ভোটার আইডি কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে একবার এক গার্লস স্কুলে যেতে হয়েছিলো। সাথে ছিলো আমার আব্বু আর সম্পর্কে একজন দাদি আপা।
দুপুর দুইটা কি আড়াইটার দিকে স্কুলে পৌছলাম। আমাকে আর আপাকে বসিয়ে রেখে আব্বু কাগজপত্র নিয়ে একদিকে চলে গেল।
অনেকক্ষন পর আব্বু আমাদেরকে একটি বড় হলরুমের গেটে নিয়ে গেল। কাগজগুলো দিলো আমার হাতে। আমাদের দুজনকে ভিতরে যেতে বলে আব্বু বাইরেই দাড়িয়ে রইল।
মোটামুটি বড়ই ছিল রুমটা। পুরো রুমজুরে অনেকগুলো টেবিল পাতা। প্রত্যেকটাতে দুজন করে বসা, একজন পুরুষ এবং একজন নারী। কোথাও আবার দুজনই পুরুষ।
আমি শুধু হাটছি আর হাটছি। কার কাছে যাব ঠিক করতে পারছিলাম না। খুজতেছিলাম কোথাও শুধু মহিলা বা দুজন মহিলা আছে কিনা। পুরুষের সামনে বসা ..... নাহ পসিবল না।
এমন সময় কোথথেকে যেন এক মহিলা এগিয়ে আসল। লাল শাড়ি পরা, হাতে লাঠি, দাড়োয়ানগিরি করছিল। আমাকে ঠায় দাড়িয়ে থাকতে দেখে তেড়ে এসেছে। এসেই আমার হাত থেকে সব কাগজ নিয়ে নিলো। আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে থেকে এরপর জিজ্ঞেস করল,
" কাজ করাতে আসছেন কে? "
আমি জবাব দিলাম, " আমি "
সে তার মুখখানা বাকিয়ে বলল, " নেকাব তুলেন। না তুললে তো কাজ হবেনা! "
আমি বললাম, " কাজটা কি আপনি করবেন ?"
মহিলা তেড়ে গিয়ে বলল, " এই শুনেন! যেই কাজ করুক, আপনাকে নেকাব তুলতেই হবে! "
আমি বললাম, " তা হবে। আগে আমার কাগজ দেন আপনি। "
সে আমার কাগজ তো দিলোই না উল্টো আমাকে হুমকি দেয়া শুরু করলো যে, আমি নেকাব না তুললে নাকি আমার কাগজ দেবে না!
ভদ্রতা দেখিয়ে লাভ নাই তাই আমিও ত্যাড়ামি শুরু করলাম, " আচ্ছা! আপনি আমার কাগজ দেবেন না তো? ঠিক আছে আমিও কাজ করাবোনা এখানেই দাড়িয়ে থাকব.... হুমমম !!! "
এতক্ষন চিল্লাচিল্লির কারনে হলের প্রায় সবাই তামাশা দেখছিলো। আমার আপা একবার বলার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু ঐ মহিলার ধমক খেয়ে বেচারি চুপ হয়ে গেছে, আমার দিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে ছিলো।
গেটের বাইরে থেকে আব্বুও এতক্ষনের কান্ড দেখেছে তাই সে নিজেই ভিতরে আসলো।
" কি সমস্যা ?" - আব্বু জানতে চাইল।
মহিলাটা আমার সাথে এতক্ষন ফাযলামি করতেছিলো আর আব্বুকে দেখে সুবোধ বালিকার মত সব কাগজ দিয়ে দিলো। আব্বু স্পেশাল কিছুই বলেনাই!
মানুষগুলোর এই এক সমস্যা! বোরকাওয়ালি দেখলেই শুধু ইনসাল্ট করতে মন চায়। যেন আমরা সবাই একটা মজার জিনিষ।
__
রুমের এক্কেবারে শেষ মাথায় একটা টেবিল - একজন নারী আরেকজন পুরুষ। সবাই ই ঐ স্কুলের শিক্ষক - শিক্ষিকা। আর কোনো উপায় না দেখে আমাকে ওখানেই যেতে হলো।
কাগজগুলো নিলো ম্যাডাম, আমাকে নেকাব তুলতে বলল। আমি একটু সাহস করে বলে ফেললাম, " আপনি আগে কাজ শুরু করেন আমি তুলছি "।
স্যার আর ম্যাডাম কতক্ষন আমার দিকে তাকায় রইল। এরপর ম্যাডাম বলল, " বার্থ সার্টিফিকেট টা যে নেই ?"
আব্বু জবাব দিলো, " আমাদেরকে প্রথমে যে ফর্মটা দেয়া হয়েছিলো ওটাতে তো এমন কিছু বলা হয়নি। তা ছাড়া আগেই তো সব কনফার্ম করাই হয়েছে। "
ম্যাডাম বলল যে উনি বার্থ সার্টিফিকেট ছাড়া কাজ করতে পারবেননা। তিনি আমাদেরকে নিশ্চিত করার জন্য পাশের টেবিলের স্যারের কাছে গেলেন। ঐ স্যারকে দেখে সিনিয়র টিচার মনে হলো। তিনিও অপারগতা প্রকাশ করলেন।
আমার সাথে আপাকে রেখে আব্বু বাইরে চলে গেল, একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।
__
আমার মতো অনেক মেয়েকেই আসতে দেখলাম। অনেকে নেকাবে আবৃত ছিলো। ঐ মহিলাটা ধরে ধরে সবাইকেই নেকাব ছাড়িয়ে ফেলল। অবাক লাগল, একটা মেয়েও একটুও আপত্তি করলোনাহ! একদম ইযিলি পরপুরুষের সামনে বসে যাচ্ছে, হাত ধরিয়ে আঙ্গুলের ছাপ নিচ্ছে, সাইন নিচ্ছে, ছবি তুলছে ........ । আস্তাগফিরুল্লহ ...... দৃশ্যগুলো আমার একদম ভাল লাগছিলো না।
" ..... অ্যাহ দেমাগ কত! ...... নেকাব তুলবেনা! ..... " কতগুলো তাচ্ছিল্যমাখা চোখ বারবার আমার দিকে ঘুরে আসছিলো।
হঠাৎ পিছন থেকে কেউ ডেকে উঠল - সেই সিনিয়র টিচার। আমাদের দুজন কে রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে বলল ..... ( একটু কড়া ভাষায়ই বলেছিল )
-
একটা বেনচে আমি আর আপা বসে আছি। চোখের সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছে অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে, সবাই আমার বয়সী। সবাইকে দেখলাম সাজগোজ করে এসেছে। ভোটার আইডিকার্ড এর কাজ করাতে আসছে নাকি মডেলিং! বুঝার উপায় নাই।
একটা মেয়েকে দেখলাম এক ছেলের হাত ধরে আসলো, বিএফ না হাসব্যান্ড ঠিক বুঝলাম না! বোরকা না পরলেও মাথাটা ঢেকে নিয়েছে মোটামুটি। একটুপর কাজ করে বেরিয়ে যাচ্ছিলো ..... মাথার ওড়নাটা নেই, চুলগুলো পাখির বাসার মতো খোলা! সাথের ছেলেটার সাথে হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে।
সবাইকেই ফূর্তিতে দেখলাম। সবাইই মনে হয় চায়, সবার ভোটার আইডির ছবিটা একটু সুন্দর দেখাক একটু হিরো দেখাক! তাই এ অবস্থা।
আব্বু তখনো আসেনাই।
ঠিক দুই দিন আগে একমাত্র মামা মারা যাওয়ার কাচা শোক আর আমাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাকে প্রচন্ড কষ্ট দিলো। প্রিয়জন হারানোর বেদনাটা বারবার উকি দিচ্ছিলো। চোখের অশ্রু বাধ মানছিলোনা। ছবি তুললে কি অবস্থা হবে চেহারার- সেদিকে বিন্দু মাত্র ভ্রুক্ষেপ ছিলোনা। কেদে কেদে চোখ ফুলে গিয়েছে। কেউ দেখেনি, দেখেছে শুধু আমার রব - আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
-
আব্বু আমার বার্থ সার্টিফিকেটটা নিয়ে আসলো। মেইন কপি আনতে পারেনি। বাসা থেকে মোবাইল ফোনের সাহায্যে পাঠানো ছবি থেকে কপি করিয়েছে।
হলরুমে ঢুকে একই টেবিলে গেলাম। আশ্চর্যজনকভাবে তখন ঐ ম্যাডামের সাথের পুরুষ শিক্ষক ছিলো না। আর জায়গাটাও ছিলো এমন, ঐ ম্যাডাম ছাড়া আর কেউই আমার চেহারা দেখতে পারবেনা।
সুবহানাল্লহ .......
আমি সম্পূর্নভাবেই আমার কাজ শেষ করতে পেরেছি। আল্লাহ আমাকে পরিপূর্ণভাবে সাহায্য করেছেন।
আলহামদুলিল্লাহ .....
আল্লাহর কাছে যারা সাহায্য চায় আল্লাহ কখখোনোই তাদের ফিরিয়ে দেন নাহ।
যারা সত্যি সত্যি এক আল্লাহর হুকুম মানার জন্যই পর্দা করেন, আল্লাহ অবশ্যই অবশ্যই আপনাদের সাহায্য করবেন।
জানি,
ফ্যামিলি বা শ্বশুড়বাড়ি সহ আরো অনেকেই অনেক কথা বলবে। কিন্তু একটা বাজে কথাও কানে নিবেন নাহ! একদম না।
নিজে অটল থাকবেন, সাহায্য করবেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
হতে পারে আপনি জীবনে অনেক পাপ করেছেন। কোনো সমস্যা নাই। " তাওবাহ " করে ফিরে আসুন আপন রবের কাছে।
আমরা কি চাইনা ফাতিমা (রা:) এর সাথে জান্নাতে থাকতে? তবে তো একটু কষ্ট করতেই হবে।
___
[] কাচা হাতে বোনদের জন্য এক চিমটি অনুপ্রেরনা ......
জাঝাকুমুল্লহু খইরন
আস্তাউদিউল্লহ
_ রাবিয়াহ বসরী

No comments:
Post a Comment