Sunday, December 6, 2020

বিদায় হজ্জের ভাষণ


নবম হিজরী অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা থেকে মদীনাতে যাওয়ার নবম বছরে হজ্জ ফরয করা হয়। এছড়া একই বছরে তাবুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। দশম হিজরীতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জ আদায় করলেন। একলক্ষ চৌচল্লিশ হাজার মুসলমান তাঁর সঙ্গে হজ্জ আদায় করেন। এটিই ছিল ‘হাজ্জাতুল ওয়াদা’ বা বিদায় হজ্জ। ইমাম মুসলিম রহি’মাহুল্লাহ সংকলিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় সাথী, হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আ’নহু থেকে বর্ণিত বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক সেই ভাষণের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে দেওয়া হল।

শুক্রবার, ৯-ই জিলহজ, দশম হিজরী সনে আরাফার দিন দুপুরের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এক লক্ষের অধিক সাহাবীর সমাবেশে হজের সময় এই বিখ্যাত ভাষণ দেন। হামদ ও সানা (আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান বর্ণনার) পর নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ভাষণে ইরশাদ করেনঃ
“আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন। তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন। আর তিনি একাই বাতিল শক্তিগুলোকে পরাজিত করেছেন।
হে আল্লাহর বান্দারা! আমি তোমাদের আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর বন্দেগীর জন্যে ওসিয়ত করছি (উপদেশ দিচ্ছি) এবং এর নির্দেশ দিচ্ছি। হে মানুষেরা! তোমরা আমার কথা শোন। এরপর এই স্থানে তোমাদের সাথে আমি আর একত্রিত হতে পারব কি না জানি না। হে লোক সকল! আল্লাহ তাআ’লা ইরশাদ করেছেন, “হে মানবজাতি! তোমাদের আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রে ভাগ করে দিয়েছি, যাতে করে তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিকতর সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অবলম্বন করে)।” (অর্থাৎ, সব বিষয়ে আল্লাহর কথা অধিক খেয়াল রাখে)।
ইসলামে জাতি, শ্রেণীভেদ ও বর্ণবৈষম্য নেই। আরবের ওপর কোনো আজম (অনারবের) অথবা কোন আজমের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি সাদার ওপর কালোর বা, কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মর্যাদার ভিত্তি হলো কেবলমাত্র তাকওয়া।
আল্লাহর ঘরের হিফাযত, সংরক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর ব্যবস্থা আগের মতো এখনো বহাল থাকবে। হে কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকরা! তোমরা দুনিয়ার বোঝা নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে যেন আল্লাহর সামনে হাযির না হও। আমি আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমাদের কোনোই উপকার করতে পারব না।
যে ব্যক্তি নিজের পিতার স্থলে অপরকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, নিজের মাওলা বা অভিভাবককে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে মাওলা বা অভিভাবক বলে পরিচয় দেয় তার ওপর আল্লাহর লা’নত।
ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। প্রত্যেক আমানত তার হকদারের কাছে অবশ্যই আদায় করে দিতে হবে। কারো সম্পত্তি সে যদি স্বেচ্ছায় না দেয়, তবে তা অপর কারো জন্য হালাল নয়। সুতরাং তোমরা একজন অপরজনের ওপর জুলুম করবে না। এমনিভাবে কোনো স্ত্রীর জন্য তার স্বামী সম্পত্তির কোনো কিছু তার সম্মতি ব্যক্তিরেকে কাউকে দেওয়া হালাল নয়।
যদি কোনো নাক-কান কাটা হাবশি দাসকেও তোমাদের আমীর (নেতা) বানিয়ে দেয়া হয়, তবে সে যতদিন আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করবে, ততদিন অবশ্যই তার কথা মানবে, তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে।
(হে মানুষেরা!) তোমরা শোনো, তোমরা তোমাদের পানকর্তার ইবাদত করবে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথারীতি আদায় করবে, রমজানের সাওম পালন করবে, স্বেচ্ছায় ও খুশি মনে তোমাদের সম্পদের যাকাত দেবে, তোমাদের রবের ঘর বায়তুল্লাহর হজ্জ করবে আর আমির বা আনুগত্য করবে, তাহলে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।
হে লোক সকল! আমার পর আর কোনো নবী নেই, আর তোমাদের পর কোনো উম্মতও নেই। আমি তোমাদের কাছে দুইটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এই দুইটিকে আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। সে দুইটি হলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাত।
তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকবে। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির লোক (ইয়াহুদী ও খ্রীস্টানরা) দ্বীনের ব্যাপারে এই বাড়াবাড়ির কারণে ধ্বংস হয়েছিলা। এই (আরব) ভূমিতে আবার শয়তানের পূজা করা হবে, এই ব্যপারে শয়তান হতাশ হয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে তোমরা শয়তানে অনুসরণ করা শুরু করবে, আর এতেই সে সন্তুষ্ট হবে। সুতরাং, তোমাদের দ্বীনের বিষয়ে শয়তান থেকে সাবধান থেকো।
শোনো, আজকে তোমরা যারা উপস্থিত আছো, যারা উপস্থিত নেই তাদের কাছে আমার এই বাণী পৌঁছে দিয়ো। অনেক সময় দেখা যায় যার কাছ পৌঁছানো হয়, সে পৌঁছানেওয়ালা ব্যক্তির তুলনায় অধিক সংরক্ষণকারী হয়।
যখন আমার ব্যপারে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তখন তোমরা কী বলবে? সমবেত সবাই একই সাথে উত্তর দিলেনঃ “আমরা সাক্ষ্য দিব যে, নিশ্চয়ই আপনি আপনার ওপর অর্পিত আমানত আদায় করেছেন, রিসালতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন এবং সবাইকে নসিহত করেছেন।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আকাশের দিকে তাঁর পবিত্র শাহাদাত আংগুল তুলে আবার নীচে মানুষের দিকে নামালেন। আর বললেন, “হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো। হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো।”
আল্লাহুম্মা সোয়াল্লি ওয়া সাল্লিম আ’লা নাবিয়্যিমা মুহা’ম্মদ।
কৃতজ্ঞতা : তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও

No comments:

Post a Comment

মহিলাদের মসজিদে গমন : একটি পর্যালোচনা

জমহুর আলিমগণ একমত যে, মহিলাদের মসজিদে সালাত আদায় করা অপেক্ষা ঘরে সালাত আদায় করা উত্তম। এ ব্যপারে বেশ কয়েকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে সহিহ সনদে । এ...