আমাদের আশেপাশে হরহামেশা এমন বেশ কিছু মানুষের দেখা মিলে যারা সামান্য সাহায্যের জন্য হাত পাতে।এদের মধ্যে এক গোষ্ঠী ভিক্ষা বৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। তাদের বাবা ভিক্ষুক ছিলো, এখন তারা ভিক্ষা করছে এবং সাথে সাথে তার ছোট ছেলে মেয়েকে ভিক্ষার শিক্ষা দিচ্ছে,যাদের দেখা মিলে ব্যস্ত শহরের মোড়ে মোড়ে কিংবা স্কুল কলেজের সামনে। সত্যি বলতে এদের দেখলে বড্ড মায়া লাগে, বাচ্চাগুলোর বাবা মার ইসলামের সঠিক বুঝ না থাকার কারণে আজ তারা হাত পাতার প্র্যাকটিস করছে,বড় হয়ে প্রফেশনাল ভিক্ষুক হবে।অথচ তাদের মধ্যে দ্বীনী শিক্ষার প্রচলন থাকলে হয়তো চিত্র ভিন্ন হতো,কেননা তখন তারা জানতো,যে নবীজী ﷺ বলেছেন,
"মনে রেখো, তিন ব্যক্তি ছাড়া কারো জন্য হাত পাতা বা সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল নয়।
১) যে ব্যক্তি (কোন ভাল কাজ করতে গিয়ে বা দেনার জমিন হয়ে) ঋণী হয়ে পড়েছে। ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা তার জন্য হালাল। যখন দেনা পরিশোধ হয়ে যাবে তখন সে এ থেকে বিরত থাকবে।
২) যে ব্যক্তি প্রাকৃতিক দুর্যোগে পতিত হয়েছে এবং এতে তার যাবতীয় সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার জন্য সাহায্য চাওয়া হালাল যতক্ষন না তার জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়।
৩) যে ব্যক্তি এমন অভাবগ্রস্ত হয়েছে যে, তার গোত্রের তিনজন জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন লোক সাক্ষ্য দেয় যে, “সত্যিই অমুক অভাবে পড়েছে” তার জন্য জীবিকা নির্বাহের পরিমাণ সম্পদ লাভ করার পূর্ব পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল।"[১]
অবশ্য এজন্য নিজেকেও দোষী মনে হয়। তাদের জন্য যে কিছু করতে পারছি না আমরা আর করলেও শ্রম ও সহযোগিতার সীমাবদ্ধতায় তা সীমিত কিছু মানুষের মধ্যে থেকে যায়।
কিন্তু,এই ভিড়ে কিছু মানুষ থাকে যারা এই তিন ক্যাটাগরির মধ্যে থাকে।দেখা যায় পর্দা করে বোন তার বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদের সামনে সামান্য সাহায্যের আশায় কিংবা কোনো ভাই ঋণগ্রস্থ হয়ে পথে বসতে বাধ্য হয়েছে।এরা সত্যিই আমাদের সাহায্যের হকদার আর আমাদের মুসলিম ভাই হিসেবে তাদের সাহায্য করাও আমাদের কর্তব্য কেননা, নবীজী ﷺ বলেছেন,
‘‘মু’মিনদের একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি, দয়া ও মায়া-মমতার উদাহরণ (একটি) দেহের মত। যখন দেহের কোন অঙ্গ পীড়িত হয়, তখন তার জন্য সারা দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।’’[২]
তো এরকমই অভাবগ্রস্ত এক মুসলিম ভাইয়ের ঘটনা শুনা যাক, ভাইয়ের নাম আবু নাসরুল সাইয়াদ।তিনি এরকম দুরাবস্থায় পতিত হন যে,তার পরিবারকে দু'মুঠো খাওয়ানোর মতো অর্থ তার কাছে ছিলো না। পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য সে খুব দৌড়ঝাপ করছিলো,যে করেই হোক একটা চাকুরি যোগাড় করতে হবে কিংবা অন্য কোনো উপায়,তা না হলে তার পরিবার যে না খেয়ে মারা যাবে।
এরকম পাগলপ্রায় অবস্থায় তিনি সরণাপন্ন হন তার শিক্ষক এবং আলেম আহমাদ বিন মিসকিন এর, পরামর্শ চান কি করলে রিজিকের ব্যবস্থা হবে। উল্লেখ্য আহমাদ বিন মিসকিন ছিলেন একজন তাবেয়ি যিনি সাহাবাদের থেকে শিক্ষা লাভ করেন।
আহমাদ বিন মিসকিন তার ছাত্রকে পরামর্শ দিলেন দুই রাকাত সালাত আদায় করার। সালাত আদায় করে তিনি তার ছাত্রকে নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলেন এবং সুবহানাল্লাহ আল্লাহর ইচ্ছায় ঐ ভাইয়ের জালে বেশ বড় একটা মাছ ধরা পড়ে।সে মাছটা বাজারে বিক্রি করে বেশ ভালো মূল্য পায়।এরপর সেই অর্থ দিয়ে সে দুই প্লেটভর্তি খাবার খরিদ করে যার মধ্যে এক প্লেট ছিলো মাংসের আর অপরটি মিষ্টির।
যে শিক্ষক তার এতো বড় উপকার করলো তাকে কি ধন্যবাদ না জানিয়ে পারা যায় বলেন!তাই সে আহমাদ বিন মিসকিনের কাছে যান, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তার দুইটি প্লেটের একটা দিতে ইচ্ছে প্রকাশ করেন কিন্তু আহমাদ বিন মিসকিন নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বক্তব্য পেশ করেন,তিনি বলেন,
"আমি কি তোমাকে এ আশায় সাহায্য করেছি যে এর বিনিময়ে আমি দুনিয়াতে কিছু পাবো?
যদি এমনই হতো তবে তোমার জালে মাছ ধরা পড়তো না এবং আল্লাহ পাক আমার উপদেশ এবং তোমার দিনে বরকত দিতেন না।
যাও তোমার পরিবার পরিজন নিয়ে খাওয়া দাওয়া করো"
সুবহানাল্লাহ!
আহমাদ বিন মিসকিনের নিয়ত ছিলো কেবলমাত্র আল্লাহর তরফ থেকে প্রতিদান লাভের।কোনো পার্থিব তথা ইহকালীন চাওয়া তার মনে ছিলো না কেবলমাত্র আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভই ছিলো তার উদ্দেশ্য আর তিনি তাইই শিক্ষা দিলেন।
এরপর আবু নাসরুল খাবারগুলো নিয়ে তার বাড়ি অভিমুখে রওনা দিলেন এবং পথিমধ্যে তিনি এমন এক মহিলার দেখা পান যিনি ছিলেন ক্ষুধার্ত। মহিলার সাথে ছিলো ছোট্ট ছেলে সন্তান যার নজর পড়লো ঐ খাবারগুলোর উপর।আবু নাসরুল বলেন,"ওয়াল্লাহি আমি ঐ মুহুর্তে ভুলেই গিয়েছিলাম আমার পরিবারের কথা। মনে হচ্ছিল খোদ জান্নাত দুনিয়ার বুকে নেমে এসেছে এবং ঐ মহিলা এবং তার সন্তানকে খাওয়ানোর বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশের অফার দিচ্ছে।"
তাই তিনি দেরি না করে খাবারের থালাদুটো তাদের দিয়ে দিলেন। প্রাথমিকভাবে সে নেক নিয়তে দিলেও বাসায় ফেরার পর শয়তান তার মনের সাথে খেলা করতে শুরু করে দিলো,এরকম এরকম চিন্তা জাগালো যে সে এই ভালো কাজের জন্য নিজেকে দোষতে লাগলো এবং সেই অভাবের চিন্তা আবার ভর করলো তার মাথায়।
সে হা হুতাশ করছে এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।বাইরে থেকে কেউ একজন বলছে,"হে আবু নাসরুল সাঈদ দরজা খুলো।আমি তোমার পিতার থেকে বিশ বছর আগে কিছু ঋণ নিয়েছিলাম তা শোধ করতে চাই।"
এবং সুবহানাল্লাহ সেই অর্থের পরিমাণ এতো বেশি ছিলো যে,তিনি রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেলেন।তবে তিনি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন এবং বেশি বেশি দান সাদকা জারি রাখলেন।তো এতে একসময় তার অন্তরে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ভর করলো।তার দানের পরিমাণ বাড়লেও দানে ইখলাস কমে আসলো এবং এরকম চিন্তা ভর করলো যে,সে তো দান করছেই এবং পরিমাণে তা অনেক বেশি; নিশ্চিত আল্লাহ পাক তাকে এর বিনিময়ে মাফ করে দিবেন।
এরই মধ্যে সে একটা স্বপ্ন দেখে যেখানে বিচার দিবসের চিত্র তার সামনে ফুটে উঠে।একে একে তার পালা আসলো,তার কিছু গুনাহ দাড়িপাল্লায় এক প্রান্তে তুলে অপর প্রান্তে অনেক অনেক সাদাকা তুলা হলো। কিন্তু, সেগুলো যেন তুলোর মতো,ওজনহীন। এরকম সময় তার চোখ মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।তখন সে যেই দুই পাত্র খাবার তার দুর্দশায় দান করেছিলো তা সেই সাদকার পাল্লায় রাখা হলো।এতে একটা ব্যালেন্স আসলো, কিন্তু তার তো আরেকটু আমল দরকার নইলে যে হিসাব ৫০-৫০ তে আটকে গেল।
এমন সময় সেই মহিলার চোখের জল এবং সেই ছোট্ট বালকের মুখের হাসি সেই পাল্লায় চলে আসলো যা থেকে একটা মাছ বেরিয়ে এলো এবং তার নেকীর পাল্লা ভারী করে দিলো।
এসময় একটা ফেরেশতা তাকে এসে বললো,"তুমি সফল হয়েছে, তুমি সফল হয়েছে।"[৩]
সুবহানাল্লাহ!
এ হলো ইখলাসের সাথে,নেক নিয়তের সাথে আমলের পরিণাম।আমলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত থাকায় এবং তার কাজে পার্থিব কোনো লাভের লালসা না থাকায় তা আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের কাছে সবচাইতে উত্তম আমল হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
উল্টো দিকে তার অতিরিক্ত দান পরিমাণে অত্যধিক হলেও লোকদেখানো এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী মনোভাবের সাথে মিশ্রিত ছিলো যার কারণে তা তুলা সদৃশ বস্তুতে পরিণত হয়।
তাই যেকোনো আমল করার পূর্বে অন্তরকে পরিষ্কার করা দরকার,নিয়ত সহিহ হওয়া দরকার।নিয়ত সহীহ রেখে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে আমলখানা করা হবে তার স্বীকৃতি এবং মর্যাদা সবচাইতে বেশি। আল্লাহর রাসূল ﷺ তো নিয়ত নিয়ে বলেছেনই,
"কাজ এর প্রাপ্য হবে নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।
তাই যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে- তবে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে, যে জন্যে, সে হিজরত করেছে। "[৪]
তাই যাই আমল করি না কেন,যে কাজই করি না কেন তা যে পরকাল কেন্দ্রিক হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়। নবীজী ﷺ বলেছেন,
"যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে পরকাল, আল্লাহ্ সেই ব্যক্তির অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন এবং তার যাবতীয় বিচ্ছিন্ন কাজ একত্রিত করে সুসংযত করে দিবেন, তখন তার নিকট দুনিয়াটা নগণ্য হয়ে দেখা দিবে।
আর যে ব্যক্তির একমাএ চিন্তার বিষয় হবে দুনিয়া, আল্লাহ্ তা’আলা সেই ব্যক্তির গরীবি ও অভাব-অনটন দুচোখের সামনে লাগিয়ে রাখবেন এবং তার কাজগুলো এলোমেলো ও ছিন্নভিন্ন করে দিবেন। তার জন্য যা নির্দিষ্ট রয়েছে, দুনিয়াতে সে এর চাইতে বেশি পাবে না।"[৫]
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৯৪
[২] রিয়াদুস সলেহিন, হাদিস নং ২২৯
[৩] ওয়াহি আল ক্বলাম,মুস্তফা সাদেকুন রাফেঈ
[৪] সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১
[৫] জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস নং ২৪৬৫
|| আমলে ইখলাস প্রতিদানে বিশাল ||
মাহিনুর রহমান
১৩.১২.২০

No comments:
Post a Comment