একদিন রফিক সাহেব জুম'য়ার নামাজ থেকে বাসায় ফিরলেন।বাসায় ফিরেই তিনি তার স্ত্রীকে ডাকছিলেন।স্ত্রী রাবেয়া বেগম কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন,কী হয়েছে?এতো অস্থির হয়ে ডাকছো কেনো?
--আরে,অস্থির হবো না!এতোদিন জীবনের অনেক বড়ো ভুলের মধ্যে ছিলাম।আর যে ভুলের জন্য স্বয়ং আল্লাহও আমাকে ক্ষমা করতেন না।
--রাবেয়া বেগম এবার বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,কী হয়েছে-সেটা তো আগে বলবে?
--আরে বলবো,অবশ্যই বলবো!আমার সন্তানেরা কোথায়?তাদেরকেও ডাকো।আমি তাদের সবার সামনেই কথাগুলো বলতে চাই যেনো তারা তাদের জীবনে আমার মতো এ ধরণের ভুল আর না করে।
পরিবারের প্রায় সবাইকে একত্রিত করে রফিক সাহেব বলতে লাগলেন যে,আজকে জুম'য়ার বয়ানে ইমাম সাহেব এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন যা আমার মনকে প্রচন্ডভাবে নাঁড়া দিয়ে গেলো,নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতে লাগলো।
এমনসময় বড়ো ছেলে রায়হান বলে উঠলো,কী হয়েছে,বাবা?হঠাৎ এমন বলছো যে!হুজুর কী বলেছেন?
তোর বাবাকে সে-ই কবে থেকে জিজ্ঞেস করে আসছি এখনো সেই ভূমিকাতেই পড়ে আছেন।কিছুটা বিরক্তিভাব নিয়ে বললেন স্ত্রী রাবেয়া।এদিকে মেজো ছেলে মারজানও বাবার কথাগুলো শুনতে মুখিয়ে আছে।
এবার রফিক সাহেব একটু মূল বিষয়ে আসতে শুরু করলেন।তিনি বললেন,আজকে ইমাম সাহেব উনার বয়ানে মানুষের হকের বিষয় নিয়ে খুব চমৎকারভাবে আলোচনা করছিলেন।তিনি বলছিলেন,মহান আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দিবেন যদি আমরা আমাদের গোনাহের জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।কিন্তু কোনো মানুষের হক নষ্ট করার গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন না যদি ঐ ব্যক্তি নিজে ক্ষমা করে না দেয়।এমনকি কিয়ামতের দিন নিজের আমল দিয়ে অন্যের হক আদায় করে দিতে হবে।আর এভাবে দিতে দিতে যখন হকদারের পাওনা বাকি থাকতেই সব আমল শেষ হয়ে যাবে তখন তাদের গোনাহের বোঝা নিজের উপর নিয়ে তাদের প্রাপ্য হক আদায় করতে হবে।
--স্ত্রী কথার মাঝে বলে উঠলেন,তুমি তো কারো হক নষ্ট করো নি।তাই চিন্তার কী হলো!তুমি তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো মসজিদে গিয়ে আদায় করছো,নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করছো,যাকাতও দিচ্ছো।গতো বছর হজ্জও করে আসলে।এমনকি মানুষকে দান-খয়রাত করাতেও তুমি পিছিয়ে নেই।তাই মানুষের হক আবার নষ্ট করলে কোথায়?
--রাবেয়া,আমাকে আগে আমার কথাগুলো শেষ করতে দাও।এই বলে রফিক সাহেব আগের কথাতে ফিরে গেলেন।তিনি বললেন,ইমাম সাহেবের সেই বয়ানে যাদের হকের কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে তারা হচ্ছেন বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির উপর তার মেয়ের হক।এ বিষয়টি ইমাম সাহেব এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন মনে হচ্ছিল যেনো তিনি আমাকে আঙুল দিয়ে আমার-ই অন্যায়গুলো ধরিয়ে দিচ্ছিলেন।
--তুমি তো তোমার ভাই-বোনের কোনো হক নষ্ট করো নি।আমার শ্বশুড় মারা যাওয়ার পর পরই তো তোমার ভাইদের সম্পত্তি বন্টন হয়ে গেছে। তারা স্বাধীনভাবে তাদের সম্পত্তি ভোগ করে যাচ্ছে।আর তুমিও তোমার সম্পত্তি স্বাধীনভাবে ভোগ করে যাচ্ছো।এদিকে তোমার বোনেরাও কিছুদিন পরপর আমাদের বাড়িতে এসে থেকে- খেয়ে যাচ্ছেন।তুমি তাদেরকে কতো যত্ন করো! ফলের মৌসুম আসলে তাদের বাড়িতে হরেক রকমের ফল নিয়ে যাও,রামাদান আসলে বড়ো আকারের ইফাতারী নিয়ে যাও।মাঝে মাঝে আর্থিক সহায়তাও করো।আর কী চাই?এসব বলে স্বামীর সাফাই গাইতে লাগলেন স্ত্রী।
বড়ো ছেলে বলল,হ্যাঁ,বাবা!মা তো ঠিকই বলেছেন।কিছুদিন পরপরই তো আমার ফুফুরা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসছেন।তারা আসলে আপনি খুব আপ্যায়ন করেন।কিভাবে বাজারে গিয়ে তাদের জন্য বড়ো মাছ কেনা যায়, গোশত আনা যায় ইত্যাদি কতকি নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন।তাদের হক পালনে তো কোনো ত্রুটি রাখছেন না।
মারজান বলল,বাবা!ভাইয়া তো ঠিক কথাই বলেছেন।আপনি ফুফুদের এবং তাদের ছেলেমেয়েদের যেভাবে ভালোবাসেন আর যত্ন করেন তাতে তো কোনো কিছুরই কমতি হচ্ছে না।
স্ত্রী এবং ছেলেদের মুখে এসব প্রশংসামূলক কথা শুনেও রফিক সাহেবের মন কিছুতেই স্থির হচ্ছে না।মসজিদ থেকে আসার সময় যে অস্থিরতা কাজ করছিলো সেই অস্থিরতাই যেনো কাটছে না।এমন ভাব যেনো এখনি বোনের প্রাপ্য হক দিয়ে দিতে পারলেই ভালো হতো।
এদিকে,ছোট মেয়ে সুমাইয়া বেগম দুপুরের খাবার প্রস্তুত করে সবাইকে ডেকে টেবিলে নিয়ে যাওয়াতে রফিক সাহেবের পুরো কথা আর শেষ করা হয়নি।ইতোমধ্যে,খাবার পরিবেশনের ফাঁকে মা-র কাছ থেকে সুমাইয়ারও বিষয়টি সম্পর্কে জানা হয়ে গেছে।প্রসঙ্গত,যোহরের সালাত আদায় করে পাকঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় তখন আর বাবার কথাগুলো সুমাইয়ার শুনা হয় নি।
যাইহোক,সবাই দুপুরের খাবার শেষ করে একটু বিশ্রাম নিয়ে শেষ বিকেলের দিকে আবার একসাথে বসলেন।এইবার রফিক সাহেবের একমাত্র মেয়ে সুমাইয়াও বাবার পাশে বসলো। এদিকে গ্রীষ্মকালের প্রচন্ড গরম থাকায় রায়হানকে তার বাবা ফ্যান ছাড়তে বললেন।
রফিক সাহেব যেখানে অসমাপ্ত রেখে খেতে গিয়েছিলেন সেখানে থেকেই তিনি তার কথা বলা শুরু করে বললেন,আসলে,আমার বোনের হকের প্রশ্ন উঠাতে তোমরা আমার ব্যাপারে যা যা বলেছো তা মিথ্যে বলো নি।আমি চেষ্টা করেছি আমার মা-বাবা হারা বোনদেরকে আদর যত্ন করতে,খেয়াল নজর রাখতে।কিন্তু কেবল এইগুলোতেই ভাই-বোনের হক আদায় হয়ে যায় না।বিশেষ করে বোনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তাদেরকে থাকালে খাওয়ালেই হক আদায় হয়ে যায় না।ভাইয়ের বাড়িতে এসে থাকবে খাবে এটা তাদের জন্য স্বাভাবিক একটি বিষয়।এটি তাদের অধিকার বটে।ভাইয়ের বাড়িতে এসে তারা থাকবে খাবে না-তো কোথায় যাবে তারা?আর মহান আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের পুরুষদেরকে বাবা থেকে পাওয়া সম্পত্তির ভাগ তাদের থেকে বেশি দিয়েছেন।এখন এই বেশি পেয়েও যদি আমি তাদের হক আদায় করতে কার্পণ্য করি তবে আমি কেমন নামাজী?কেমন হাজী?কেমন ঈমানদার? সর্বোপরি,কেমন মুসলিম হলাম?
ভাইয়ের বাড়িতে এসে থাকা-খাওয়ার হকের বাইরেও তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হক রয়েছে। সেটি হচ্ছে সম্পত্তির হক।আফসোসের বিষয় হচ্ছে,আজকের সমাজে আমরা এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেই না বললেই চলে।এমন বিষয়ের গুরুত্ব আমাদের উপলব্ধিও হয় না।তাই তো বোনদেরকে তাদের প্রাপ্য হক থেকে বঞ্চিত রেখেই চলছি।এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে কোনো চিন্তা যেমন কাজ করে না তেমনি কোনো অনুতাপও কাজ করে না।
শোনো,সারা জীবন-ই যদি বোনদেরকে তাদের ভাইয়ের বাড়িতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়,ফলের মৌসুমে ফল দিয়ে যাওয়া হয়,রোজার সময় ইফতারি দিয়ে যাওয়া হয়, সবসময় আর্থিক সহায়তা করে যাওয়া হয় তবুও তাদের পাওনা সম্পত্তির হকের এক বিঘত পরিমাণ সম্পদেরও হক আদায় হবে না,হবে না।সম্পদের হক সম্পদ দিয়েই আদায় করতে হয়।কেবল থাকালে খাওয়ালেই কিংবা বড়ো পরিসরে ইফতারি দিলেই তাদের প্রাপ্য সম্পত্তির হক আদায় হয়ে যায় না।
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই তো আমরা ভাই-ভাইয়ে সম্পত্তি বন্টন করে ভোগ করে খাচ্ছি।কিন্তু কখনোই বোনদের হক আদায় করার চিন্তাই করিনি।বোনদেরকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত রাখার মানে বোনদের হক নষ্ট করা,বোনদের উপর মস্ত বড়ো যুলুম করা।আর আমি আমার বোনের হক নষ্ট করে,বোনের উপর যুলুম করে মহান আল্লাহর জবাবদিহিতা থেকে কিভাবে রক্ষা পাবো?কিভাবে ক্ষমা পাবো?
স্ত্রী রাবেয়া বেগম কিছুটা উত্তেজিত কন্ঠে বললেন, দেখো!রায়হানের বাবা,এইসব আজকাল কেউ দেয়-টেয় না।এমনকি আমাদের পাশের বাড়ির লন্ডনী প্রবাসী ফারুক ভাইয়ের দুই-তিনটি বাড়ি আর অঢেল সম্পত্তি থাকার পরও উনার আপন দুই বোন যাদের আর্থিক অসচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও তাদের সম্পত্তির ভাগ এখনও ফিরিয়ে দেন নি। তাছাড়া,তোমার বোনেরা তো আর তাদের সম্পত্তির ভাগ নেওয়ার জন্য কিছু বলছে না।তারা তো আমাদের এখানে আসা-যাওয়াই করছে।তুমি কেনো শুধু শুধু এসব বিষয় সামনে টেনে নিয়ে আসছো?এদিকে তোমার সম্পত্তিও যে খুব রয়েছে তেমনটাও নয়।যা আছে তা তোমার নিজের সন্তানদেরই পুষবে কিনা এসব নিয়ে চিম্তা না করে তুমি এখন অন্যের হক দিতে অস্থির হয়ে যাচ্ছো।তোমার তো আরও ভাইয়েরাও রয়েছেন।যেখানে তারা তাদের বোনের হক নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না সেখানে তুমি কেনো এতো মাথা ঘামাচ্ছো?
ছেলে রায়হান মা-র সাথে একমত হয়ে বলল, সত্যিই তো বাবা!ফুফুদেরকে আমাদের সম্পত্তি থেকে তাদের হক দিয়ে দিলে আমাদের সম্পদও কমে যাবে।সেক্ষেত্রে আমাদের কী হবে?
মারজানও তার মা ও বড়ো ভাইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে বলল,বাবা!আমার ফুফুরা আর্থিকভাবে খুব দুর্বল নন।আমাদের ফুফারাও তো বেশ সচ্ছল।তাই তাদের এসবের প্রয়োজন-ই নেই।তাছাড়া,তারা তো এসব নেওয়ার জন্য কিছু বলছেনও না।তাই আমরা কেনো আমাদের সম্পত্তি থেকে তাদেরকে দিতে যাবো!আর আজকাল এসব কেউ দেয়ও না।কাজেই আমরা কেনো তাদের হক ফিরিয়ে দিয়ে শুধু শুধু আমাদের সম্পদ কমাতে যাবো,বাবা?
দেখো রাবেয়া,আমার কোনো ভাই তার বোনের হক আদায় করলো কিনা সেটা আমার দেখার বিষয় নয়।আমার দেখার বিষয় হচ্ছে আমি আমার জায়গা থেকে তাদের হক পালন করছি কিনা।কারণ মৃত্যুর পর মহান আল্লাহ তা'য়ালা প্রত্যেককে পৃথক পৃথকভাবে তার উপর থাকা অন্যের হকের হিসাব নিবেন।তখন কিন্তু আমি আমার ভাইয়ের দোষ দিয়ে পার পাবো না।আমাকেই আমার উপর ন্যস্ত থাকা মানুষের হক আদায়ের হিসেব দিতে হবে।
অবশ্য,আমি আমার ভাইদের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলবো।তাদেরকে বিষয়টি অবগত করবো।কিন্তু কোনো কারণে তারা দিতে না চাইলেও আমি এমন বিষয় নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবো না।আমি যেমনটা বলছিলাম যে,আমি আমার নিজ অবস্থান থেকে আমার উপর থাকা মানুষের হক আদায় করে দায়মুক্ত হয়ে থাকতে চাই যাতে কিয়ামতের দিন এসব নিয়ে আমাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হয়।আর আমি কোনোভাবেই আমার আখিরাতের জীবনে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হতে চাই না।
এই তো আজকে ইমাম সাহেব উনার বয়ানে স্পষ্ট করে বলছিলেন যে,পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন,
আত্নীয় স্বজনকে তাদের (যথার্থ) পাওনা আদায় করে দেবে, অভাবগ্রস্থ এবং মোসাফেরদেরও (তাদের হক আদায় করে দেবে) কখনো অপব্যয় করো না। [১]
আল্লাহ আরও বলেছেন যে,
আত্মীয় স্বজনকে তার প্রাপ্য অধিকার আদায় করে দাও, অভাবগ্রস্থ মোসাফেরদেরও (নিজ নিজ পাওনা বুঝিয়ে দাও) এ (বিষয়টি) তাদের জন্য উত্তম যারা একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি কামনা করে,আর (সত্যিকার অর্থে) এরাই হচ্ছে সফলকাম। [২]
এখন এই আয়াতের আলোকে তোমরাই বলো, আমরা কি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করি না?আমরা কি সফলকামের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই না?
--স্ত্রী বললেন,হ্যাঁ তা চাইবো না কেনো?
সন্তানেরাও সবাই বলল,হ্যাঁ,বাবা আমরা তো সফলকামই হতে চাই।
--তাহলে আল্লাহ তো ঐ আয়াতে বলেই দিয়েছেন যে,আত্নীয়ের হক আদায়কারী সফলকাম।এই আয়াত আত্মীয়ের হক আদায়ের ব্যাপারে খুবই অনুপ্রেরণামূলক একটি আয়াত।কেননা এখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আত্মীয়ের হক আদায়কারীকে সফলকাম হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন।আত্নীয়ের হক আদায়ের ব্যাপারে একজন বান্দার জন্য তার রবের কাছ থেকে এর চেয়ে বড়ো মোটিভেশন আর কী হতে পারে?এখন আল্লাহ যে কাজ করাকে সফল বলেছেন সে কাজ করাতে কি তোমাদের কাছ থেকে আমার অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা নয়?
--সবাই একযোগে বললেন,হ্যাঁ,তা তো অবশ্যই।
--শোনো,আল্লাহ তা'য়ালা বান্দাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন,
তোমরা একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায় অবৈধভাবে আত্মসাত করো না,(আবার) জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদের কোনো অংশ ভোগ করার জন্য বিচারকদের সামনে ঘুষ হিসেবেও পেশ করো না। [৩]
আল্লাহ তা'য়ালা আরও বলেছেন,
(হে ঈমানদার ব্যক্তিরা) আল্লাহ তা'য়ালা তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন,তোমরা আমানতসমূহ তাদের (যথার্থ) মালিকের কাছে সোপর্দ করে দিবে,আর যখন মানুষের মাঝে (কোনো কিছুর) ব্যাপারে ফায়সালা করো তখন তা ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে করবে; আল্লাহ তা'য়ালা তার মাধ্যমে তোমাদের যা কিছু উপদেশ দেন তা সত্যি সত্যিই সুন্দর!আল্লাহ তা'য়ালা সবকিছু দেখেন ও শোনেন। [৪]
আমার কাছে থাকা বোনদের প্রাপ্য হক আমানত। আমানত রক্ষার বিষয়ে আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন।আর আল্লাহর সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা কারো জন্য শোভনীয় নয়।আল্লাহর সতর্কবার্তা উপেক্ষা করলে বড়ো কঠিনভাবে এর মাশুল দিতে হবে।সুতরাং বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এবার তোমাদেরকে আত্নীয়ের হক আদায় না করার ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছু হাদীস বলি যা ওই ইমাম সাহেবের মুখ থেকেই শোনা।রাসুল (সা) বলেছেন,
'যে ব্যক্তি কারো উত্তরাধিকার সম্পত্তি গ্রাস করে,আল্লাহ তাকে জান্নাতের অংশ থেকে বঞ্চিত করবেন'। [৫]
এখন তোমারা কি চাও,সামান্য দুনিয়ার সম্পদের জন্য আমি জান্নাতের অংশে থেকে বঞ্চিত হয়ে যাই?তোমরা কি চাইবে না,দুনিয়ার সামান্য সম্পদের বিনিময়ে হলেও আমি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হই?
রাসূল (সাঃ) বলেছেন,
যে ব্যক্তি কারো জমি এক বিঘত পরিমাণ অন্যায়ভাবে দখল করে নেবে, (কিয়ামতের দিন) সাত তবক (স্তর) জমিন তার গলায় লটকে দেওয়া হবে।’’ [৬]
আবার,তোমরা কি চাও,আমার বোনের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'য়ালা আমার গলায় সাত তবক জমিন লটকিয়ে দিন?আরে!যেখানে আমি আমার সামান্য ঘাড়ের ব্যাথার কারণে সামান্য ভারী ব্যাগই বহন করতে পারি না সেখানে আমার গলায় সাত তবক জমিন লটকানোর মতো চরম ভয়ঙ্কর অবস্থার কথা কি তোমরা কল্পনা করতে পারো?
স্ত্রী ও সন্তান হিসেবে তোমরা কি আমাকে সেই ভয়াবহ আযাব থেকে বাঁচতে সাহায্য করবে না? তোমাদের প্রতি আমার সামান্য ভালোবাসা কি তোমাদের মনে এতোটুকু দয়া সৃষ্টি করতে পারে না?
তোমরা কি জানো,গা শিউরে উঠার মতো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় কী?সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় যা হাদীসে এভাবে এসেছে যে,
একবার রাসুলূল্লাহ (সাঃ) তাঁর পাশে উপবিষ্ট সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) কে বললেন-তোমরা কি জানো,গরীব কে?সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) বললেন-আমাদের মধ্যে তো গরীব তাদেরকে বলা হয়,যাদের কাছে ধন-সম্পদ,টাকা-পয়সা নেই। তখন রাসুলূল্লাহ (সাঃ) বললেন-প্রকৃত পক্ষে আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে গরীব (অভাবী) সে,যে কিয়ামতের দিন নামায,রোযা,যাকাত, সবকিছু নিয়ে উঠবে,কিন্তু সে এ অবস্থায় আসবে যে,সে দুনিয়াতে কাউকে গালি দিয়েছে তথা কারো সাথে খারাপ আচরণ করেছে,কারো নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে,কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কাউকে আঘাত করেছে,কাউকে খুন করেছে ইত্যাদি।তাই এর বিনিময়ে কিয়ামতের দিন তার কিছু নেকী একে দিবে,কিছু নেকী ওকে দিবে। এভাবে দিতে দিতে বান্দার হক আদায়ের পূর্বে যদি তার নেকী শেষ হয়ে যায়,তাহলে এই হকদারদের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।[৭]
বুঝলে এবার,তার চেয়ে বড়ো হতভাগা আর কে হতে পারে যে সালাত,সিয়াম,হজ্জ তথা এতো এতো নেক আমল করলো কিন্তু কিয়ামতের দিন তার নেক আমল দিয়ে তার হকদারদের হক দিতে দিতে আর কোনো নেক আমলই তার অবশিষ্ট থাকলো না বরং অন্যের গোনাহের বোঝা কাঁধে নিতে হলো?
সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে,আমাদের কারো নিজস্ব সম্পত্তি থেকে আমার বোনদের সম্পত্তি দিচ্ছি না।বরং বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বোনদেরকে না দিয়ে যে আমরা তাদের সম্পদ ভোগ করে যাচ্ছি কেবল সেই সম্পত্তি-ই তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে চাই।আর তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া মানে তাদেরকে দয়া করা নয়।কেননা এটা তাদের প্রাপ্য হক।আর হক কখনো দয়া হয় না।বরং তাদের পাওনা যথাযথভাবে আদায় করে দেওয়া মানে নিজের উপরই এক ধরণের দয়া করা।কারণ এতে তো নিজেকেই জাহান্নাম থেকে বাঁচানো হলো।আর নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর চেয়ে নিজের প্রতি বড়ো দয়া আর কী হতে পারে?
দেখো,তাদের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো কিনা সেটাও আমাদের দেখার বিষয় নয়।এমনকি তারা যতোই বিত্তশালী হোন না কেনো তবুও আমরা তাদেরকে তাদের হক দেওয়া থেকে বঞ্চিত রাখতে পারি না।তাদের বিত্তশালী কিংবা আর্থিক সচ্ছলতার সাথে হকের কোনো সম্পর্ক নেই।হক সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়।তোমরা নিজেই একটু চিন্তা করে দেখো তো,তোমাদের অনেক সম্পদ থাকার পরও যদি কেউ তোমাদের যথার্থ হক আদায় না করে তাহলে তোমাদের কেমন লাগবে?তখন কি নিজের আর্থিক সচ্ছলতার কথা ভেবে নিজের হক অনাদায় থাকার বিষয়টিকে সহজে মেনে নিতে পারবে?
রায়হান বলল--হ্যাঁ,তা তো আপনি ঠিকই বলেছেন,বাবা।সেটা তো মেনে নেওয়া যাবে না।অন্যেরাও একই স্বরে কথা বললো।
এবার ছোটো ছেলে জিজ্ঞেস করলো,আচ্ছা, বাবা!যদি ফুফুরা তাদের সম্পদ নিতে না চান তাহলে কী হবে?
--সেটা কেনো হবে রে বাবা?তবে হ্যাঁ!তাদের হক দেওয়ার সময় তারা যদি সত্যি সত্যি খুশি মনে তা নিতে না চান তবে সেটা ভিন্ন বিষয়।তখন অন্তত আমাদের দায়মুক্ত থাকা হবে।কিন্তু তারা কেনই-বা নিবে না!
যাইহোক,আমার সম্পত্তি থেকে আমার ছেলেমেয়েদের পুষবে কিনা সেই প্রশ্নেও আমি অন্যের হক কোনোভাবেই ভোগ করে যেতে পারি না।এটা কোনো কথাও হতে পারে না।যদি মহান রাব্বুল আলামিন আমাকে কোনো সম্পত্তিই না দিতেন তবে কি আর আমার সন্তানদেরকে সম্পত্তি দেওয়াতে পুষবে কি পুষবে না-এমন প্রশ্ন আসতো?
আর আমার বোনেরা আমার কাছ থেকে তাদের হক চেয়ে নিবে কেনো?তাদের হক আমার নিজের-ই কি বুঝিয়ে দেওয়া উচিত নয়?
আচ্ছা!রাবেয়া,মনে করো,তোমার বাবা তোমার ভাইকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বললেন তোমাকে এক হাজার টাকা দিয়ে দেওয়ার জন্য।আর বাকি টাকা উনার বলা অনুযায়ী তোমার অন্য ভাইবোনদেরকে দিয়ে দিতে বললেন।
আর এই খবরটা তুমি একসময় অন্য কোনো মাধ্যমে জানতে পারলে যে,তোমাকে তোমার ভাইয়ের এক হাজার টাকা দেওয়ার কথা কিন্তু এখনো তিনি দেন নি।এখন এই টাকার জন্য তুমি কি তোমার ভাইয়ের কাছে চাইতে যাওয়ার কথা ছিল অর্থাৎ ভাইয়ের কাছে গিয়ে তোমার কি চেয়ে নিয়ে আনার কথা নাকি টাকাটা তোমার ভাইয়ের ইতোমধ্যে নিজ দায়িত্বে তোমাকে দিয়ে দেওয়ার কথা ছিল?
রাবেয়া বেগম কিছুটা আমতা আমতা করে বললেন,আমি কেনো চাইতে যাবো!আমার ভাই-ই তো নিজ দায়িত্বে টাকাটা দিয়ে দেওয়ার কথা। কারণ টাকাগুলো তো দেওয়ার দায়িত্ব উনার উপর ছিল।
--এইতো!ওটা যদি তুমি বুঝতে পারো তবে এটা কেনো বুঝতে পারছো না যে,আমার বোন তার পাওনা আমার কাছ থেকে চেয়ে নিবে কেনো?বরং এটা আমার দায়িত্ব যে, বোনের জিনিস বোনকে নিজ দায়িত্বে ফিরিয়ে দেওয়া,বোন এসে আমার কাছ থেকে চেয়ে নিবে সেটির জন্য অপেক্ষায় থাকা নয়।সুতরাং আমার কি উচিত নয় নিজে থেকেই আমার বোনের পাওনা তথা হক ফিরিয়ে দেওয়া?
রায়হানের বাবার এমন কথা শুনে নিশ্চুপ হয়ে থাকা ছাড়া যেনো আর কিছুই করার থাকলো না বেগম সাহেবার।তিনি যেনো আর কিছু বলারও পাচ্ছিলেন না।তাই চুপ রইলেন।
এদিকে রফিক সাহেব তার কথা বলতেই থাকলেন,আমার বোনেরা হয়তো সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ভয়ে তাদের হক দাবি করছে না।কিন্তু তাই বলে আমি তো তাদের হক নিয়ে বসে থাকতে পারি না।আমার উচিত তাদের প্রাপ্য অনুযায়ী তাদের হক যথাযথভাবে আদায় করে দেওয়া, তারা দাবি করে তাদের হক নিবে এমনটার উপর অপেক্ষা করে বসে থাকা নয়।আর আমি যদি নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে আমার বোনের হকগুলো যথাযথভাবে আদায় করে দেই তবে তারা নিশ্চয়ই তাদের হক পেয়ে অনেক খুশি হয়ে অন্তর থেকে দোয়া দিবে।আর তাদের এমন দোয়াই হতে পারে আমার জন্য এমনকি আমাদের পুরো পরিবারের জন্য নাজাতের উসিলা।
অনেকক্ষণ ধরে নিশ্চুপ হয়ে দুই গালে হাত রেখে মনোযোগী সন্তানের মতো শুনতে থাকা বাবা-মার আদরের একমাত্র মেয়ে সুমাইয়া তার মা-র দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
মা!বাবা তো ঠিকই বলেছেন।উনি তো চাচ্ছেন উনার বোনের হক মিটিয়ে দিতে।আজকাল যেখানে অধিকাংশ মানুষেরাই তাদের বোনের হক পালনে উদাসীন এমনকি কোনো বোন ভাইয়ের কাছে নিজের হক দাবি করতে গেলে ভাইদের ক্রোধ,অপমানের স্বীকার হতে হয় এবং অনেকসময় সম্পর্কও ছিন্ন হওয়ার অবস্থার মুখামুখি হতে হয় সেখানে বাবার এমন মহৎ কাজে তুমি কেনো দ্বিমত করছো,মা?বাবার এমন কাজ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।বাবার এমন মহতী কাজ থেকে আমাদের সবার-ই অনেক কিছুই শিখার আছে।
সুমাইয়ার কথা শুনে মা কিছু বলবেন এমন সময় বাবা তার ছেলেদেরকে লক্ষ্য করে বললেন,বাবারা আমার!দেখো সম্পদ আল্লাহর দেওয়া অনেক বড়ো একটি নিয়ামত।এই নিয়ামত সবার ভাগ্যে সমানভাবে জুটে না।কারো সম্পত্তি কম আবার কারো সম্পত্তি বেশি।এই পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষও রয়েছেন যাদের সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই।দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টাই রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।আহারে!তাদের জীবন কতোই-না কষ্টের,কতোই-না মানবেতর।এগুলো নিয়ে একটি বার ভাবার চেষ্টা করো,নিজেকে তাদের করুণ অবস্থানে দাঁড় করিয়ে কল্পনা করার চেষ্টা করো। তখনো বুঝতে পারবে,তুমিই হচ্ছো সবচেয়ে বড়ো ধনী,তুমিই হচ্ছো সবচেয়ে বড়ো সুখী।
দেখো,আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা কিন্তু চাইলেই আমাদেরকেও তাদের মতো করুণ অবস্থায় রাখতে পারতেন।তখন আমাদেরও কিছুই করার থাকতো না।রাস্তায় যা পাওয়া যেতো তা-ই নিয়েই থাকতে হতো।কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে আমরা ঐ ধরণের অবস্থানে নই।আলহামদুলিল্লাহ!আমরা আরও অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছি।আমাদের সম্পদও আল্লাহ তা'য়ালা মোটেও কম দেন নি।যা-ই দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ!
এখন এই সম্পত্তি পেয়েও যদি আমরা সম্পদের লোভে পড়ে সম্পদ কমে যাওয়ার ভয়ে অন্যের হক আদায় না করি তবে তাতে আল্লাহর প্রতি এক ধরণের অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ পাবে।কেননা যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা আমাকে অন্য অনেক মানুষের থেকে ভালো অবস্থানে রেখেছেন, সহায়-সম্পত্তি দিয়েছেন সেখানে কিভাবে আমি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী অন্যের হক আদায় না করে থাকতে পারি?
হ্যাঁ!আমার সম্পদে থাকা তোমার ফুফুদেরকে তাদের হক দিয়ে দিলে আপাতদৃষ্টিতে সম্পত্তি কমেছে বলে মনে হতে পারে।কিন্তু বাবা রে,এই সম্পত্তিই তো একদিন আমার কাছে ছিল না,ছিল না সম্পদশালী হওয়ার কোনই যোগ্যতা।কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালাই আমাকে দয়া করে এসব ধন-সম্পদ দিয়েছিলেন।
একটা কথা বলি,বাবারা আমার!যখন তুমি নিজের সম্পদ কমছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য না করে তোমার সম্পদের উপর থাকা অন্যের হক আদায় করে দিবে তখন দেখবে তোমার হৃদয়ে এক ধরণের প্রশান্তির হাওয়া বইছে!বিশ্বাস করো, তখন নিজের মনে অন্য রকম এক শান্তি লাগবে। এমনকি যখন তুমি কারো হক আদায়ের জন্য কেবল মনস্থির করবে ঠিক তখন থেকেই মনের মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তি বওয়া শুরু করবে যা আমি এখন প্রচন্ডভাবে অনুভব করতে পারছি।এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক ধরণের শান্তি যা হাজার কোটি টাকার বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েও এর কিঞ্চিৎ পরিমাণও শান্তি পাওয়া যায় না।
এজন্য প্রকৃত শান্তি পেতে হলে অন্যের হক পাই পাই করে আদায় করে দিতে হবে।আর তোমরা সম্পদ নিয়ে কখনো চিন্তা করো না রে,বাবা।যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থেকো, আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।আল্লাহ এগুলোতেই বারাকাহ দিবেন।বারাকাহ এমন এক জিনিস যা আল্লাহ তা'য়ালা না দিলে সারা পৃথিবী তোমার হলেও তুমি সুখ পাবে না।পক্ষান্তরে,আল্লাহ যদি বারাকাহ দেন তবে তোমার তেমন কিছু না থাকলেও যা-ই আছে তাতেই দেখবে তুমি পরম সুখ অনুভব করছো।
আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে সম্পদ দেন।আবার যাকে ইচ্ছা তার কাছে থেকে সম্পদ ছিনিয়েও নেন যেমনটা আমরা দুনিয়ার বাস্তবতা থেকে অহরহ দেখতে পাই।আল্লাহ চাইলে তোমরাও হয়তো একদিন নিজ পরিশ্রমে অনেক সম্পদশালী হবে।আর দুনিয়াতে সম্পদশালী না হলেও কোনো আফসোস করো না,হতাশ হয়ো না।কিভাবে আখিরাতে সম্পদশালী হওয়া যায় সেটাই যেনো সবসময় তোমাদের চিন্তায় থাকে, তোমাদের লক্ষ্যে পরিণত হয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“প্রত্যেক উম্মতের জন্য একটি বিশেষ ফিতনা বা পরীক্ষা রয়েছে।আর আমার উম্মতের জন্য সেই ফিতনা হলো ধন সম্পদ।” [৮]
এই হাদীসটি আমাদের জন্য অনেক বড়ো একটি সতর্কবার্তা।ধন-সম্পদ যে অনেক বড়ো একটি ফিতনার কারণ হবে তা রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে আগেই জানিয়ে রেখেছেন।এখন এরপরও যদি আমরা সম্পত্তির লোভ থেকে,সম্পত্তির মায়া থেকে বেরিয়ে আসতে না পারি তবে আমাদের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
একটু চিন্তা করো তো,কী হবে এসব সম্পদ দিয়ে যদি আমি এক্ষুনি মারা যাই!এগুলো দিয়ে কিছুই হবে না রে বাবা!সম্পত্তি সম্পত্তির জায়গায়-ই থেকে যাবে।কেবল থাকবো না আমি,থাকবে না তোমরাও একদিন।
তাই শুধু শুধু অন্যেকে ঠকিয়ে,অন্যের হক নষ্ট করে কী লাভ?কী লাভ নিজের পাপের বোঝা ভারী করে?অন্যের হক চির জীবনের জন্য তো আর ধরে রাখতে পারবো না।একদিন তো সবাই মারাই যাব।তাই সময়মতো অন্যের হক অন্যেকে বুঝিয়ে দেওয়াই কি শ্রেয় নয়?একজন মানুষ তার হকের অংশ পেয়ে ভোগ করে দুনিয়া থেকে যাক সেটাই আমার চাওয়া।অন্যের হক নিজের ঘাড়ে রেখে আমি আরাম-আয়েশ করে যাবো আর হকদাররা তা চেয়ে চেয়ে মনে কষ্টে ভুগতে থাকবে তা আমি কক্ষণোই সহ্য করে যেতে পারি না।যার যার যেই হক তার তার সেই হক পরিপূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেওয়াই একজন মুসলিমের দায়িত্ব।আর আমি একজন মুসলিম হয়ে এমন দায়িত্বে কোনো গাফিলতি করতে পারি না।নিজেকে মানুষের হক পাওয়া থেকে মুক্ত রেখে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চাই রে বাবা।
মৃত্যুর পর কবরের জিন্দেগী যদি আরামের-ই না হলো তবে জীবনটাই তো বৃথা।তাই দুনিয়াতে এতো ভোগ-বিলাসীর জন্য ব্যস্ত না হয়ে কিভাবে কবরের জিন্দেগীতে, আখিরাতের জিন্দেগীতে ভোগ-বিলাস করা যায় সেগুলোর জন্যই দুনিয়ার জীবনে ব্যস্ত থাকা সবচেয়ে বেশী কল্যাণকর।
এভাবেই রফিক সাহেব তার ছেলেদেরকে আবেগী কন্ঠে দীর্ঘ সময় ধরে বোঝাচ্ছিলেন যেনো তারা উপলব্ধি করতে পারে যে,বাবা আসলে কেনো তার বোনের হক ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেন।
বাবার চমৎকার বিশ্লেষণ এবং মহান আল্লাহর জবাবদিহিতার এতো ভয় তথা তাকওয়া দেখে সন্তানেরা নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলো না।ছোট ছেলে রীতিমতো নিচের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো।হয়তোবা চোখ দিয়ে পড়া নিজের অশ্রু অন্যেদেরকে দেখাতে চায়নি।তবে বুঝতে আর বাকি নেই যে,কথাগুলো তাদের হৃদয়ে লেগেছে।তারাও বুঝতে পেরেছে দুনিয়ার তুচ্ছতা,বুঝতে পেরেছে সম্পদের মোহ ত্যাগ করার আসল অর্থ,সর্বোপরি বুঝতে পেরেছে অন্যের হক আদায়ের গুরুত্ব।
স্বামীর এতো সুন্দর ভাবনা দেখে রাবেয়া বেগমও নিজের অজান্তেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পরলেন।চোখের কোণদ্বয় মুছতে মুছতে মনে মনে ভাবলেন তাকওয়াই মানুষের চিন্তা-ভাবনা, চালচলন ইত্যাদি সবকিছুই বিশুদ্ধ করে তুলে, পরিণত করে তুলে খাঁটি মানুষে।আর এমন তাকওয়াবান স্বামী পেয়ে নিজেকে আরো গর্ববোধ করতে লাগলেন, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে লাগলেন।
এদিকে আবেগী হয়ে পড়া সুমাইয়া কিছুক্ষণ পর তারা বাবাকে বললো,তবে কি বাবা, আমরা আমাদের নানুর বাড়ি থেকে আমাদের মায়ের হক পাবো।সুমাইয়ার এমন কথা শুনে তার বাবা মৃদু হেসে বললেন,এ কথা তোমার মাকেই জিজ্ঞেস করো।মা-ও হেসে হেসে বিষয়টি ওখানেই শেষ করে দিলেন।
অবশেষে,যে স্ত্রী তার স্বামীর বোনের হক আদায়ের ব্যাপারে অসম্মতির স্বরে কথা বলে আসছিলেন তিনিই এখন সম্মতির স্বরে কথা বলা শুরু করলেন।
আর তারা ভাই-বোনও তাদের ফুফুর হক আদায় করে দেওয়ার জন্য খুশি মনে সম্মতি প্রকাশ করলো।আর এভাবেই রফিক সাহেব সুন্দর করে বুঝিয়ে পরিবারের সবার কাছ থেকে বোনের হক আদায়ের ব্যাপারে সম্মতি আদায় করে নিলেন। যদিও তিনি কারো কাছ থেকে সম্মতি না পেলেও বোনের হক আদায় করা থেকে পিছপা হতেন না বলে প্রথম থেকেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।কারণ বোনের হক আদায় না করার দায় কিন্তু পরকালে তাকেই ভোগ করতে হবে,পরিবারকে নয়।কাজেই এমন কাজে পরিবারের কারো বাঁধাতেও পিছপা হওয়া সমীচীন নয়।
মূলত,কোনো কারণে পরিবারের কোনো সদস্যের মধ্যে যেনো ভুলবোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয় অর্থাৎ শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং পরিবারের সদস্যরা যেনো তাদের উপর থাকা বা আসন্ন এমনসব দায়িত্বের প্রতি অবহেলিত মনোভাব না রেখে বরং সচেতন থেকে দায়িত্বসমূহ পালন করে যায় সেই শিক্ষাটুকু দেওয়ার জন্যই পরিবারের সবার সামনে কথাগুলো এতো বিস্তারিতভাবে বলা।
যাইহোক,রফিক সাহেবও ইতোমধ্যে মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন যে,আগামী মাসে তাদের গ্রামে ওয়াজ মাহফিলের উছিলায় তার বোনেরা যখন তাদের বাড়িতে একত্রিত হবেন তখন তিনি একজন মরির এনে ইসলামী শরীয়াত অনুসারে তাদের সম্পূর্ণ পাওনা বা হক আদায় করে দিবেন।
এদিকে চারিদিকে আছরের আযান পড়তে শুরু হলো।তাই রফিক সাহেব মসজিদের দিকে যেতে যেতে ঘরের সবাইকে সালাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে বললেন।আর ছেলেদেরকেও জামা'য়াতে সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে আসার আদেশ দিয়ে আসলেন।
আসলে,আল্লাহওয়ালা মানুষেরা নিজের ভুল বুঝতে পারলে এভাবেই সে ভুল শুধরানোর জন্য অস্থির হয়ে পড়েন।ভুলের উপর অটল থেকে নিজের ইগোকে প্রশ্রয় দেন না।যেভাবেই হোক যতো তাড়াতাড়িই হোক সেটা শুধরানোর জন্য মনের মধ্যে পেরেশানি কাজ করে।পক্ষান্তরে, পাহাড়সম অহংকার নিয়ে চলা মানুষেরা এমনকি নামাজী,হাজী হলেও এসব বিষয়ের চিন্তাই মাথায় আনতে চান না,নিজের ভুলও উপলব্ধি করতে চান না।এমন মানুষেরা নিজের হক পাই পাই করে আদায় করে নেওয়ার ব্যাপারে যতোটা সচেতন অন্যের হক আদায় করে দেওয়ার ব্যাপারে ঠিক ততোটাই অসচেতন,কখনো তার চেয়েও বেশি অসচেতন।এরা নিজের উপর থাকা অন্যের হক নিশ্চিন্তমনে মৃত্যু অবধি ভোগ করতেই থাকেন।আফসোস!একবারও নিজেকে প্রশ্ন করলেন না,আমি কি কারো হক ভোগ করে যাচ্ছি কিংবা আমি কি কাউকে তার হক পাওয়া থেকে বঞ্চিত রাখছি?ব্যাপারটা কতোই-না দুঃখজনক।
রেফারেন্সঃ
[১] সূরা বনী ইসরাঈল,আয়াত নং : ২৬
[২] সূরা আর রোম,আয়াত নং : ৩৮
[৩] সূরা আল বাকারা,আয়াত নং : ১৮৮
[৪] সূরা আন নেসা,আয়াত নং : ৫৮
[৫] মেশকাত শরিফ
[৬] সহীহ বুখারী : ২৪৫৩, ৩১৯৫ ; সহীহ মুসলিম ১৬১২,আহমদ : ২৩৮৩২
[৭] সহীহ মুসলিম,হাদীস নং : ৬৪৭৩
[৮] জামে আ'ত তিরমিজি,হাদীস নং : ২৩৩৬
কিছু কথাঃ
দেখুন বন্ধুরা,আমাদের সমাজে অনেক নামাজী, হাজীদের দেখা যায় বটে কিন্তু রফিক সাহেবের মতো প্রকৃত আল্লাহওয়ালা মানুষদের বড়ো অভাব যারা কিনা অন্যের হকের বিষয়ে খুবই সচেতন। এমন মানুষের কাছ থেকে মানুষের হক আদায়ের বিষয়ে বিশেষ করে বোনের হক আদায় করা নিয়ে অনেক কিছুই শিখার আছে।সম্পত্তির লোভে পড়ে নিজের উপর থাকা অন্যের হক নষ্ট করা মানেই নিজের আখিরাতকে নষ্ট করা,অগ্রিম জাহান্নামের টিকেট বুকিং করে রাখা।আর আমরা যদি আমাদের আখিরাতের জীবনে সফল হতে চাই তবে যেনো আমাদের দ্বারা কারও হক নষ্ট না হয়।
কেবল নামাজ রোযা পালন করে,মাথায় টুপি আর মুখে দাঁড়ি রেখে ইসলামী লেবাছে চললে হবে না।অন্যের হক নষ্ট করে যাচ্ছি কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে,সচেতন হতে হবে,হক আদায়ে সচেষ্ট হতে হবে।প্রকৃতপক্ষে,আখিরাতে বিশ্বাসী কোনো মানুষ বোনের হক খেয়ে যেতে পারে না,বোনের হকের উপর যুলুম করতে পারে না।বরং বোনের না চাইতেই নিজ উদ্যেগে বোনের হক যথাযথভাবে আদায় করে নিজেকে দায় মুক্ত রেখে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে।
আবার,আমাদের সমাজে অধিকাংশ বাবারা জীবিত থাকতে তাদের সম্পদের ভাগ ইসলামী শরীয়ত অনুসারে তাদের মেয়েদেরকে বন্টন করতে যেমন উদাসীন থাকেন তেমনি মারা যাওয়ার পর তাদের ছেলেরাও সম্পত্তি নিয়ে তাদের বোনদের হক আদায়ের প্রতি আরও উদাসীন হয়ে পড়েন।আর ক্ষেত্রবিশেষে তারা সম্পত্তি নিয়ে এতোটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেন যা একসময় আদালত পর্যন্ত গিয়ে গড়ায়।ফলে প্রত্যেক বাবাদের উচিত হয় জীবিত থাকতেই তার মেয়েদের হক দিয়ে দেওয়া নয় তাদের ছেলেকে শক্তভাবে নাসীহাহ্ করে যাওয়া যেনো তারা তার মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে বোনদের সাথে কোনো ঝামেলা না করে কিংবা বোনদেরকে তাদের প্রাপ্য হক পাওয়া থেকে বঞ্চিত না রাখে।
#বোনেরহক
#আত্নীয়েরহক
#rakibpost

No comments:
Post a Comment