কাশ্মিরের এক নির্যাতিত বোনের রক্তাক্ত চিঠিঃ
.
আমার বাড়ি দুনিয়ার জান্নাত কাশ্মিরের সীমান্তবর্তী একটি গ্রামে।
একটি ছেলে ফারদিন এবং মেয়ে রুবাইয়াকে নিয়ে ভালই যাচ্ছিলো আমার জীবন। হেসে-খেলে আমার বুকের মানিক
দুটোও বড়ো হয়ে উঠছিলো। আমার স্বামী একজন ব্যবসায়ী। অনেক ভালো মানুষ তিনি। একজন পরহেজগার লোক তিনি। সারাদিন খাটা-খাটনির তার উদ্দেশ্যই ছিলো আমাদের
ছেলেমেয়ে দুটো যেন খাঁটি মুমিন হিসাবে গড়ে ওঠে। কিন্তু মনে হয় আমাদের সংসারের সুখের আকাশে কিছু কালো মেঘ জমা হয়েছিলো।
কাশ্মিরের ওই সীমান্ত থেকে প্রায়ই ভারতীয় বিএসএফরা এসে আমাদের কাশ্মিরের অনেক গ্রামে হামলা করতো। নিরীহ মুসলমানদের অকাতরে হত্যা করতো এবং মহিলাদের
ধরে নিয়ে গিয়ে সম্মানহানী করতো। আর ছোট বাচ্চাদের ব্যানেটের আগায় গেথে দিতো। যার ফলে আমারও মনের ভিতর
একটা অদুর আশঙ্কা ছিলো এই সব ঘটনা ছিলো।
কিন্তু এটা যে আমার জীবনে ঘটতে যাচ্ছে তা আমি ক্ষুনাক্ষরেও
বুঝতে পারিনি।
ঘটনাঃ-
অন্যান্য দিনের মতো আমি উঠানের এক পাশে রান্নাঘরে রান্না করছিলাম। আমার ছেলে-মেয়েরা উঠানে তাদের মক্তবের শিক্ষকের কাছে পবিত্র কুরআন শিক্ষা করছিলো। হঠাৎ পেছন
থেকে আমার চোখ কে জানি জাপটিয়ে ধরলো। আমি অনেক
কষ্টেছাড়িয়ে দেখি আমার ছোট ভাই। আমার মন তো আনন্দে নেচে উঠলো। আমার ভাই জাফর। সে বিএসএফ দের বিপক্ষে অনেক সাধারণ লড়াই করেছে সাধারণ গ্রামবাসীদের পক্ষ নিয়ে। প্রচুর সাহসী। তো তাকে আপ্যায়ন করার জন্য আমি ভালো করে রান্নাবান্না করতে লাগলাম। আমার
স্বামীও যথারীতি এসে পৌছালো। জাফরকে দেখে তিনি তো তাকে কোলে তুলে নেন অবস্থা। কারন আমার স্বামী জাফরকে অনেক
স্নেহ করেন। তো রাতে সবাই রান্না বান্না শেষে খেতে বসলাম। হঠাৎ দরজায় ঠকঠক। দরজা খুলে দেখলাম পাশের বাড়ির এক
বোন রক্তাক্ত অবস্থায় আমার দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে। আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, আমার গ্রামের ভেতর জানোয়ার বিএসএফ হামলা করেছে। বাড়ি-ঘর লুটপাট করছে, শিশুদের হত্যা করছে, যুবকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং নারীদের উপর নির্যাতন
করছে। কেঁদে-কেঁদে সে বলতে লাগলো তার পরিবারের
সবাইকে নাকি ইতিমধ্যে বিএসএফ হত্যা করেছে।
তো আমার তো জান যায় যায় অবস্থা।
তাকে নিয়ে ঘরে এনে বসালাম। বসানোর কিছুক্ষন পরেই ঘটলো আমার জীবনের সেই কালো ঘটনাটি। প্রচন্ড শব্দে আমার
উঠানে একটি বোমা বিষ্ফোরণ হলো। এরপর কিছু বুটের আওয়াজ শোনা গেল। আমরা সবাই ঘরের ভেতর চুপ করে বসে রইলাম দরজা বন্ধ করে। তো আমার ভাই জাফর হঠাৎ করে উঠে গেলো। একটা মস্ত বড় দা নিয়ে ঘরের দরজার এক
পাশে দাড়িয়ে রইলো। তার দেখাদেখি আমার স্বামীও আরেকটা দা নিয়ে ঘরের দরজার আরেক পাশে দাড়িয়ে গেল। আমার আমাদের খাটের নীচে ঢুকে যেতে বললো। হঠাৎ কয়েকজনের বুটের লাথিতে আমার ঘরের দরজা ভেঙ্গে গেলো। হুড়মুড় করে কিছু বিএসএফ আমার ঘরে ঢুকতে চাইলো। একজন একটু ঢুকেছে, ওমনি আমার ভাই তার ঘাড়ে দিলো এক কোপ। তাদের নাপাক রক্ত ছিটকে আমার দেয়ালে গিয়ে পড়লো, আর ধড়
থেকে মাথাটা আলাদা হয়ে গেলো। মুলত আমার
বাড়িতে ২ জন বিএসএফ এসেছিলো। একজনের দেখাদেখি আরেকজন পালিয়ে গেলো এবং একটু পর আমার বাড়ি বিএসএফ কুত্তাদের দিয়ে ভরে গেলো এবং আমার ঘরের চারপাশে অনবরত গুলি করতে লাগলো। যার ফলে আমার ঘরের বেড়াগুলো চালুনির মতো হয়ে গেলো। আমি চোখ বন্ধ
করে ছিলাম। হঠাৎ খাটের নীচ থেকে তাকিয়ে দেখি আমার স্বামী এবং ভাই জাফর শহীদ হয়ে গেছে। আমি চিৎকার দিয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু পাশের বাড়ির ওই বোন আমার মুখ চিপে ধরে আমাকে আটকে রাখলো। এরপর বিএসএফ কুত্তাগুলো আসার ঘরে আসা শুরু করলো। এসেই আমাদের খাটের নীচ থেকে বের করলো এবং আমাদের পাশের বাড়ির ওই বোনকে মাথায় গুলি করে মেরে ফেললো। ওই বোনের রক্ত আমার মেঝেতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো।
এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আমার দুই সন্তান আমাকে 'আম্মু' বলে জড়িয়ে ধরলো। আমরা ৩ জন ভয়ে ঘরের এক কোনায় দাড়িয়ে গেলাম। হঠাৎ এক বিএসএফ কুকুতের লোলুপ দৃষ্টি আমার
দিকে এসে পড়লো। সে এসে আমার দুই সন্তানকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলো। আর ৪-৫ জন হানাদার কুকুর আমার উপর হামলে পড়লো।
আমি তাদের অত্যাচারে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। যখন
জ্ঞান ফিরে তখন দেখি সকাল হয়ে গেছে।
সারা শরীরের ব্যাথার কারনে আমি মেঝে থেকে উঠতে পারছিলাম না। আস্তে আস্তে আমার রাতের সব ঘটনা মনে পড়তে লাগলো। আমার চোখ দিয়ে তখনো অঝর ধারায় পানি পড়ছিলো। আমি আমার স্বামীর লাশটার দিকে খুড়িয়ে খুড়িয়ে যেতে লাগলাম। হঠাৎ আমার দুই সন্তানের কথা মনে হলো। আমি তাদের পাগলের মতো সারা বাড়িতে খুজতে লাগলাম। এরপর আমি গ্রামের ভেতর তাদেরকে খুজতে লাগলাম। সারা গ্রাম তখন কান্নার রোল পড়ে গেছে। রাতের বেলা বি এসএফরা আমাদের সারা গ্রামের যে ধ্বংসলীলা চালিয়ে গেছে সেটা আমার নিজ চোখে দেখা হয়ে গিয়েছিলো। অনেক খোজাখোজির পর এক বৃদ্ধের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে, গ্রামের বেশীরভাগ বাচ্চাদের বিএসএফরা ধরে নিয়ে গেছে। এরপর আমি প্রায় পাগলের মতো হয়ে যাই। আজও আমি সেই ভয়াবহ রাতের কথা ভুলতে পারিনা। আমার দুই চোখ আজও আমার দুই বুকের মানিককে খোজে। তবে মহান আল্লাহর কাছে আমার একটাই ফরিয়াদ, আমার চোখের প্রত্যেক ফোটা অশ্রুর
প্রতিশোধ যেন আমার অন্যান্য মুসলিম ভাইরা নেয়।
"হে মুসলিম ভাইয়েরা এখনো কি তোমরা মালাউন-হিন্দুদের অপসংস্কৃতির মায়াজালে আবদ্ধ থাকবে? স্টার জলসা আর জি সিনেমা তে পড়ে থাকবে? আর কোন তারেক বিন যিয়াদ বা মুহাম্মদ বিন কাসিম কি জন্মাবে না কাশ্মীরের মুসলিম মা-বোনের ইজ্জত রক্ষা করতে?"
("রক্তাক্ত কাশ্মীর" - নামক প্রবন্ধ থেকে...)

No comments:
Post a Comment