Sunday, December 6, 2020

বিতির নামাযে সুর দিয়ে লম্বা করে ‘দুয়া কুনুত’ পড়া সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর

 


بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

যারা আমাদের লেখা পড়েন তারা অবশ্যই খেয়াল করেছেন, ফেইসবুক, ইউটিউব থেকে দ্বীন শেখার ব্যাপারে আমি প্রায়শই আপনাদেরকে সতর্ক করে থাকি। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, আপনি নিজেই ফেইসবুকে দ্বীন সম্পর্কে লিখছেন, তারপরেও আপনি কেনো এমন সোস্যাল মিডিয়ার ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করেন?
আপনি যদি ফেইসবুকে শুধুমাত্র আলেমদের লেখা পড়েন বা ইউটিউবে নির্ভরযোগ্য দ্বাইয়ীদের কথা শুনেন, তাহলে সেটা আপনার জন্য কল্যাণকর, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই মাধ্যমগুলোতে যেমন ভালো কন্টেন্ট রয়েছে, সাথে সাথে ইউটিউবে ভিডিও পাবলিশ করে ডলার কামানো বা ফেইসবুকে জনপ্রিয়তা অর্জনের লোভে অনেক ‘বিভ্রান্ত’ এবং ‘জাহিল’ লোকেরাও আজকাল দ্বীন প্রচার করা আরম্ভ করেছে। অনেকে মনে করেন, আমি ভালো মন্দ পার্থক্য করতে পারি; কিন্তু সত্যিকার অর্থে তাদের অনেকেই ভুল বা খারাপ জিনিস ধরতে পারেন না। এইভাবে তারা সোস্যাল মিডিয়া থেকে ইলম শিখতে গিয়ে তারা যেমন ভালো কিছু শিখছেন, সাথে সাথে অনেক ভুল এবং গোমরাহীর শিকার হচ্ছেন।
সেইজন্য দ্বীন শিক্ষার্থী মুসলিম ভাই ও বোনদের কাছে আমি আহবান জানাচ্ছি, আপনারা দ্বীন প্রচারকারী এমন প্রত্যেক দ্বাইয়ীর কথা শুনবেন না বা তাদের লেখা পড়বেন না। আপনারা চেষ্টা করবেন বড় বড় আলেম এবং তাঁদের কাছ দ্বীন শিখেছেন এমন নির্ভরযোগ্য দ্বাইয়ী এবং বক্তাদের সংস্পর্শ থেকে দ্বীন শেখার জন্য। সেটা হতে পারে সরাসরি তাঁদের মাহফিলে খুতবা, ওয়াজ-লেকচার শ্রবণ করার মাধ্যমে, তাঁদের লিখিত বই-পুস্তক পড়ে কিংবা তাঁদের রেকর্ডকৃত ওয়াজ-লেকচার শ্রবণ করার মাধ্যমে।
আজকে আমি এমন একটা সত্যিকারের উদাহরণ দেখাবো, আলেমদের সংস্পর্শ না থেকে শুধুমাত্র সুন্দর সুন্দর আকর্ষণীয় ভিডিও দেখে দ্বীন চর্চা করতে গেলে কি ধরণের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
___________________________________
আমাদের পেইজের ইনবক্সে প্রাপ্ত একটি প্রশ্ন এবং তার উত্তরঃ
প্রশ্নঃ আসসালামু আলাইকুম।
সুর করে দোয়া করায় কি ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে?
এটা আমার অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ। এবং আমি আরবি দোয়াগুলো বিতর সালাতে সুর সহকারে করে থাকি অনেক দিন থেকেই, মক্কার ইমামদেরকে যেভাবে করতে শুনে থাকি আমরা। এবং এ কাজের জন্য আমি এ পর্যন্ত অনেক প্রাকটিস করেছি।
কিন্তু আমি শুনলাম যে এটা নাকি জায়েজ নেই। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তার সাহাবীরা নাকি এমন করতেন না।
সঠিক কিনা জানাবেন?
উত্তরঃ ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু সাহাবীরা এইভাবে সুর দিয়ে দুয়া করতেন না।
আর কুনুত লম্বা করা সুন্নত নয়। কিছু আলেম কুনুতের দুয়া ছাড়াও সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক এমন অতিরিক্ত কিছু দুয়া পড়া জায়েজ বলেছেন। কিন্তু আমার জানা মতে কোন আলেম দুয়া কুনুত লম্বা করতে আমাদেরকে উৎসাহিত করেন নি। বরং কোন কোন আলেম দুয়া কুনুতের বাহিরে অন্য কোন দুয়া পড়তে নিষেধ করেছেন।
সুতরাং নিরাপদ হচ্ছে সুন্নত আঁকড়ে ধরা এবং দলীল বিহীন কাজ বর্জন করা।
আপনি চাইলে যেকোন মুনাজাতে, দুয়া মাসুরা, শেষ রাতে কিংবা আযান ও ইকামতের মাঝখানে দীর্ঘ দুয়া করতে পারেন।
প্রশ্নঃ প্লিজ ভাই, তাহলে আমার একটি কনফিউশন দূর করলে খুব কৃতজ্ঞ থাকতাম আমি।
তাহলে মক্কা, মদীনা বা বিভিন্ন মসজিদের ইমামরা এভাবে সুর করে কেনো মোনাজাত করেন? ওনারা এই সুন্নাহবিরোধী কাজটি কেনো করেন?
উত্তরঃ আমি লিখবো ইন শা আল্লাহ।
___________________________________
প্রথমতঃ মক্কা এবং মদীনার ইমামগণ সকলেই আমাদের সম্মান এবং শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু একটা কথা সত্য, মুসলমান হিসেবে আমাদের দ্বীনের উৎস হচ্ছে ক্বুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবাদের আদর্শ। আমরা আলেমদের কাছ থেকে দ্বীন শিখি, কিন্তু তাঁরা আমাদের দ্বীনের উৎস নয় বা আমাদের জন্য কোন দলীল নন। সেইজন্য কখনো কোন আলেম বা ইমামের একটি কাজ যদি সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত না হয় তাহলে আমাদের জন্য করণীয় হচ্ছে, তাঁর প্রতি সম্মান এবং ভালোবাসা রেখেই সেই কাজটাকে বর্জন করা। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন, আমিন।
দ্বিতীয়তঃ মক্কা এবং মদীনার ইমামগণ আল্লাহ তাঁদের সকলের মর্যাদা আরো বাড়িয়ে দিন, তাঁরা সকলেই আমাদের গুরুজন এবং সম্মানের পাত্র। কিন্তু তাঁদের মধ্যে সকলেই আলেম, মুফতি বা মুহাদ্দিস নন। মক্কা ও মদীনার কোন ইমাম সুর করে দুয়া কুনুত পড়ে কিনা আমার জানা নাই। তবে তাঁদের কেউ কেউ কুনুত লম্বা করেন। তাঁদের এই কাজের বিপরীতে আরব বিশ্বের বড় একজন আলেম; যিনি দীর্ঘদিন যাবৎ মসজিদুন-নববীর শিক্ষক হিসেবে দারস দিচ্ছেন এবং বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে উত্তম একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠান “ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদীনা”র সম্মানিত প্রফেসর, শায়খ ড. সালিহ আস-সুহাইমি হা’ফিজাহুল্লাহর ফতোয়া পড়ুন।
___________________________________
(এক)
বিতিরের কুনুতে প্রচলিত ভুল থেকে সাবধানঃ
শায়খ ড. সালিহ আস-সুহাইমি হা’ফিজাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, বিতির নামাযে সুর করে দুয়া পড়ে কুনুত লম্বা করার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিলো।
শায়খ সালিহ আস-সুহাইমি হা’ফিজাহুল্লাহ উত্তরে বলেন, “নাআ’ম (হ্যা), আমি বিতিরে দুয়া করার বিষয়ে কিছু কথা বলছি, আপনারা কেউ আমার উপর রাগ করবেন না।
বিতিরে দুয়া করা সুন্নাহ, যদি সেটা দুইটা শর্ত পূরণ করে করা হয়। বিতিরে দুয়া (কুনুত) সবসময় পড়া হবেনা, দুয়া কুনুত কখনো পড়া হবে এবং কখনো ছেড়ে দেওয়া হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে নির্দিষ্ট কিছু দুয়া কুনুত বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের “জাওয়ামি আল-ক্বালিম” (অল্প কথায় ব্যাপক অর্থবোধক) দুয়াসমূহ থেকে কোন দুয়া বিতিরের কুনুতে পড়তে কোন সমস্যা নেই। তবে সেইগুলো পড়ার ব্যাপারে তিনটি শর্ত মেনে চলা উচিত।
প্রথম শর্তঃ বিতিরের কুনুতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত নির্ভরযোগ্য দুয়া পড়তে হবে অথবা, সেই দুয়াগুলোর অর্থ বহন করে এমন দুয়া হতে হবে।
দ্বিতীয় শর্তঃ বিতিরে সুর করে দুয়া পড়া যাবেনা, যা বর্তমান যুগের অনেক ইমামেরা করে থাকে। নিশ্চয়ই সুর করে দুয়া পড়া গানের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা অনেকে ক্বুরআন তিলাওয়াতের মতো করে (বিতিরের কুনুতে) দুয়া করে। সালাফদের কেউ এমন করতেন না, সালাফদের কেউ এমন করতেন না। বরং আমি আশংকা করি যে, এটা দুয়ার ক্ষেত্রে একপ্রকার সীমা লংঘন।
“গানের মতো সুর করে” বা “ক্বুরআন তিলাওয়াতের মতো” করে দুয়া পড়া জায়েজ নয়। সুতরাং আজকে যারা উপস্থিত থেকে আমার কথা শুনছো, তোমরা যারা আমার কথা শুনতে পারেনি তাদের কাছে আমার এই কথাগুলো পৌঁছে দিও। (আমার এই কথার দ্বারা) যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট হয়; তাকে সন্তুষ্ট হতে দাও। আর যে ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হয়; তাকে অসন্তুষ্ট হতে দাও।
তৃতীয় শর্তঃ বিতিরে দুয়া কুনুত লম্বা করে লোকদেরকে কষ্ট দেওয়া যাবেনা। যদি তুমি ব্যাপক অর্থবোধক দুয়া বাছাই করো, তাহলে দুয়া কুনুত লম্বা করার প্রয়োজন হবেনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের হেদায়েত হচ্ছে ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ দ্বারা দুয়া করা, যার অর্থ অচ্ছে দুয়াকে দীর্ঘায়িত না করা। হ্যা এটা সঠিক যে, স্বরকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে দুয়া করা আল্লাহ ভালোবাসেন, কিন্তু তাই বলে দুয়াকে দীর্ঘায়িত করে লোকদেরকে কষ্ট দেওয়া সঠিক নয়। অনেকে নামাযের মধ্যে ক্বিরাতের চাইতে দুয়াকে দীর্ঘ করে, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর বিপরীত, সাহাবীদের আদর্শের বিপরীত।
আমি অনেক ইমামকে দেখি, আল্লাহ তাদের জন্য কল্যাণকে সহজ করে দিন, তাদের উচিত তারা যা করছে সেই ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা। তাদের এই কাজের সাথে সুন্নাহর কোন সম্পর্ক নেই, দুয়ার শর্তসমূহের বহিঃর্ভূত।
আল্লাহু আ’লাম। ওয়া ছল্লাল্লাহু ও সাল্লাম আ’লান-নাবী।
শায়খের মূল বক্তব্যের লিংক -
ইংলিশ ট্রান্সক্রিপ্টঃ
___________________________________
(দুই)
মুনাজাতের সময় ছন্দ মিলিয়ে সুর করে দুয়া পড়া থেকে সাবধানঃ
শায়খ আব্দুল হা’মীদ ফাইজী হা’ফিজাহুল্লাহ লিখেছেন, “(দুয়ার একটা আদব হচ্ছে) কষ্ট-কল্পনার সাথে ছন্দ বানিয়ে দুয়া না করা। এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আ’নহুমা তাঁর এক ছাত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, “তুমি প্রত্যেক জুমুআ’হ (অর্থাৎ সপ্তাহে) লোকদেরকে মাত্র একবার ওয়াজ করো। যদি না মানো তাহলে দুইবার। তাও যদি না মানো তাহলে তিনবার। লোকেদেরকে (বেশি বেশি ওয়াজ করে) এই ক্বুরআনের উপর বিরক্ত করে তুলো না। আর আমি যেন তোমাকে না (দেখতে) পাই যে, কোন সম্প্রদায় তাদের নিজেদের কোন কথায় ব্যাপৃত থাকলে তুমি তাদের নিকট গিয়ে নিজের বয়ান শুরু করে দাও এবং তাদের কথা কেটে তাদেরকে বিরক্ত করো। বরং তুমি সেখানে উপস্থিত হয়ে চুপ থাকো; অতঃপর তারা সাগ্রহে আদেশ করলে তুমি বয়ান করো। আর খেয়াল করে ছন্দযুক্ত দুয়া থেকে দূরে থাকো। যেহেতু আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবাবর্গের নিকট থেকে উপলব্ধি করেছি যে, তারা এটাই করতেন। অর্থাৎ ছন্দ বানিয়ে দুয়া করা বর্জন করতেন।” সহীহ বুখারীঃ ৭/১৫৩।
উৎসঃ সহীহ দুয়া, যিকির ও ঝাড়ফুঁক।
___________________________________
(তিন)
দুয়া কুনুত দীর্ঘ করা মাকরুহঃ
ইমাম বাগাবী রহি’মাহুল্লাহ বলেন, “প্রথম তাশাহুদের মতোই যদি কুনুত দীর্ঘ করা হয় তাহলে তা মাকরুহ।” মুগনী আল-মুহতাযঃ ১/৩৬৯।
আল-ক্বাযী হুসাইন রহি’মাহুল্লাহ বলেন, “যদি কোন ব্যক্তি স্বাভাবিক অবস্থার চাইতে কুনুত দীর্ঘ করে তাহলে সেটা মাকরুহ।” মুগনী আল-মুহতাযঃ ১/৩৬৯।
*মাকরুহ অর্থ ঘৃণিত, অপছন্দনীয়, disliked.
___________________________________
(চার)
দুয়া কুনুত দীর্ঘ করার ব্যাপারে ইয়েমেনের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ মুক্ববিল বিন হাদী আল-ওয়াদী রহি’মাহুল্লাহর ফতোয়াঃ
শায়খ মুক্ববিল বিন হাদী রহি’মাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “তারাবীর নামাযে দুয়া করার হুকুম কি?”
শায়খ মুক্ববিল রহি’মাহুল্লাহ উত্তরে বলেন, “তারাবীহর নামাযে দুয়া, যেইভাবে (বর্তমানে) দীর্ঘ করা হচ্ছে, এটা একটা বিদআ’ত! এটা একটা বিদআ’ত, এটা একটা বিদআ’ত। নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান রাদিয়াল্লাহু আ’নহুকে শিক্ষা দিয়েছিলেন এই দুয়া বলার জন্যঃ
«اللَّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ، وَعَافِنِي فِيمَنْ عَافَيْتَ، وَتَوَلَّنِي فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ، وَقِنِي شَرَّ مَا قَضَيْتَ؛ فَإِنَّكَ تَقْضِي وَلاَ يُقْضَى عَلَيْكَ، إِنَّهُ لاَ يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ، [وَلاَ يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ]، تَبارَكْتَ رَبَّنا وَتَعَالَيْتَ».
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইতা ওয়া ‘আ-ফিনী ফীমান ‘আ-ফাইতা ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইতা ওয়াবা-রিক লী ফীমা আ‘ত্বাইতা ওয়াক্বিনী শাররা মা ক্বাদাইতা ফাইন্নাকা তাক্ব‌্দ্বী ওয়ালা ইউক্ব্‌দ্বা ‘আলাইকা। ইন্নাহু লা ইয়াযিল্লু মাও ওয়া-লাইতা, [ওয়ালা ইয়া‘ইয্যু মান ‘আ-দাইতা।] তাবা-রক্‌তা রব্বানা ওয়া তা‘আ-লাইতা।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি যাদেরকে হেদায়াত করেছেন, তাদের মধ্যে আমাকেও হিদায়াত দিন। আপনি যাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন, তাদের মধ্যে আমাকেও নিরাপত্তা দিন। আপনি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে আমার অভিভাবকত্বও গ্রহণ করুন। আপনি আমাকে যা দিয়েছেন তাতে বরকত দিন। আপনি যা ফয়সালা করেছেন তার অকল্যাণ থেকে আমাকে রক্ষা করুন। কারণ আপনিই চুড়ান্ত ফয়সালা দেন, আপনার বিপরীতে ফয়সালা দেওয়া হয় না। আপনি যার সাথে বন্ধুত্ব করেছেন সে অবশ্যই অপমানিত হয় না। [আর আপনি যার সাথে শত্রুতা করেছেন সে সম্মানিত হয় না।] আপনি বরকতপূর্ণ হে আমাদের রব্ব! আর আপনি সুউচ্চ-সুমহান।
এমনিভাবে বর্তমানে হারামাইনে (মক্কা ও মদীনাতে) তারাবীর নামাযে যেইভাবে দুয়া কুনুত দীর্ঘ করা হচ্ছে; এটা জায়েজ নয়। সর্বোত্তম আদর্শ হচ্ছে (নবী) মুহা’ম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ।” তুহফাতুল মুজিব আ’লা আসিলাতিল হাদির ওয়া-গারিবীঃ ১৩৭-১৩৮, শায়খ মুক্ববিল রহি’মাহুল্লাহ।
কৃতজ্ঞতাঃ Dawud Burbank.
___________________________________
(পাঁচ)
বিগত শতাব্দীর শীর্ষস্থানীয় একজন মুহাদ্দিস এবং আলেমে-দ্বীন শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী রহি’মাহুল্লাহর ফতোয়াঃ
শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী রহি’মাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “বিতির নামাযে দুয়া কুনুত পড়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য দুরুদ পড়া কি সঠিক?”
উত্তরে শায়খ বলেন, “সুনানে আন-নাসায়ীতে দুয়া কুনুতের পর দুরুদ পড়ার যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সেটা সহীহ নয়। যাই হোক, পরবর্তীতে (আমার গবেষণা থেকে) এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আ’নহুর যুগে ইমামগণ বিতির নামাযে দুয়া কুনুতের পর দুরুদ পড়তেন, (আর তৎকালীন যুগে জীবিত সাহাবাদের মধ্যে) কেউই এটাকে অপছন্দ করেন নি। সুতরাং এর প্রেক্ষিতে আমরা বলি যে, হ্যা দুয়া কুনুতের পর দুরুদ পড়া জায়েজ রয়েছে। যদিও আমরা এই কথা এখনও বলি যে, কুনুতের পর দুরুদ পড়া সম্পর্কিত হাদীস সহীহ নয়। সুতরাং কুনুতের পর দুরুদ পড়ার ব্যাপারটিকে গ্রহণ করা এবং প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে একটু পার্থক্য রয়েছে। এই ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের হাসান বিন আলী রাদিয়াল্লাহু আ’নহুমাকে দুয়া কুনুত শিখানোর পর দুরুদ পড়তে বলার কথাকে আমরা প্রত্যাখ্যান করি, কেননা সেই হাদীসটি (শায়খ আলবানী রহি’মাহুল্লাহর গবেষণা অনুয়ায়ী) জয়ীফ। কিন্তু যেহেতু উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আ’নহুর যুগে ইমামগণ বিতির নামাযে দুয়া কুনুতের পর দুরুদ পড়তেন, একারণে (সাহাবাদের আমলকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে) আমরা এটাকে জায়েজ বলি।
প্রশ্নকারীঃ যখন কোন ব্যক্তি বিতির নামাযে দুয়া কুনুত পড়ে তারপর যদি সে এই দুয়া করে
اللهم إني أسألك بخير ما سألك به عبدك نبيك صلَّى الله عليه وسلم وأعوذ بك من شر ما استعاذك منه عبدك ونبيك صلَّى الله عليه وسلم،
অর্থঃ হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি তোমার নিকট সেই কল্যাণ প্রার্থনা করছি, যা তোমার বান্দা ও তোমার নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার কাছে চেয়েছেন। আর তোমার কাছে ঐ সমস্ত অকল্যান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি, যা হতে তোমার বান্দা ও নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আশ্রয় চেয়েছেন।
তাহলে কুনুতের সময় এমন দুয়া করা কি জায়েজ?
শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী রহি’মাহুল্লাহঃ এটা যে ব্যক্তি দুয়া কুনুত মুখস্থ নেই সে করতে পারে। কিন্তু দুয়া কুনুত হচ্ছে শুধুমাত্র এই দুয়াঃ
اللهمَّ اهدني فيمن هديت
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইতা...।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি যাদেরকে হেদায়াত করেছেন, তাদের মধ্যে আমাকেও হিদায়াত দিন...। সুনানে আবু দাউদঃ ১৪২৫। শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
এটা হচ্ছে দুয়া কুনুত।
প্রশ্নকারীঃ যেমন অনেকে রমযানের সময় দুয়া কুনুতে এই দুয়াগুলো বৃদ্ধি করে পড়ে।
শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী রহি’মাহুল্লাহঃ এই কাজের কোন ভিত্তি নেই। শুধুমাত্র যদি মুসলমানেরা কাফেরদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হয় অথবা কোন বিপদাপদ আসে তাহলে কুনুতের পর অতিরিক্ত অন্য কোন দুয়া পড়া যাবে। আর এমনিতে সাধারণভাবে পড়ার জন্য কুনুত হচ্ছেঃ
اللهمَّ اهدني فيمن هديت
এর বাহিরে অন্য কোন দুয়া পড়ার অনুমতি নেই।
প্রশ্নকারীঃ উদাহরণ স্বরূপ, যখন আমি আমার বাড়িতে বিতির পড়ি এমন সময় আমি দুই হাত উত্তোলন করিনা কিন্তু যখন সামিআ’ল্লাহুলিমান হা’মীদাহ বলার পর আমি বলি,
للهم إني أسألك بخير ما سألك به عبدك نبيك صلَّى الله عليه وسلم وأعوذ بك من شر ما استعاذك منه عبدك ونبيك صلَّى الله عليه وسلم،
অথবা কুনুতের শেষে আমি বলি,
اللهم صلِّ على محمد وعلى آل محمد
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা ছল্লি আ’লা মুহা’ম্মদ ওয়া আ’লা আলি মুহা’ম্মদ।
অথবা যখন কুনুত পড়ি তখন বলি,
اللهم اجعل القرآن ربيع قلبي
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মাযআ’লাল ক্বুরআনা রবীআ’ ক্বালবী।
অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি ক্বুরআনকে আমার হৃদয়ের জন্য বসন্ত বানিয়ে দাও। শায়খ আলবানী রহি’মাহুল্লাহ হাদীসটিকে ‘সহীহ’ বলেছেন, সহীহ আত-তারগীবঃ ১৮২২।
অথবা এমন কোন দুয়া পড়ি।
শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী রহি’মাহুল্লাহঃ এটা বিধিবদ্ধ নয় যে, বিতিরের নামাযে কুনুতের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের শিখানোর দুয়া কুনুত ছাড়া অন্য দুয়া করা, এটা জায়েজ নয়।
যখন শত্রুদের পক্ষ থেকে আক্রমন আসবে, তখন সেই অবস্থার অনুপাতে দুয়া করা জায়েজ। কিন্তু সাধারণভাবে দুয়া কুনুতের সময়, নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের শিখানো দুয়া কুনুতের বেশি আমরা বাড়াবোনা।
প্রশ্নকারীঃ কুনুতে অতিরিক্ত দুয়া পড়া কি বিদআ’ত?
শায়খঃ অবশ্যই (এটা বিদআ’ত)। নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের শিখানো পদ্ধতির বাহিরে যা-ই করা হবে, সেটাই বিদআ’ত। শুধুমাত্র বিপদাপদের সময় সাময়িক অবস্থা ব্যতীত কুনুতে অতিরিক্ত দুয়া পড়া ইবাদতের মাঝে নতুন সংযোজন, যা কিনা বিদআ’ত।
প্রশ্নকারীঃ আপনি জানেন, এটা এখন সব মসজিদেই করা হচ্ছে।
শায়খঃ আমি জানিনা, এমন কোন মসজিদ আছে কিনা যারা এই কাজ করা থেকে বিরত আছে? মসজিদুল হারাম এই বিদআ’তকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে, আমি এটা জানি। শুধুমাত্র সাময়িক কারণ ব্যতীত দুয়া কুনুতে অতিরিক্ত কোন দুয়া পড়া জায়েজ নয়।
প্রশ্নকারীঃ শায়খ লোকেরা এক ঘন্টার চাইতেও বেশি বা এক ঘন্টার মতো লম্বা দুয়া কুনুত পড়ছে। শুধুমাত্র দুয়া কুনুত।
শায়খঃ আমি জানি। এটা যে বিদআ’ত, এতে কোন সন্দেহ আছে? এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা একটা বিদআ’ত। মানুষ সচরাচর যা করে, লোকেরা সেটাকেই অনুসরণ করে। সুতরাং আমাদের জন্য ফরয হচ্ছে সুন্নাহর অনুসরণ করা।
প্রশ্নকারীঃ কুনুতে এই দুয়া
اللهمَّ اهدني فيمن هديت
পড়ার পর কুনুত শেষ করার জন্য কি দুয়া পড়া যেতে পারে? আমরা পূর্ণাংগ পদ্ধিতটা জানতে চাচ্ছি।
শায়খঃ কুনুতের দুয়া পড়ার পর যেই দুয়া পড়ার সর্বজনের কাছে পরিচিত সেটা হচ্ছেঃ
وصلَّى الله على محمَّدٍ النبيِّ الأُمِّيِّ، وعلى آله وصحبه وسلم
শুধুমাত্র এতোটুকু (দুয়াই পড়তে হবে)”
নেওয়া হয়েছে
কৃতজ্ঞতাঃ Faisal Ibn Abdul Qaadir Ibn Hassan, Abu Sulaymaan,
___________________________________
(ছয়)
যদি কোন ব্যক্তি দুয়া কুনুতের প্রচলিত দুয়া اللهمَّ اهدني فيمن هديت পড়ার পর অতিরিক্ত আরেকটি দুয়া পড়তে চান, তাহলে ছোট্ট সুন্দর এই দুয়াটি পড়তে পারেনঃ
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ، وَبِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقوبَتِكَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ، لاَ أُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ، أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ».
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আঊযুবিরিদ্বা-কা মিন সাখাত্বিকা, ওয়া বিমু‘আ-ফা-তিকা মিন ‘উক্বুবাতিকা, ওয়া আঊযু বিকা মিনকা, লা উহ্‌সী সানা-আন আলাইকা, আনতা কামা আসনাইতা ‘আলা নাফসিকা।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে অসন্তুষ্টি থেকে, আর আপনার নিরাপত্তার মাধ্যমে আপনার শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই। আর আমি আপনার নিকটে আপনার (পাকড়াও) থেকে আশ্রয় চাই। আমি আপনার প্রশংসা গুনতে সক্ষম নই, আপনি সেরূপই, যেরূপ প্রশংসা আপনি নিজের জন্য করেছেন।
উৎসঃ আবু দাউদঃ ১৪২৭, তিরমিযীঃ ৩৫৬৬, নাসাঈঃ ১৭৪৬, ইবন মাজাহঃ ১১৭৯, আহমাদঃ ৭৫১। সহীহুত তিরমিযী, সহীহ ইবন মাজাহ, আল-ইরওয়াঃ ২/১৭৫।
ব্যাখ্যাঃ ইমাম ইবনুল ক্বইয়্যূম রহি’মাহুল্লাহ যাদুল মাআ’দণ্ড ১/৮৯ পৃষ্ঠায় এবং ইমাম শাওকানী রহি’মাহুল্লাহ তুহফাতুয্ যাকিরীনঃ ১২৯ পৃষ্ঠায় বলেছেন, “নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বিতরের ক্বিয়ামের পর কুনুত হিসেবে পড়েছেন।”
_______________

No comments:

Post a Comment

মহিলাদের মসজিদে গমন : একটি পর্যালোচনা

জমহুর আলিমগণ একমত যে, মহিলাদের মসজিদে সালাত আদায় করা অপেক্ষা ঘরে সালাত আদায় করা উত্তম। এ ব্যপারে বেশ কয়েকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে সহিহ সনদে । এ...