নামাজে মন ফেরানো (কমপ্লিট সিরিজ)
সব অহেতুক চিন্তা মাথায় আসে নামাজে দাঁড়ালে! যেখানে আল্লাহর রসূল(সা:) তাঁর নামাজে এক রাকাতেই সুরাহ বাকারাহ, আলে ইমরান পরে শেষ করে ফেলতেন, সেখানে "কুল হু আল্লাহু আহাদ" পড়ে কোনোমতে নামাজ শেষ করাই আমাদের কাছে স্ট্রাগল! নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে রসূল(সা:) এর পা ফুলে লাল হয়ে যেত, অথচ তার জীবনের অতীত, বর্তমান - সমস্ত গুনাহ মাফ! তাহলে কেন তিনি এভাবে নামাজ পড়তেন? কারণ, তিনি আসলেই তাঁর নামাজকে অনেক enjoy করতেন! রসূল (সা:) বলতেন যে, নামাজ হচ্ছে তার জন্যে চক্ষু শীতলতাকারী! আমরা নামাজ পরে কেন সেরকম মজা পাই না? নামাজ enjoy না করার একটা বড় কারণ হচ্ছে নামাজের মধ্যে যা পড়া হয়, সেটার অর্থ না জানা। আমরা যদি অর্থগুলি জানি, আশা করি তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের নামাজগুলিকে শুদ্ধ করার তাওফিক দিবেন।
নামাজে "আল্লাহু আকবার" এর অর্থ:
নামাজের বিভিন্ন সময়ে প্রায় একটু পরে পরে আমরা বলি "আল্লাহু আকবার". এটার সবচেয়ে কমন ট্রান্সলেশন হচ্ছে - "আল্লাহ সবচেয়ে বড়/মহান!" "Allah is the greatest." কিন্তু, ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, এটার অর্থ আসলে "Allah is greater" (Not greatest). আরবি গ্রামার খুঁটে পড়লে দেখা যায় যে, "আল্লাহু আকবার" আসলে comparative form এ আছে, not superlative. সহজ বাংলায় আল্লাহু একবার মানে "আল্লাহ অন্য কোনোকিছুর থেকে বড়". এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এখানে "অন্যকিছু" টা কি? আর কেনই বা আমরা নামাজে আল্লাহকে "কোনকিছুর" থেকে বড় বলছি? এটার Wisdom টা হচ্ছে - আমরা দুই হাত বেঁধে একবার নামাজটা শুরু করার পরে, যে জিনিসের চিন্তাটা আমাকে আল্লাহ থেকে অমনোযোগী করে আমার মনকে অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেটার থেকে আল্লাহ বড়!! ইচ্ছা করে এখানে এটা উহ্য রেখে একটা blank রাখা হয়েছে। "আল্লাহু আকবার" এর proper অর্থ তাহলে দাঁড়ায় - "Allah is greater than ___________ ." এই blank এ আমরা সেটাই বসিয়ে দিবো, যেটা আমাকে নামাজের মধ্যে আল্লাহর থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। যেমন: নামাজ পড়তে পড়তে স্কুলের assignment কথা মনে পড়লো, যেই আমি বললাম, "আল্লাহু আকবার" - তার মানে আমার এই Assignment এর চিন্তার থেকে আল্লাহ বড়! সিজদাহ থেকে উঠতে উঠতেই অফিসের কাজের কথা মনে পড়লো - যেই বললাম - "আল্লাহু আকবার" - নিজেকে মনে করিয়ে দিলাম যে, অফিসের কাজের থেকে আল্লাহ বড়। নামাজে দাঁড়িয়ে চুলায় বসানো রান্না কথা মনে হচ্ছে - কিন্তু রান্নার থেকে আল্লাহ বড়! আমার দুনিয়ার যেই কাজটার কথাই আমি নামাজের মধ্যে ভেবে ভেবে নামাজে অমনোযোগী হচ্ছি - সেই কাজের থেকে আল্লাহ বড়! এজন্যেই প্রায় প্রতিটা ধাপেই আমরা "আল্লাহু আকবার" বলি, রুকুতে যেতে, সিজদায় যেতে, দুই সিজদার মাঝে, আবার সিজদা থেকে উঠতে! এমন ভাবেই ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে যেন আল্লাহকে ভুলে যেতে গেলেও আবার "আল্লাহু আকবার" মনে করিয়ে দেয় যে, আসলে এই মুহূর্তে নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় আমার কাছে আল্লাহর থেকে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই! আল্লাহু আকবার!
সানা
"সুবহানাকা আল্লাহুম্মা, ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারকাসমুকা, ওয়া তাআ'লা জাদ্দুকা, ওয়ালা ইলাহা গাইরুকা"
মানে - "আল্লাহ আপনি কতই না পবিত্র, আপনার কোনো ভুল নেই. আমি সারাজীবন আপনার প্রশংসা করেই যাবো, আপনার নামগুলি সবচেয়ে বরকতপূর্ণ, আপনার নির্ধারিত হুকুম সবচেয়ে উচ্চ, আমি কখনোই আপনি ছাড়া আর কারো ইবাদাত করবো না (কাউকে আপনার থেকে বেশি গুরুত্ব দিবো না!)"
সানার ব্যাখ্যা
সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা
আমরা মানুষরা এই জীবনে দুইটা জিনিস চাই - 𝐏𝐞𝐫𝐟𝐞𝐜𝐭𝐢𝐨𝐧 𝐚𝐧𝐝 𝐏𝐫𝐚𝐢𝐬𝐞. নিজেদের জন্যে আমরা চাইPerfection, নিজেদের সব ব্যাপারে আমরা আশা রাখি যে, পারফেক্টভাবে করতে পারবো - পারফেক্টCareer, পারফেক্ট বিয়ে, পারফেক্ট বাড়ি। আর অন্যের কাছে আমরা আশা করি - প্রশংসা আর appreciation. আমরা চাই আমাদেরকে অন্যেরা সমাদর করবে। মানুষের জীবনের বেশির ভাগ কষ্ট আসে এই দুই এর অভাবে। হয়, নিজেরা পারফেক্টলি কিছু করতে পারিনা, তাই নিজের উপর হতাশ। নাহলে অন্যের কাছে যেটা আশা করেছি সেটা পাইনি, তাই অন্যের উপর হতাশ! যেটা আমার কাছেamazing লাগে সেটা হচ্ছে, আল্লাহ বার বার নামাজে আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, 𝐏𝐞𝐫𝐟𝐞𝐜𝐭𝐢𝐨𝐧 𝐚𝐧𝐝 𝐏𝐫𝐚𝐢𝐬𝐞 𝐛𝐞𝐥𝐨𝐧𝐠𝐬 𝐭𝐨 𝐇𝐢𝐦 𝐨𝐧𝐥𝐲! ত্রুটিহীনতা এবং প্রশংসা - এই দুইটা Quality আল্লাহ রব্বুল আলামিনের আয়ত্বে। আমাদের আয়ত্বে না। যেই আমরা নামাজে দাঁড়িয়ে বলছি, "সুবহানাকা আল্লাহুম্মা (আল্লাহ তুমি কত পবিত্র, ত্রুটিহীন), ওয়া বিহামদিকা (এবং আমি তোমার প্রশংসা সারাজীবন করেই যাবো) - সাথে সাথে আমরা আল্লাহর সামনে নিজেদের imperfect nature কবুল করে নিচ্ছি এবং অন্য কারোattention না খুঁজে একমাত্র আল্লাহর দিকে ফোকাস করছি। এটা খুব পাওয়ারফুল। নামাজে দাঁড়িয়েই এটা একজন মুসলিমকে মেন্টালি স্ট্রং করে দেয়। সে জানে যে, তার হতাশ হবার কিছু নেই, পারফেকশানের মালিক আল্লাহ। সে নিজে না. আল্লাহ তাকে তার perfection এর জন্যে বিচার করবেন না, বরং তার আন্তরিক চেষ্টার জন্যে পুরষ্কৃত করবেন। অন্য কারো কাছে প্রশংসা বা উপযুক্ত সমাদর না পেলে তার কষ্টের কিছু নেই; সত্যিকার প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, মানুষের নিজের জন্যে না এবং আল্লাহ তার বান্দাকে সবচেয়ে বেশিappreciate করেন। অন্য কেউ এই মুহূর্তে না করলেও কষ্ট নেই।
ওয়া তাবারকাসমুকা
"আল্লাহ তোমার নামগুলি কতই না বরকতপূর্ণ!" এখানে, আরবি "বারাকাহ" শব্দটার সহজ অনুবাদ ইংরেজিতে"Blessing", বাংলায় আশীর্বাদ। কেউ দোয়া চাইলে আমরা বলি, "May Allah Bless you", মানে আল্লাহ তোমাকে বরকত দিক. বরকত বলতে আমরা বুঝি কল্যাণ, মঙ্গল - জীবনে যা কিছু ভালো।"বারাকাহ"-র আরেকটা ইন্টারেস্টিং অর্থ আমরা অনেকেই জানি না. বারাকাহ মানে হচ্ছে, যখন আল্লাহ আমাদের কল্যাণ এমনভাবে বাড়িয়ে দেন যে, আমরা অনেক কম সময়ে অনেক বেশি কিছু অর্জন করে ফেলতে পারি। বারাকাহর একটা উদাহরণ দেই, এই বছরের রোজায় আমার এক বোন কয়েকজন মুরব্বিদের ইফতারে দাওয়াত করবেন বলে নিয়ত করলেন। কিন্তু, আপুর হাতে ওইদিন সময় ছিল অনেক কম। আমি নিজে সেদিন আপুকে দেখেছি ইউনিভার্সিটির কাজ শেষে খুব ব্যস্তভাবে বাসায় ফিরছিলেন। আমি দিনের কাজ শেষে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম, দেখলাম আপু মিটিং শেষ করে হাঁটতে হাঁটতে তার বাসার দিকে যাচ্ছে। আমি ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে পাঁচটা বাজে! মোটে হয়তো দুই ঘন্টার মতন আছে হাতে কিছু রান্না করার মতন। এতগুলা মানুষকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে এবং তারা আমাদের আব্বু-আম্মু শ্রেণীর। আপু তখন ভাবলো, "ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার জন্যে নিয়ত করেছি খাওয়াবো, তুমি আমাকে পথ করে দাও! "ইফতারের আগে যখন আপুর সব কাজ শেষ হলো. টেবিল ভর্তি খাবারের আইটেমগুলো দেখে আপুর মনে হলো - "এটা আমি করি নাই! এটা আমার পক্ষে সম্ভব না! এটা আল্লাহর কাজ!" এটাই আল্লাহর বারাকাহ। যখন আল্লাহ সময়ে বারাকাহ দেন, তখন সেটা এমনভাবে প্রশস্ত হয়ে যায় যে, কম সময়ে অনেক বেশি কল্যাণ অর্জন করা সম্ভব হয়, যেটা আল্লাহর বারাকাহ ছাড়া অসম্ভব! নামাজ এমন একটা ইবাদাত, যেটা করতে খুব কম সময় লাগে, কিন্তু যদি ঠিকভাবে করতে পারা যায়, তাহলে সেটা আমাদের জন্যে অসম্ভব রকমের কল্যাণ এবং বরকত নিয়ে আসে! নামাজের শুরুতেই যখন আমরা বলছি যে, "ওয়া তাবারকাসমুকা" - "আল্লাহর নামগুলি বরকতপূর্ণ" - তার মানে, এরকমের অসম্ভব কল্যাণ আল্লাহ ছাড়া আসা সম্ভব নয় - এটাই আমরা মেনে নিচ্ছি। সুবহানাল্লাহ!
ওয়া তা আ'লা জাদ্দুকা -
"জাদ্দুকা" মানে"Determination, Decree", বাংলায়"ইচ্ছাশক্তি, আইন পাশ করে দেওয়া". "আ'লা" মানে"Higher, উঁচু, মহান। অর্থ দাঁড়ায় - আল্লাহর ইচ্ছা সবচেয়ে বড়! আমাদের কত ইচ্ছা থাকে, কিন্তু সবসময় আমাদের ইচ্ছামতন সবকিছু হয়না। নামাজে যখন পাঁচবার করে আমরা বলি - "আল্লাহ, আমার ইচ্ছার থেকে আপনার ইচ্ছা বড়!" এটা আমাদেরকে নিজেদের limitation মেনে নিয়ে আল্লাহরWisdom কে Trust করতে শেখায়! মনে শান্তি দেয়.
ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা -
"আল্লাহ, আমি আপনি ছাড়া আর কারো ইবাদাত করবো না" - এই পর্যায়ে নামাজে আমরা স্বীকার করি নেই যে, আল্লাহ আমাদের প্রভু। আমরা তাঁর গোলাম। আমরা আল্লাহর ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করবো না, নিজেদেরDesire এর সামনে করবো না, সোসাইটির সামনে করবো না, শয়তানের সামনে করবো না. আমরা আল্লাহর থেকে বেশি আর কাউকে গুরুত্ব দিবো না.
সুবহানাল্লাহ! আচ্ছা, একটু ভাবি, দিনের মধ্যে পাঁচবার করে যদি আমরা কাউকে বলি যে, "তুমি আমার লাইফে সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট" এবং বলার সাথে সাথেই যদি এমন কিছু করি যেটা আমাদের কথার পুরো বিপরীত। তাহলে ওই ইম্পরট্যান্ট মানুষ আমাদের নিয়ে কি ভাববে? এই কাজ তো আমরা আল্লাহর সাথে দৈনিক করে আসছি। এজন্যেই যে বুঝে নামাজ পড়ে, তার কাছে ব্যাপারটা অন্যরকম। তারা আসলেই কুরআনের এই আয়াতকে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন, "নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে!" (সূরাহ আনকাবুত - ২৯:৪৫). আমরা এটা পড়ি আর আমাদের মনে হয় - "কই! নামাজ পড়েও তো খারাপ কাজ করেই যাচ্ছে!" এটা আমাদের নিজেদের দুর্বলতা, নামাজের না। আল্লাহ আমাদের তাওফিক বাড়িয়ে দিন। আমিন ইয়া রাব্বুল আ'লামিন
সূরাহ ফাতিহা
১. আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আ'লামিন:
আল্লাহ এই আয়াতের মাধ্যমে আমাদের সাথে আল্লাহর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। তিনি আমাদের রব, প্রভু, মনিব। আরবি "রব" শব্দটার মানে এমন কেউ যে টুয়েন্টি-ফোর-সেভেন আমাদের দেখ-ভাল করে যাচ্ছেন। সারাটাক্ষণ আমাদের খেয়াল রাখছেন। আমাদের প্রত্যেকটা হার্ট-বিট সুপারভাইজ করে যাচ্ছেন। আমাদেরকে খাওয়াচ্ছেন, পড়াচ্ছেন। নানারকমের রোগ-বালাই থেকে আমাদেরকে সুস্থ রাখছেন। আমাদের অনুরোধ শুনছেন। আমাদেরকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবেসে যাচ্ছেন - এই সবই "রব" শব্দটার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ আমাদের প্রভু মানে আমরা তাঁর গোলাম। আমরা আল্লাহর সম্পত্তি। আমাদের হাত-পা-মুখ সবকিছুই আল্লাহর। খুব সীমিত সময়ের জন্যে আল্লাহ আমাদেরকে আমানত হিসেবে কিছু জিনিসের কন্ট্রোল দিয়েছেন। কিয়ামতের দিন আমাদের হাত -পায়ের উপর আমাদের কোনো কন্ট্রোল থাকবে না, আমাদের নিজেদের হাতগুলি আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে। নিজেদের শরীরের উপরেই যেখানে আমাদের চূড়ান্তভাবে কোনো কন্ট্রোল নেই, সেখানে আমরা খুশি খুশি এই আয়াতের মাধ্যমে নিজেদের দাসত্ব আল্লাহর কাছে স্বীকার করি।
নিজেকে গোলাম ভাবতে অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। কারণ মানুষ স্বভাবতই স্বাধীন থাকতে পছন্দ করে। তাছাড়া, প্রভু এবং গোলামের সম্পর্কে যেটা সাধারণত দেখা যায় যে, এক পর্যায়ে গিয়ে প্রভু তার দাসের উপর ক্ষমতার জোর খাটানো শুরু করে এবং সেটা অত্যাচারের পর্যায়ে নিয়ে যায়। কিন্তু, আল্লাহ এখানে বলছেন যে, তিনি অন্যরকমের প্রভু। তিনি এমন প্রভু যে তাঁর গোলামের সাথে কখনো অন্যায় করে না। তিনি তার বান্দাকে ধরে-বেঁধে রাখেন না, বরং বান্দাদেরকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্বাধীন ইচ্ছা (free will) দেন। এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি কে কিভাবে চ্যানেল করে হিদায়াতের পথে থাকতে হবে সেটার কমপ্লিট ইন্সট্রাকশন দিয়েছেন। আমরা দাসেরা তাই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করতে থাকি।
তিনি এমন একজন রব, যার জন্যে সমস্ত প্রশংসা নির্ধারিত! আরবি "হামদ" শব্দটা প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা দুইটাই ইঙ্গিত করে। কারণ, কেউ যখন মন থেকে প্রশংসা করে কাউকে ধন্যবাদ দেয়, তার কৃতজ্ঞতা হয় নির্ভেজাল। আমরা সূরা ফাতিহাতে নির্ভেজাল ভাবে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। এখানে আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এই আয়াতের বিশ্লেষণে বুঝা যায়, সর্বক্ষণ কেউ না কেউ আল্লাহর প্রশংসা করে যাচ্ছে। গাছ-গাছালি, পাখি, ফেরেশতা ইত্যাদি - তারা সবাই আল্লাহর গুণগান করতে ব্যস্ত! এটার তাৎপর্য হচ্ছে, আমাদের প্রশংসার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। দুনিয়ার সব মানুষ মিলে আল্লাহর প্রশংসা ছেড়ে দিলেও আল্লাহর রাজ্য থেকে একটা কিছু কমে যাবে না। আবার দুনিয়ার সমস্ত মানুষ মিলে আল্লাহর প্রশংসা করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেও সেটার ফলে আল্লাহর মহিমা এতটুকু বেড়ে যাবে না। আমরা"আলহামদুলিল্লাহ" বলি বা না বলি, আল্লাহ সবসময় প্রশংসিত! আমাদের"আলহামদুলিল্লাহ" বলাতে আল্লাহর কোনো লাভ নেই। বরং লাভটা আমাদের। সবসময় হয়তো বুঝতে পারিনা, কিন্তু যখন একজন মাকে দেখি তার বুকের ধন সন্তানকে কবর দিয়ে ফেরত এসে বলছে"আলহামদুলিল্লাহ! আমার ছেলে এখন জান্নাতে খেলছে"; একজন ভাইকে দেখি চাকরি হারিয়ে বলছে, "আলহামদুলিল্লাহ! আরো অনেক কিছুই তো হারাতে পারতাম", একজন বোনকে দেখি বিছানায় প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থায় বলছে, "আলহামদুলিল্লাহ! এই কষ্টের মাধ্যমে আল্লাহ আমার গুনাহ্গুলি মাফ করে দিচ্ছেন" - তখন আমি "আলহামদুলিল্লাহ"-র মর্ম বুঝি! আমরা যতবার নামাজে এই আয়াত পড়ছি, ততবার আমরা নতুন করে পজিটিভ হতে শিখছি। শত কষ্টের মধ্যে থেকেও"আলহামদুলিল্লাহ" বলতে পারার চেয়ে পাওয়ারফুল আর কিছু নেই. দিনের মধ্যে পাঁচবার করে নামাজে আমরা সেটারই প্র্যাক্টিস করছি।
"আ'লামিন" মানে ''সকল সৃষ্টি জগতের (পালনকর্তা)". মানে, আল্লাহ তা'য়ালা জাতি, ধর্ম, বর্ণ - নির্বিশেষে সবার জন্যে সমানভাবেavailable! সুবহানাল্লাহ, ভালো নেটওয়ার্ক না থাকলে চাকরি পাওয়া যায়না। ভালো রেকমেন্ডেশান লেটার না থাকলে এডমিশন পাওয়া যায়না! কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহ কোনো স্পেশাল গ্ৰুপ বা ক্যাটাগরির মানুষের জন্যে না. ধনী বা গরিব, কালো বা সাদা - আল্লাহ সবার জন্যে নিজের অনুগ্রহ বিলিয়ে দিচ্ছেন! তিনি যে "রাব্বুল আলামিন"!
এক লাইনে এই আয়াতের অনুবাদ হয় - "যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা।" কিন্তু একটু সময় নিয়ে ব্যাখ্যাসহ বুঝে পড়লে, প্রতিটা শব্দ অন্তরের ভিতরে গিয়ে নাড়া দেয়!
"আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন" আমাদেরকে প্রতিবার রিমাইন্ডার দিচ্ছে যে, আমার এমন একজন সীমাহীন প্রশংসার যোগ্য রব আছে যিনি সারাক্ষন আমার যত্ন নিতে ব্যস্ত, আমার যত ঝামেলা-কষ্ট - সবকিছু তিনি সমাধান করে দিতে পারেন এবং তিনি আমাদের কারো মধ্যে ভেদাভেদ করেন না.
৩. আর-রহমানির রাহিম
আল্লাহ কেন তাঁর দয়ার কথা বলতে গিয়ে "রহমান" শব্দটা ব্যবহার করলেন? এর একটা চমৎকার কারণ আছে। আরবিতে "মায়ের গর্ভ" এবং "রহমান" - এই দুইটা শব্দ একই রুট ওয়ার্ড (root word) থেকে এসেছে। আরবিতে একই রুট ওয়ার্ড বা, মূলশব্দ থেকে যে শব্দগুলোর উৎপত্তি হয়, তাদের মধ্যে অদ্ভুত একটা সম্পর্ক থাকে। তাহলে "মায়ের গর্ভ" এবং "আর-রহমান" এর মধ্যে সম্পর্ক কী?
একজন মা নয়মাস ধরে একটা বাচ্চাকে পেটে ধরে। শতকষ্টের মধ্যেও সবসময় খেয়াল রাখে, বাবু ঠিক আছে তো? নিজের খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা সবকিছু খুব সতর্কতার সাথে মেইন্টেইন করে। ছোট বাবুটা মায়ের পেটের ভিতরে বসে বসে মায়ের প্লাসেন্টা দিয়ে সবরকমের পুষ্টি শুষে নিতে থাকে। এই বাবুকে দুনিয়াতে আনতে গিয়ে একজন মায়ের প্রচন্ড প্রসববেদনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়. অনেকে এই প্রসেসে প্রাণ হারায়। যারা বেঁচে যায়, তাদের জন্যে শুরু হয় আরেক দুঃসহ যাত্রা! রাতের পর রাত জেগে থাকা। দিনের পর দিন ডায়পার-ডিউটি। এক সেকেন্ডের জন্যে চোখের আড়াল হলে ছোট বাচ্চা খেলনা গিলে নিঃস্বাস বন্ধ করে ফেলবে, নাহলে কিছু বুঝার আগেই পুরো ঘরে আগুন লাগিয়ে দিবে! যেই বাবুটা পেটের ভিতরে থেকেও কষ্ট দিলো, পেট থেকে বের হতে গিয়ে প্রায় মৃতপ্রায় করে দিলো, বের হয়েও সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখছে, অথচ তার একটু কান্নার শব্দ শুনলে কি অস্থির লাগে! বাচ্চার একটু অসুখ হলে মনে হয় জান বের হয়ে যাচ্ছে! এ এক আজিব শ্রেণীর প্রজাতি মায়েরা! কল্পনা করতে পারেন আল্লাহ আমাদেরকে এই মায়ের থেকেও বেশি ভালোবাসেন। আল্লাহ হচ্ছেন রহমানুর রাহিম।
"মায়ের গর্ভ" এবং "রহমান" এর মধ্যে সম্পর্কটা মাইন্ড ব্লোয়িং! বাচ্চা যখন মায়ের গর্ভে থাকে, সে কিন্তু তার মাকে দেখতে পারেনা। মা যে কিভাবে তার জন্যে পা টিপে টিপে হাঁটছে, একটু পর পর বমি করছে, বাচ্চার জন্যে দুয়া করছে, বাচ্চা নেক হবার জন্যে দিনরাত কুরআন তিলাওয়াত করছে - অবুঝ বাচ্চা কিন্তু সেটা দেখতে পারে না! ঠিক একই ভাবে আমরা আল্লাহকে দেখতে পারি না. আল্লাহ যে কিভাবে দিনের পর দিন আমাদের খেয়াল রেখে যাচ্ছেন, আমাদের যাবতীয় চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছেন - সে ব্যাপার নিয়ে আমাদের তেমন চিন্তা নেই! ছোট্ট বাচ্চাটা যেমন তার মায়ের গর্ভে পরম মমতায় মোড়ানো, ঠিক সেইভাবে আমরা চারপাশ থেকে আল্লাহর রহমত আর দয়া দিয়ে পরিবেষ্টিত! ছোট বাচ্চা মাকে জ্বালিয়ে মাথা নষ্ট করে দেওয়ার পরেও যেমন বাচ্চাকে ছাড়া মায়ের চলে না. তেমনি আমরা মিনিটে আল্লাহর অবাধ্য হবার পরও আল্লাহ আমাদেরকে ছেড়ে দেন না! ইনি হলেন "আর রহমানির রহিম"!
৪. মালিকি ইয়াও মিদ্দীন:
আগের দুই আয়াতে আল্লাহর এমন মহানুভবতা এবং ভালোবাসার কথা শুনে বান্দা ভাবতে পারে - সুবহানাল্লাহ! আমার রবের এতো দয়া! তাহলে আমি যতই গুণাহ করি না কেন, তিনি তো শেষমেশ আমাকে ক্ষমাই করে দিবেন। এই ধরণের ভাবভঙ্গি থেকে মানুষ যেন আল্লাহর দয়াকে সহজলভ্য ভেবে পাপে না জড়িয়ে যায়, এজন্যে পরের আয়াতেই আল্লাহ বলছেন যে, তিনি হলেন "মালিকিয়াও মিদ্দীন"- তিনি কিয়ামত দিবসের মালিক! এমন এক দিনের মালিক আল্লাহ, যেদিন প্রতিটা কাজের পাই পাই হিসাব নেওয়া হবে. আল্লাহ তার দয়াতে যেমন অতুলনীয়, তেমনি তার ন্যায়বিচারও অকাট্য! তিনি মায়ের থেকেও আমাদের বেশি ভালোবাসেন দেখে আমরা যা ইচ্ছা তাই করে পাড় পেয়ে যাবো - সেটা হবে না!
৫. ইয়্যা কানা'বুদু ওয়া ইয়্যা কানাস তাঈ'ন
অর্থঃ 'আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।''
প্রথম তিন আয়াতে আল্লাহর পরিচয় এভাবে পাওয়ার পর আমরা বান্দারা আল্লার কাছে নিজেদের পুরোপুরি সাবমিট করে দেই এই আয়াতের মাধ্যমে! যে আল্লাহ আমার রব, রহমানুর রহিম, মালিকিয়াও মিদ্দীন, আমি কিভাবে তার ইবাদাত না করে থাকতে পারি? আয়াতের প্রথম অংশে ইবাদাত করার এবং পরের অংশে সাহায্য চাওয়ার কথা বলা হয়েছে, কারণ আমরা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া তাঁর ইবাদাতটুকুও করতে পারবো না. আরবিতে অনেক শব্দই আছে যেটার মানে সাহায্য। কিন্তু এই আয়াতে "সাহায্য" বুঝতে আল্লাহ বাছাই করেছেন আরবি শব্দ "ইস্তিয়ানা"।"ইস্তিয়ানা"র বিশেষত্ব হচ্ছে, যেই ব্যাক্তি সাহায্য চাচ্ছেন, সে নিজে অলরেডি নিজেকে সাহায্য করার জন্যে সবরকমের কাজ করে যাচ্ছে। তারপর সে যদি হেল্প চায় - সেটা হবে "ইস্তিয়ানা" বা "নাস্তাঈন"। আল্লাহর সাহায্য সস্তা না! আমরা নিজেরা কোনোরকমের চেষ্টা না করেই যদি খালি আল্লাহর কাছে "দাও! দাও!" করি, তাহলে হবেনা। আল্লাহর দিকে এক স্টেপ এগিয়ে আসলে আল্লাহ তা'য়ালা বান্দার দিকে দশ স্টেপ এগিয়ে আসবেন। কিন্তু অন্ততপক্ষে প্রথম স্টেপটা বান্দাকে নিতে হবে.
৬. ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম
আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।
আমরা তো আগের আয়াতে বলে ফেললাম যে "আল্লাহ শুধু তোমারই ইবাদাত করি". কিন্তু, এই ইবাদাতটা আমরা কিভাবে করবো? কি করলে সত্যিকার অর্থে আমাদের দ্বীন, দুনিয়া, আখিরাতের কল্যাণ হবে? তাই এই আয়াতে আমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দিক-নির্দেশনা চাচ্ছি। "সীরাতাল মুস্তাকিমের" পথ চাচ্ছি। "সীরাত" মানে যেই পথটা স্ট্রেইট, সহজ এবং ক্লিয়ার! একটা রাস্তা যখন পুরোপুরি স্ট্রেইট হয়, তখন অনেক দূর থেকেও সেই রাস্তার শেষ মাথায় গন্তব্য ক্লিয়ারলি দেখা যায়. মুসলিমরাও তাদের গন্তব্য এবং জীবনে চলার পথের পারপাস নিয়ে ক্লিয়ার - তারা চায় আল্লাহর সন্তুষ্টি এন্ড জান্নাত!
৭. সিরাতাল্লাযীনা আন আমতা আলাইহিম গইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দল্লীন! আমিন।
"সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।"
এর আগের আয়াতে আমরা আল্লাহর কাছে ইন্সট্রাকশন চেয়েছি, এই আয়াতে আমরা চাচ্ছি জলজ্যান্ত রোল মডেল! ''সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ'' - এরা হচ্ছেন নবী-রসূল (সা:). তাঁরা যেই উদাহরণ সেট করে গিয়েছেন আমাদের জন্যে - আমরা সেটা ফলো করতে পারলে দুনিয়া-আখিরাতে কল্যাণ পাবো! শুধু ভালো উদাহরণ-ই না, পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্টের সাথে সাথে নেগেটিভ রিইনফোর্সমেন্টরও উদাহরণ আছে আয়াতের পরের অংশে. আমরা তাদের পথ চাই না "যাদের উপর আল্লাহর গজব নাযিল হয়েছে" - এরা হচ্ছে সেসমস্ত লোক, যাদেরকে আল্লাহ সঠিক জ্ঞান দিয়েছেন, তার পরও তারা আল্লাহকে মানেনি। জেনে বুঝেও ইসলামকে পালন করেনি। তাদের জ্ঞান ছিল, কিন্তু কোনো সৎকর্ম ছিলোনা। অপরদিকে "ওয়ালাদ্দোল্লীন" হলো যারা পথভ্রষ্ট - তারা সেসমস্ত লোক যাদের হয়তো ভালো ভালো কর্ম আছে, কিন্তু তারা সেটা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যে করেনা। নিজের জন্যে বা দুনিয়ার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে করে - তাই তারা পথভ্রষ্ট! আমরা এই আয়াতে আল্লাহর কাছে ঈমানহীন কর্ম এবং কর্মহীন ঈমানের কাছ থেকে আশ্রয় চাই! এই দুইটাই আমাদের দুনিয়া-আখিরাত ধবংস করে দিতে যথেষ্ট!
রুকু এবং সিজদার দুয়া
আমরা রুকুতে বলি "সুবহানা রব্বিয়াল আযীম". অর্থঃ "আল্লাহ আপনি কতই না পবিত্র এবং আপনি সবচেয়ে শক্তিধর।" আমরা সিজদায় বলি, "সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা’. অর্থঃ ''আল্লাহ আপনি কতই না পবিত্র এবং আপনার মাকাম সবচেয়ে উঁচু"।
নামাজের মধ্যে ফিজিক্যালি উইক এবং সবচেয়ে নড়বড়ে অবস্থাটা হচ্ছে "রুকু"। রুকুরত অবস্থায় কেউ যদি নামাজীকে হালকা করেও একটা ধাক্কা দেয়, সে ধপাস করে মাটিতে পড়ে যাবে। চমৎকার ব্যাপারটা হচ্ছে, আমরা যখন নামাজে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকি, তখন বলি "আল্লাহ আপনি সবচেয়ে শক্তিশালী!" আবার, আমরা যখন নামাজের মধ্যে সবচেয়ে নিচু অবস্থানে থাকি, তখন আল্লাহকে বলি যে, "আল্লাহ আপনি সবচেয়ে উঁচু!" সুবহানাল্লাহ! জাস্ট এই কনসেপ্টটা আমাদের নামাজকে অন্য আরেক ডাইমেনশানে নিয়ে যায়! নামাজ পড়তে পড়তে যেখানেই মন চলে যাক না কেন, রুকু আর সিজদাহ দেওয়ার সময় মনে পড়ে যায় যে, "আল্লাহ সবচেয়ে শক্তিধর এবং আল্লাহ সর্বোচ্চ!"
তারপর রুকু থেকে উঠতে উঠতে আমরা বলি - "সামি আল্লাহু লিমান হামিদা" অর্থ: "আল্লাহ সেই ব্যক্তির কথা শোনেন, যে তার প্রশংসা করে।" তারপর পরই দাঁড়িয়ে সোজা হয়ে আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি - "রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ’ অর্থ, হে আল্লাহ! যাবতীয় প্রশংসা কেবল তোমারই। যেন আমাদের কথাগুলি যে আল্লাহ সুবহানাতা'আলা শুনবেন, সেটা নিশ্চিত করে রাখলাম। ঠিক সিজদায় যাবার আগে কেন এটা নিশ্চিন্ত করে নিলাম যে, আল্লাহ আমার সব কথা শুনবেন?
কারণ, সিজদায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে চলে যায় এবং সিজদা হচ্ছে দুয়া কবুলের মোক্ষম সময়। রসূল (সা.) বলেছেন, ‘সিজদারত বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী। সুতরাং সে সময় তোমরা বেশি বেশি দুয়া করো।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৮২)। তাই আল্লাহর সাথে বান্দার এই মহামিলনের ঠিক আগ মুহূর্তে "সামি আল্লাহু লিমান হামিদা" রিমাইন্ডার দিচ্ছে যে, আল্লাহর কাছে যা চাওয়ার সিজদায় গিয়ে উজাড় করে চেয়ে নাও। তিনি তোমার সব আকুতি-মিনতি শুনছেন। একটাও মাটিতে পড়বেনা। প্রতিটা দুয়া রব্বুল আলামিনের দরবারে মেহমান হয়ে পৌঁছাবে।
তাশাহুদ
১. ‘আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস্ সালাওয়াতু, ওয়াত্ তইয়িবাতু" - “সকল অভিবাদন (Greeting) ও সম্মান আল্লাহর জন্য, সকল সালাত আল্লাহর জন্য এবং সকল ভাল কথা ও কর্মও আল্লাহর জন্য।" আমরা একজন আরেকজনকে কথার শুরুতে অভিবাদন জানাই সালাম দেওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু আল্লাহকে আমরা "আসসালামুয়ালাইকুম" বলতে পারি না। কারণ, আল্লাহ নিজেই "সালাম", তিনি সকল শান্তির মালিক। তাকে আমরা বলতে পারিনা, "আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক!" সেজন্য তাশাহুদের প্রথম অংশ উৎসর্গ করা হয়েছে আল্লাহকে রাজকীয়ভাবে অভিবাদন করে। ইমাম শাফিঈ (রহঃ) বলেন, আপনি যখন কোনো রাজার প্রাসাদে প্রবেশ করবেন, অন্যান্য দশজনকে যেভাবে সম্বোধন করেন, সেভাবে কিন্তু রাজাকে ডাকবেন না." আল্লাহ সুবহানাতা'য়ালা হচ্ছেন রাজাদের রাজা! "‘আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ..." হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু রাজার জন্যে সম্ভাষণ! সকল অভিবাদন, সম্মান, ভালো কথা ও কাজ কেবল মাত্র আল্লাহরই জন্যে!
২. "আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবীয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু" - ''হে নবী! আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত বর্ষিত হোক।"
এখানে আমরা প্রিয় রসূল(সা:) এর কাছে আমাদের সালাম ও দুয়া দিচ্ছি। আমাদের দুয়ার কিন্তু আল্লাহর রসূল(সা:) এর কোনো দরকার নেই। তিনি আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে এক মাকামে পৌঁছে গেছেন। রসূল(সা:) এর উপর দরূদ পাঠ করলে লাভটা আমাদেরই হয়। কারণ আমরা একবার রসূল(সা:) কে সালাম দিলে, আল্লাহ আমাদের জন্যে দশবার সালাম পাঠান! সুবহানাল্লাহ!!! স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম আসাটা গাঁয়ে কাঁটা দেবার মতন একটা ব্যাপার! আমার মনে আছে, খাদিজা(রা:) এর জীবনী পড়ার সময় এক পর্যায়ে পড়লাম, ফেরেস্তা জিবরীল (আঃ) আল্লাহর রসূল(সা:)কে বললেন: "আমার ইচ্ছা আপনি আমার এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত খাদিজা (রাঃ)কে সালাম পৌঁছে দেবেন।" আমার পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, সুবহানাল্লাহ এটা কি পড়লাম? আল্লাহর কাছ থেকে স্বয়ং সালাম পাওয়া? এ কোন লেভেলের আনন্দ আর সম্মান? আমার মতন অধম বান্দার কাছে কি কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম আসবে? এও কি সম্ভব? আলহামদুলিল্লাহ সম্ভব! নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করবে, তার বিনিময়ে আল্লাহ্ তার উপর দশবার দরুদ পাঠ করবেন। [সহীহ সুনান নাসাঈ হাদিস -১২৯৭]
সেলফ-রিফ্লেকশন: তাশাহুদের প্রথম লাইনের মাধ্যমে আমরা আল্লাহকে সাদরে সম্ভাষণ জানালাম এবং দ্বিতীয় লাইনের মাধ্যমে আল্লাহ যেন আমাদেরকে সেই সম্ভাষণের উত্তর দিলেন আমাদের দরূদ পাঠের মাধ্যমে।
৩. "আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস্ সালিহীন।" - "আমাদের উপরে এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের উপরে শান্তি বর্ষিত হোক।"
এবার আমরা দুয়া করছি নিজেদের জন্যে এবং পরে আল্লাহর বাকি সমস্ত নেক বান্দাদের জন্যে। এখানে আল্লাহ আমাদের শিখাচ্ছেন যেন দুয়া করার সময় আমরা শুধু নিজের জন্যে না চেয়ে সবার জন্যে চাই। "সালিহীন" হচ্ছেন আল্লাহর খুব কাছের বান্দারা। যারা আল্লাহর পাঠানো অর্ডার মেনে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাশাহুদের এই অংশটা খুব পাওয়ারফুল। আমি যদি চেষ্টা করে কোনোভাবে আল্লাহর "সলিহীন" বান্দা হতে পারি, তাহলে পৃথিবীর ১.৯ বিলিয়ন মুসলিমরা যে যখনই নামাজে তাশাহুদ পড়বে, সেটা আমার জন্যে দুয়া হিসেবে কাউন্ট হবে! সুবহানাল্লাহ!! গোটা বিশ্বের মুসলিমরা দিনের মধ্যে পাঁচবার করে আমার জন্যে দুয়া করবে! এর মধ্যে না জানি আল্লাহর কত ওয়ালী আছেন, আল্লাহর বন্ধু আছেন! তাদের সবার দুয়া পাওয়া যাবে যদি সালিহীন হতে পারা যায়! এটা আমাদের সবার জন্যে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবার জন্যে চেষ্টা করার পথে এক বিশাল ইন্সপারেশান! সলিহীন হবার অনুপ্রেরণা!
৪. "আশহাদু আল-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশ্হাদু আননা মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রসুলুহু।" - আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল।”
তাশাহুদের শেষে এসে আমরা আবারো আল্লাহর সামনে নিজেদের দাসত্ব স্বীকার করছি। যদি এমন হয়ে থাকে যে, আল্লাহর ছাড়া অন্য কাউকে খুশি করার জন্যে এতক্ষন নামাজ পড়েছি, জীবন গড়ছি স্রেফ নিজেকে নাহলে অন্য কাউকে খুশি করতে! তাহলে এখানে এসে এটা আবার মনে করিয়ে দিলো যে, নিজের ইচ্ছা-লালসা, সোসাইটি, রেপুটেশন - সবকিছুর থেকে আল্লাহ বড়! আমরা নিজেই সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করবোনা।
২য় লাইনে আমরা রসূল(সা:) এর উঁচু মাকাম সম্পর্কে ধারণা পাই! কিন্তু এই অভাবনীয় চমৎকার মানুষটিও সবার আগে নিজেকে আল্লাহর দাস বলে স্বীকার করেন। এবং আমরাও তারই সাক্ষ্য দেই। যেই মানুষটাকে আল্লাহ সিলেক্ট করেছেন আল্লাহর নবী হতে, যে আল্লাহর সাথে লিটারেলি দেখা করে এসেছেন সাত আসমানের উপর থেকে - তারও আল্লাহর সামনে কোনো ক্ষমতা নেই। সেখানে আমি আর আপনি? সুবহানাল্লাহ!
দরূদ শরীফ
"আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদিও। ওয়ালা আলি মুহাম্মাদিন। কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহীমা ওয়ালা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়ালা আলি মুহাম্মাদিন। কামা বারাক্তা আলা ইব্রাহীমা ওয়ালা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। "
অর্থ: “ হে আল্লাহ! আপনি নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উনার বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপভাবে আপনি ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও তার বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করেছিলেন। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত।”
নবী(সা:) এর প্রতি দরূদ পড়ার নির্দেশ আল্লাহতা'য়ালা নিজেই দিয়েছেন। নবীর প্রতি দরূদ পড়া আল্লাহর আদেশের বাস্তবায়ন করা। সূরা আহযাবের ৫৬ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি সালাত-দরূদ পেশ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তার প্রতি সালাত পেশ করো এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।’
আবদুল্লাহ ইবনে আমর আস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশবার দরূদ পাঠ করবেন।’ –সহিহ মুসলিম: ৩৮৪
আলী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রকৃত কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার কাছে আমি উল্লিখিত হলাম (আমার নাম উচ্চারিত হল), অথচ সে আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল না।’ –সুনানে তিরমিজি: ৩৫৪৬
রসূল(সা:) এর নাম শোনার পর তার উপর দরূদ না পড়াটা মারাত্মক ব্যাপার! প্রায় সময়েই আমরা খুব নর্মালভাবে মুহাম্মদ (সা:) এর নাম উল্লেখ করি, বা শুনি যে অন্য কেউ উল্লেখ করছে, কিন্তু বলার বা শোনার সাথে সাথে "সাল্লাল্লাহু ওয়া আলাইহি ওয়া সাল্লাম" বলিনা। মাত্র ২ সেকেন্ড লাগে বলতে, কিন্তু খেয়াল থাকেনা বলতে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) নাম শুনে যে ব্যক্তি দরূদ পড়ে না তার জন্য হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম বদদুয়া করেছেন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমীন বলেছেন।
কাব ইবনে উজরা (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, "তোমরা মিম্বরের কাছে একত্রিত হও। আমরা উপস্থিত হলাম। যখন তিনি মিম্বরের প্রথম স্তরে চড়লেন তখন বললেন, হে আল্লাহ কবুল করুন। তারপর যখন দ্বিতীয় স্তরে চড়লেন তখনও বললেন, হে আল্লাহ কবুল করুন। তারপর তৃতীয় স্তরে চড়ে আবারও বললেন, হে আল্লাহ কবুল করুন। খুতবা শেষে যখন মিম্বর থেকে অবতরণ করলেন, তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আজ আমরা আপনার থেকে এমন কিছু শুনলাম যা এর পূর্বে আর কখনও শুনিনি। তখন তিনি বললেন, আমার কাছে জিবরাইল (আ.) এসে বলল, যে ব্যক্তি রমজান পেয়েও তাকে ক্ষমা করা হলো না- সে বঞ্চিত হোক। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ কবুল করুন। যখন দ্বিতীয় স্তরে চড়লাম তখন তিনি বললেন, যার কাছে আপনার নাম উল্লেখ করা হলো কিন্তু সে আপনার ওপর দরূদ পড়ল না- সেও বঞ্চিত হোক। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ কবুল করুন। যখন তৃতীয় স্তরে চড়লাম, তখন তিনি বললেন, যে পিতা-মাতাকে অথবা তাদের কোনো একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েও তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না সেও বঞ্চিত হোক। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ কবুল করুন।" -বায়হাকি: ১৪৬৮
আবু বকর (রা:) এর নামাজের দুয়া
আবু বকর(রাঃ) একবার রাসূল (সা:) কে অনুরোধ করলেন, "ইয়া আল্লাহর রসূল (সা:)! আমাকে এমন একটা দুয়া শিখিয়ে দেন, যেটা পরে আমি নামাজে আল্লাহকে ডাকতে পারবো।" তখন রসূল (সাঃ) তাকে শিখিয়ে দিলেন এই দুয়াটা - "আল্লাহুম্মা ইন্নি জলামতু নাফসি যুলমান কাছিরা, ওয়ালা ইয়াগ ফিরূজ যুনুবা ইল্লা আন্তা ফাগফিরলি মাগফিরাতম মিন ইনদিকা ওয়ার হামনি ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহিম |" (সহীহ বুখারী)
"হে আল্লাহ! আমি আমার নিজের আত্মার উপর অত্যাধিক অত্যাচার করেছি এবং তুমি ছাড়া পাপ ক্ষমা করার কেউ নেই । সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমার প্রতি রহম কর । নিশ্চই তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল দয়ালু।"
"যুলুম" আমরা সাধারণত বুঝি যে কোনো অত্যাচারী ক্ষমতাসীন ব্যক্তি তার থেকে দুর্বল শ্রেণীর কারো সাথে অবিচার করছে। এরকম অত্যাচার করাকে আমরা ভালো চোখে দেখিনা। অথচ আমরা নিজেরাই নিজেদের উপর সবচেয়ে বড় অত্যাচার করি যখন আমাদের আত্মাকে আমরা আল্লাহ থেকে বঞ্চিত করি. যতবার আমরা পাপ করি আমরা আমাদের নিজেদের উপর অত্যাচার করি. আল্লাহর আদেশ অমান্য করা আত্মার উপরে করা সবচেয়ে বড় যুলুম! নামাজের এই পর্যায়ে এসে আমরা নিজেদেরকে অত্যাচারী হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছি এবং জালিমে পরিণত হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।
আমরা যখন জালিম হয়ে যাই, তখন আল্লাহ ছাড়া আমাদেরকে রক্ষা করার আর কেউ নেই! তাই আল্লাহর কাছেই "মাগফিরাহ" এবং "রাহমাহ" চাই! আল্লাহর কাছেই ক্ষমা ও রহমত চাই. "ফাগফিরলী মাগফিরাহ" এবং "ওয়ারহামনি" এই দুইটার মানেই আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া। কিন্তু তাদের মধ্যে খুব সুন্দর একটা পার্থক্য আছে! এখানে "মাগফিরাহ" এর তাৎপর্য হলো, যত বড় গুনাহ-ই বান্দা করুক না কেন, আল্লাহ মাফ করতে সক্ষম! আর "ওয়ারহামনি" এর তাৎপর্য হলো, যতবারই বান্দা গুনাহ করুক না কেন, আল্লাহ মাফ করতে সক্ষম! সুবহানাল্লাহ! একই ভুল কেউ দুইবার করছে দেখলেই আমাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়! ছোট ছোট ভুল আমরা কোনোমতে মাফ করতে পারলেও কেউ বড় রকমের কোনো অঘটন ঘটালে কিছুতেই মাফ করতে পারিনা। সেখানে আল্লাহ হলেন রাহমানুর রাহিম! তিনি বড় গুনাহ ক্ষমা করেন এবং বার বার ক্ষমা করেন!
বিতর নামাজে দুয়া কুনুত
আমাদের মসজিদে বিতরের নামাজ পড়ানোর সময় ইমাম সাহেব অন্য একটা দুয়া কুনুত পড়ছিলেন। এটাও সহীহ দুয়া। ওই দুয়াটা আমার মুখস্ত ছিল না। কখনো পড়াও হয়নি। আজকে দুয়া কুনুত খুঁজতে গিয়ে ইমামের পড়া সেই দুয়াটা খুঁজে পেলাম। সুবহানাল্লাহ সেই দুয়ার অর্থ পড়ে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য!
● দুয়ার অর্থঃ "আল্লাহ আপনি যাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে আমাকেও হিদায়েত দিন। আপনি যাদেরকে নিরাপত্তা (আ'ফিয়া) প্রদান করেছেন, তাদের মধ্যে আমাকেও নিরাপত্তা দিন। আপনি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে আমার অভিভাবকত্বও গ্রহণ করুন। আপনি আমাকে যা দিয়েছেন, তাতে বরকত দিন। আপনি যা ফায়সালা করেছেন তার অকল্যাণ থেকে আমাকে রক্ষা করুন। কারণ, আপনিই চূড়ান্ত ফায়সালা দেন, আপনার বিপরীতে ফায়সালা দেওয়া হয়না। আপনি যার সাথে বন্ধুত্ব করেছেন, নিশ্চয়ই সে কখনো অপমানিত হয়না। আপনি বরকতপূর্ণ হে আমাদের রব! আপনি সুউঁচ্চু মহান!"
সুবহানআল্লাহ! অর্থটা এতো সুন্দর যে ইচ্ছা করে এখনই আরবি দুয়াটাও মুখস্থ করে ফেলি,
"আল্লাহুম্মাহ দিনী ফি মান হাদাইত, ওয়া আ'ফিনী ফি মান আফাইত। ওয়াতাওয়াল্লানী ফিমান তাওয়াল্লাত। ওয়া বারিকলি ফিমা আ'ত্বইত। ওয়াকীনি শাররমা কদাইত। ফা ইন্নাকা তাক্বদী ওয়ালা ইয়ুকদা আলাইক। ওয়া ইন্নাহু লাইয়াজিল্লু মানওয়ালাইত। তাবারকতা রব্বানা ওয়াতা ওয়াতাআ'লাইত।"
(দুয়া কুনুত - আবু দাউদ ১৪২৫, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, নামাসি ১৭৪৫)
● আর যেই দুয়া কুনুতটা আমরা বেশিরভাগ সময় নামাজে পড়ে অভ্যস্ত, সেটার অর্থটাও বেশ সুন্দর। সেটা হলো,
"আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তায়ীনুকা, ওয়া নাস্তাগ্ফিরুকা, ওয়া নু'মিন বিকা, ওয়া নাতাওয়াক্কালু 'আলাইকা, ওয়া নুছনী আলাইকাল খাইর, ওয়া নাশ কুরুকা, ওয়ালা নাকফুরুকা, ওয়া নাখলাউ, ওয়া নাতরুকু মাঁই ইয়াফজুরুকা আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া লাকানুসল্লী, ওয়া নাসজুদু, ওয়া ইলাইকা নাস'আ, ওয়া নাহফিদু, ওয়া নারজু রাহমাতাকা, ওয়া নাখশা আযাবাকা, ইন্না আযাবাকা বিল কুফ্ফারি মুলহিক।"
অর্থ: হে আল্লাহ আমরা তোমারই সাহায্য চাই, তোমারই নিকট ক্ষমা চাই, তোমারই প্রতি ঈমান রাখি, তোমারই ওপর ভরসা করি এবং সকল, মঙ্গল তোমারই দিকে ন্যস্ত করি। আমরা তোমার কৃতজ্ঞ হয়ে চলি অকৃতজ্ঞ হই না. যারা তোমাকে অমান্য করে তাদের সাথে আমরা সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করি ও তাদের ত্যাগ করি। হে আল্লাহ আমরা তোমারই দাসত্ব করি তোমারই জন্য নামায পড়ি এবং তোমাকেই সিজদাহ করি, আমরা তোমারই দিকে দৌড়াই ও এগিয়ে চলি। আমরা তোমারই রহমত, আশা করি এবং তোমার আযাবকে ভয় করি আর তোমার আযাবতো কাফেরদের জন্যই র্নিধারিত। (সহীহ আল বায়হাকি, ২/২১০)
নামাজ শেষে পড়ার কিছু দুয়া
নামাজটা শেষ হলেই মনে হয় এই মুহূর্তে জায়নামাজ গুটিয়ে দৌড় দিতে হবে! অথচ জায়নামাজে বসে দুই মিনিট যিকির করার ভার্চু বলে শেষ করা যাবে না! নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে করে ফেলা যায় এমন আমার প্রিয় কয়টা আমল আছে।
● “রাসুল (সাঃ) যখন নামাজ শেষে সালাম ফেরাতেন তখন তিনি তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলতেন।এখানে প্রশ্ন হলো, আমরা এইমাত্র নামাজ পড়লাম! নেকীর একটা কাজ করলাম। তাহলে ভালো একটা কাজের শেষে কেন "আস্তাগফিরুল্লাহ" বলছি? এটার উইজডম হচ্ছে, ঈমানদাররা কখনোই কোনো ভালো কাজ করে "অনেক কিছু করে ফেললাম" এরকম মনোভাব রাখতে পারিনা। ভালো কিছু করেই সেটা নিয়ে অহংকারী হয়ে যেতে পারিনা। বরং যেই কাজটা করেছি সেটার মধ্যেও যে নিজেদের ভুল ত্রুটি থাকতে পারে, এটা স্বীকার করে নিয়ে সাথে সাথে আল্লাহর কাছে নিজেদের অপারগতার জন্যে ক্ষমা চাই। রসূল (সা:) এর মতন পিউর মানুষ, যেখানে তিনি নামাজ শেষ হতে না হতেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন, সেখানে নামাজ শেষে সেই ক্ষমার আমাদের আরো বেশি প্রয়োজন! অনেকের ব্যস্ততার জন্যে জায়নামাজে বেশিক্ষন বসে থেকে জিকির করা সম্ভব না হলেও তিন সেকেন্ডে তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ বলে এই সুন্নাহ পালন করাটা বেশ প্রাকটিক্যাল আলহামদুলিল্লাহ!
নামাজ শেষে তিন বার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে রাসূল (সা:) বলতেনঃ “আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতা ইয়া যাল-জালা-লী ওয়াল ইকরাম”। "হে আল্লাহ্! আপনিই শান্তি, আপনার কাছ থেকেই শান্তি আসে। আপনি বরকতময়, পরাক্রমশালী এবং মর্যাদা প্রদানকারী।"
(মুসলিম১/২১৮, আবু দাউদ ১/২২১, তিরমিযী ১/৬৬।)
● হজরত মুআয ইবনে জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার হাত ধরে বললেন, হে মুআয! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে ভালবাসি, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমিও আপনাকে ভালবাসি। তিনি বললেন, মুআয তুমি প্রত্যেক নামাজের শেষে এই দুয়াটি কখনো পড়া থেকে বিরত থেকো না- ‘আল্লাহুম্মা আ-ইন্নি আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিক।’ (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত)
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে সাহায্য করুন যেন আমি আপনাকে মনে রাখতে পারি, আপনার শুকরিয়া আদায় করতে পারি এবং সবচেয়ে সুন্দরভাবে আপনার ইবাদাত করতে পারি।"
● জুওয়াইরিয়া (রা.) বলেন, একদিন আল্লাহর নবী (সা.) ফজরের সময় আমার ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। তখন আমি জায়নামাজে বসে আল্লাহর জিকির করছিলাম। রসূল(সা:) কয়ঘন্টা পরে চাশতের নামাজের সময় হলে আমার ঘরে ফিরে এলেন। তখনও আমি জায়নামাজেই বসে ছিলাম। তখন রসূল(সা:) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘জুওয়াইরিয়া! আমি যাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এভাবেই তুমি যিকিরে মশগুল ছিলে? আমি বললাম, "হ্যাঁ।" তখন তিনি আমাকে বললেন, "আমি তোমাকে চারটি বাক্য বলছি (তিনবার করে)। যদি এগুলোকে ওজন করা হয় তবে তোমার করা সমস্ত জিকিরের চেয়ে এগুলোই বেশি ভারি হবে। আর তা হলো -"সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আদাদা খলকিহি, ওয়া-রিদা নাফসিহি, ওয়া জিনাতা আরশিহি, ওয়া মিদাদা কালিমাতিহি। " (সহিহ মুসলিম শরিফ : ৭০৮৮)
অর্থ: "আমি আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা সমেত তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করছি। সেই পরিমাণে ঘোষণা করছি যেটা তার সৃষ্টিকুলের সংখ্যার পরিমাণ, তিনি সন্তুষ্ট হওয়ার পরিমাণ, তার আরশের ওজনের সমপরিমাণ, তার কথা লিপিবদ্ধ করার কালি পরিমাণ।" সুবহানাল্লাহ! অর্থটা পড়লে বুঝা যায় যে কেন ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে যিকির করার সওয়াব পেয়ে যাওয়া সম্ভব শুধু এই চারটি বাক্য বলার মাধ্যমে!
● লাস্ট দুয়াটা আমার কাছে খুব স্পেশাল। আমার মনে হয়, এই পৃথিবীতে একটা মানুষ যা যা চাইতে পারে, তার সবকিছু এক কথায় সামারাইজ করা হয়েছে এই দুয়াটাতে! হজরত উম্মে সালামা রা. বলেন, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফজরের নামাজের সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই নিয়মিত এ দুয়াটি পড়তেন।
"আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিয়ান, ওয়া রিজকান তাইয়্যিবান, ওয়া আমলান মুতাক্কব্বালান।"
"হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এমন জ্ঞান চাই যেটা কল্যাণকর, এমন রিজিক চাই যা পবিত্র ও হালাল। এবং এমন আমল করার তাওফিক চাই যা তোমার দরবারে কবুল হবে।" [ইবনে মাজাহ-৯২৫ নাসায়ি সুনানে কুবরা-৯৯৩০]
সুবহানাল্লাহ! জীবনের ১৫ থেকে ২০ বছর চলে যায় ডিগ্রি অর্জন করে ভালো একটা চাকরির পিছনে ছুটতে ছুটতে! এতো সাধনার সেই জ্ঞান যদি শেষ দিবসে আমাদের উপকারী না হয় আর আমাদের অর্জিত রিজিক যদি পবিত্র না হয় - তাহলে বিরাট লস!! আর এই দুই অর্জনের মাঝে যা যা আমল করা হয় সেটা যদি আল্লাহর দরবারে কবুল না হয়, তাহলে দুনিয়া-আখিরাত দুইটাই বরবাদ! সেজন্যেই এই দুয়াটা বেস্ট!
আল্লাহ আমাদের নামাজগুলির মাধ্যমে আমাদের জন্যে কল্যাণের দরজা খুলে দিক. আমাদের দুনিয়া এবং আখিরাত কবুল করে নিক! আমিন!
নামাজে মনোযোগ ধরে রাখার কিছু প্র্যাকটিক্যাল টিপস
◘ সর্ব প্রথম বান্দার সালাতের হিসাব নেয়া হবে। তাতে হয় সে মুক্তি পাবে অথবা ধ্বংস হবে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার সালাতের হিসাব হবে। যদি সালাত ঠিক হয় তবে তার সকল আমল সঠিক বিবেচিত হবে। আর যদি সালাত বিনষ্ট হয় তবে তার সকল আমলই বিনষ্ট বিবেচিত হবে। [তিরমিযি:২৭৮]
◘ “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -কে জিজ্ঞাসা করা হল, আল্লাহর নিকট কোন আমল সবচেয়ে বেশি প্রিয় ? তিনি বলেন-সময় মত সালাত আদায় করা, আবার জিজ্ঞাসা করা হল তার পর কোনটি? উত্তরে তিনি বলেন-মাতা পিতার সাথে সদাচরন করা। আবার জিজ্ঞাসা করা হল তার পর কোনটি? উত্তরে বললেন আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” [বোখারি:৪৯৬]
◘ “মুসলিম বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করে তখন তার গুনাহ এমনভাবে ঝরে পড়তে থাকে যেমন এই বৃক্ষের পাতা ঝরে পড়ে।” [আহমদ : ২০৫৭৬]
◘ “তুমি বেশি করে আল্লাহর জন্য সেজদা-সালাত আদায় করতে থাক, কারণ তোমার প্রতিটি সেজদার কারণে আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং তোমার গুনাহ মাপ করবেন।” [মুসলিম:৭৩৫]
◘ “এবং তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। অবশ্যই তা কঠিন কিন্তু বিনীতগণের জন্যে নয়। যারা ধারণা করে যে নিশ্চয় তারা তাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবে এবং তারা তারই দিকে প্রতিগমন করবে।” [সুরা বাকারাহ : ৪৫,৪৬]
◘ “মুমিনগণ সফলকাম, যারা তাদের সালাতে নম্রতা ও ভীতির সাথে দণ্ডায়মান হয়।” [সূরা মোমিন: ১-২]। অতঃপর বলেন: “আর যারা তাদের সালাতে যত্নবান, তারাই জান্নাতের ওয়ারিশ-যারা ফিরদাউসের ওয়ারিশ হবে এবং তথায় তারা চিরকাল থাকবে।” [সুরা আল-মোমিন: ৯,১০,১১]
ইয়া রাব্বুল আলামিন! আমাদেরকে এমন ভাবে সালাত আদায়ের তাওফিক দিন যেটা আমাদের দ্বীন, দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্যে কল্যাণের উৎস হয় এবং আপনার সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জনের উসিলাহ হয়! আমিন।
(প্রতিটা কথা আগে আমার নিজের জন্যে রিমাইন্ডার!
"নামাজে মন ফেরানো সিরিজ" এর সমাপ্ত আলহামদুলিল্লাহ ... )
- শারিন সফি অদ্রিতা
𝐒𝐨𝐮𝐫𝐜𝐞: "𝑀𝑒𝑎𝑛𝑖𝑛𝑔𝑓𝑢𝑙 𝑃𝑟𝑎𝑦𝑒𝑟" 𝐶𝑜𝑢𝑟𝑠𝑒 𝑏𝑦 𝑆ℎ𝑎𝑦𝑘ℎ 𝐴𝑏𝑑𝑢𝑙 𝑁𝑎𝑠𝑖𝑟 𝐽𝑎𝑛𝑔𝑑𝑎. (more details in their website: https://www.qalam.institute/meaningfulprayer)
Tafsir Ibna Kathir

No comments:
Post a Comment