক কাজের জন্য ইবন তাইমিয়া(র.) সদা উৎসুক থাকতেন। প্রত্যেক সপ্তাহে তিনি হাসপাতালে অসুস্থ রোগীদের দেখতে যেতেন। যুহদ এবং পরোপকারের জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। হাতে যা আছে এর সবটাই তিনি দান করে দিতে ভালোবাসতেন; তা পরিমাণে অধিক হোক বা অল্প। তাঁর হাতে যখন খুব অল্প পরিমাণ অর্থ থাকতো, সেটাও তিনি সদকাহ হিসাবে দিয়ে দিতেন। যদি তাঁর হাতে দেবার মতো কিছুই না থাকতো, তিনি গা থেকে কিছু পোশাক খুলে সেগুলো গরিবদেরকে দান করে দিতেন। দারিদ্র্যের মধ্যে দিননিপাত করলেও তিনি কোনো বাদশাহ বা যুবরাজদের থেকে থেকে সাহায্য গ্রহণ করতেন না। তিনি নিজের জন্য কোনো অর্থ সঞ্চয় করতেন না। তাঁর বাড়িতে কোনো খাবার জমা থাকতো না এমনকি তাঁর কোনো আসবাবপত্রও ছিলো না।
.
ইবন তাইমিয়া(র.) তাঁর সাহস, মনোবল এবং নানা দৃঢ়চেতা পদক্ষেপের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। জিহাদের ময়দানে গেলে তিনি থাকতেন মুসলিমদের মধ্যে সবার সামনে। সেখান থেকে তিনি সৈনিকদেরকে উৎসাহ প্রদান করতেন, সাহস ও মনোবল বৃদ্ধি করবার চেষ্টা করতেন। আক্কাহ বিজয় অভিজানে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখানে তিনি দুর্জয় সাহসের পরিচয় দেন। সে ময়দানে সবাই তাঁর দৃঢ় ঈমান এবং জিহাদের প্রতি ভালোবাসার স্বরূপ প্রত্যক্ষ করে। তাতারদের রাজা কাজান বহু মুসলিমকে বন্দী করেছিলো। ইবন তাইমিয়া(র.) স্বয়ং তার মুখোমুখি হন, কাজানের অপকর্মের কথা উল্লেখ করে মুখের উপর তাকে ধমক দেন এবং মুসলিম বন্দীদেরকে ছেড়ে দিতে বলেন। তাঁর কথামতো কাজান মুসলিম বন্দীদেরকে ছেড়ে দিয়েছিলো।
.
ইবন তাইমিয়া(র.) এর কঠিন জীবনটা নানা প্রকার বিপদ, মুসিবত এবং পরীক্ষার মধ্যেই কেটে গিয়েছিলো। একটা বিপদ কাটলেই নতুন আরেক বিপদ এসে তাঁর জীবনে হাজির হতো। একটা কারাগার থেকে মুক্ত হলেই তিনি আরেক জায়গায় আরেক কারাগারে আবার বন্দী হয়ে যেতেন। তাঁর জীবনের একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো না কোনো লোক তাঁর বিরুদ্ধে টানা ষড়যন্ত্র করে গেছে। কারণ নবী-রাসুল (আলাইহিমুস সালাম) এবং ওলী আউলিয়াদের কবর জিয়ারতের ব্যাপারে তাঁর কিছু ফিকহী মতামত তাদের মতের বিরুদ্ধে যেতো। কাজেই ঐ লোকগুলো গুজব রটিয়ে দিলোঃ ইবন তাইমিয়া(র.) নবীদের(আ.) শানে গুস্তাখী করেন। সে অনুসারে (গুজবে ভুল বুঝে) মিসরে চার মাযহাবের কাজিরা তাঁকে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন। কাজেই তাঁকে দামেশকের দুর্গে বন্দী করে রাখা হয়।
.
সেই দুর্গের কারাগারে আল্লাহ তাঁকে বহুবিধ ইলম এবং কুরআনের সুগভীর অর্থ বুঝবার অনুপ্রেরণা দান করেন যেগুলো বুঝবার জন্য বহু আলেম সদা উৎসুক ছিলেন। সে কারাগারে বন্দী থাকাকালে তিনি বলতেন, “আমি যদি দান করতে করতে এই দুর্গটা স্বর্ণ দিয়ে ভরে ফেলি, তবু আমি এখানে বন্দী হবার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারবো না!” যারা তাঁকে কষ্ট দিতো এবং কারাগারে পাঠানোর ষড়যন্ত্র করতো, ঐ লোকদের কথা উঠলে তিনি বলতেনঃ “তারা আমার যে উপকার করেছে, এর ঋণ তো আমি শোধ করতে পারবো না!”
.
ইবন তাইমিয়া(র.) দামেশকের সেই দুর্গে মৃত্যু অবধি (৭২৮ হি.) জীবনের শেষ ২টি বছর বন্দী ছিলেন। মসজিদে তাঁর জানাজার সময়ে সৈনিকদেরকে সেই জায়গাটা ঘেরাও দিয়ে রাখতে হচ্ছিলো কারণ এতো বিপুল পরিমাণ মানুষ সেখানে এসেছিলো। লোকসমাগম বাড়তে বাড়তে সেখানকার বাজার, অলিগলি এবং রাস্তাগুলো পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো।
এই মহান আলেমকে আল্লাহ রহম করুন।
.
.
"মজলুম আলেম আহমাদ ইবন তাইমিয়া(র.)"
মূলঃ islamweb
অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান রহমান মিনার
মূল প্রবন্ধঃ “Ahmad Ibn Taymiyyah: The tortured scholar”
মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

No comments:

Post a Comment

মহিলাদের মসজিদে গমন : একটি পর্যালোচনা

জমহুর আলিমগণ একমত যে, মহিলাদের মসজিদে সালাত আদায় করা অপেক্ষা ঘরে সালাত আদায় করা উত্তম। এ ব্যপারে বেশ কয়েকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে সহিহ সনদে । এ...