জুম্মাহ বিষয়ক প্রশ্নোত্তর :
প্রশ্ন :- জুমার দিন কি খুতবা শোনা ওয়াজিব? ওয়াজিব হলে খুতবা চলাকালীন তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ পড়ার বিধান কি??
▬▬▬▬✪✪✪▬▬▬▬
জুমার খুতবা চলাকালীন সময় দু রাকআত দুখুলুল মসজিদ ছাড়া বাকি খুতবা শুনা ওয়াজিব। খুতবা চলার সময় বেচা-কেনা, দুনিয়াবি কাজে ব্যস্ত থাকা, গল্প-গুজব করা এমনকি কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি নিষেধ। বরং মুসল্লির কর্তব্য হবে, খুব মনোযোগ সহকারে জুমার খুতবা শোনা। তবে এ অবস্থায় দু রাকআত দুখুলুল মসজিদের সালাত আদায় করা এই বিধানের বাইরে।
কেননা, খুতবা চলাকালীন সময় কেউ মসজিদ প্রবেশ করলেও রাসুল সা. হালকা ভাবে দু রাকআত সালাত আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি সুলাইক আল গাতাফানী রা. নামক সাহাবীকে খুতবা চলাকালীন সময় বসা থেকে উঠিয়ে তারপর দু রাকআত সালাত পড়ার পর বসতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এ মর্মে সহীহ মুসলিমের জুআর সালাত অধ্যায়ে ‘ইমামের খুতবা চলাকালীন সময়ে দু রাকাআত তাহিয়াতুল মসজিদ/দুখুলুল মাসজিদের সালাত আদায়’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে একাধিক হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে।
♻ নিন্মে এ প্রসঙ্গে সহীহ মুসলিমে উদ্ধৃত কয়েকটি হাদিসগুলো পেশ করা হল:
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ بَيْنَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِذْ جَاءَ رَجُلٌ فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " أَصَلَّيْتَ يَا فُلاَنُ " . قَالَ لاَ . قَالَ " قُمْ فَارْكَعْ " .
◾ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমু'আর খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন এক ব্যাক্তি এল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, হে অমুক! তুমি সালাত আদায় করেছ কি? সে বলল, না। তিনি বললেন, দাঁড়াও সালাত আদায় করে নাও। [সহীহ মুসলিম - ১৮৯১]
سَمِعَ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ، يَقُولُ دَخَلَ رَجُلٌ الْمَسْجِدَ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَقَالَ " أَصَلَّيْتَ " . قَالَ لاَ . قَالَ " قُمْ فَصَلِّ الرَّكْعَتَيْنِ " . وَفِي رِوَايَةِ قُتَيْبَةَ قَالَ " صَلِّ رَكْعَتَيْنِ " .
◾ কুতায়বা ইবনু সাঈদ ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ... জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, জনৈক ব্যাক্তি মসজিদে প্রবেশ করল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমু'আর দিন খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, তুমি সালাত আদায় করেছ কি? সে বলল না। তিনি বললেন, দাঁড়াও দু'রাকআত সালাত আদায় করে নাও। আর কুতায়বার বর্ণনা হল, তিনি বললেন, দু'রাকআত সালাত আদায় করে নাও।
[সহীহ মুসলিম - ১৮৯৩]
وَحَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا لَيْثٌ، ح وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ رُمْحٍ، أَخْبَرَنَا اللَّيْثُ، عَنْ أَبِي الزُّبَيْرِ، عَنْ جَابِرٍ، أَنَّهُ قَالَ جَاءَ سُلَيْكٌ الْغَطَفَانِيُّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَاعِدٌ عَلَى الْمِنْبَرِ فَقَعَدَ سُلَيْكٌ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " أَرَكَعْتَ رَكْعَتَيْنِ " . قَالَ لاَ . قَالَ " قُمْ فَارْكَعْهُمَا " .
◾ জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুলায়ক গাতফানী (রাঃ) শুক্রবার দিনে (মসজিদে) এলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরের উপরে বসা ছিলেন। সুলায়ক (রাঃ) সালাত আদায় না করে বসে পড়লেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি দু'রাক'আত সালাত আদায় করেছ? তিনি বললেন, না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি দাঁড়াও দু'রাকআত সালাত আদায় করে নাও।
[সহীহ মুসলিম - ১৮৯৬]
وَحَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، وَعَلِيُّ بْنُ خَشْرَمٍ، كِلاَهُمَا عَنْ عِيسَى بْنِ يُونُسَ، - قَالَ ابْنُ خَشْرَمٍ أَخْبَرَنَا عِيسَى، - عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي سُفْيَانَ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ جَاءَ سُلَيْكٌ الْغَطَفَانِيُّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ فَجَلَسَ فَقَالَ لَهُ " يَا سُلَيْكُ قُمْ فَارْكَعْ رَكْعَتَيْنِ وَتَجَوَّزْ فِيهِمَا - ثُمَّ قَالَ - إِذَا جَاءَ أَحَدُكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالإِمَامُ يَخْطُبُ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ وَلْيَتَجَوَّزْ فِيهِمَا " .
◾ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন সূলায়ক গাতফানী (রাঃ) জুমআর দিনে এলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দিচ্ছিলেন। সুলায়ক (রাঃ) বসে পড়লেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে সূলায়ক! তুমি দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে দু'রাকআত সালাত আদায় করে নাও। তারপর বললেন:
“তোমাদের কেউ জুমু'আর দিন মসজিদে এলে, ইমাম তখন খুৎবারত থাকলে সংক্ষিপ্ত আকারে দু' রাকআত সালাত আদায় করে নেবে।”
[সহীহ মুসলিম - ১৮৯৭]
এ ছাড়াও সাধারণভাবে যে কোন সময় মসজিদে প্রবেশ করলে কমপক্ষ দু রাকাআত সালাত পড়ার পূর্বে বসা নিষেধ করা হয়েছে। যেমন
আবূ কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ المَسْجِدَ فَلاَ يَجْلِسْ حَتَّى يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ
“যখন তোমাদের কেউ মসজিদ প্রবেশ করবে, তখন সে যেন দু’ রাকআত নামায না পড়া পর্যন্ত না বসে।”(বুখারী ৪৪৪, ১১৬৩, মুসলিম ১৬৮৭-১৬৮৮)
সম্মানিত পাঠক, আমরা দেখলাম, এ মর্মে বর্ণিত হাদিসগুলো খুবই ষ্পষ্ট। সুতরাং হাদিস জানার পরে কোন ব্যক্তির জন্য তা অমান্য করা বৈধ হতে পারে না। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّـهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّـهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর-যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক।” (সূরা নিসা: ৫৯)
কোন মাযহাবের ইমাম যদি খুতবা চলাকালীন সময় দু রাকআত সালাত পড়ার ব্যাপারে নিষেধ করে থাকেন তাহলে আমরা বলব, হয়ত তাঁর কাছে এ বিষয়ে হাদিস পৌঁছেনি। সুতরাং তিনি এ ক্ষেত্রে মাযুর বা নির্দোষ। কিন্তু তার অনুসারীদের কারো নিকট হাদিস পৌঁছার পর বিভিন্ন যুক্তি, অপব্যাখ্যা বা নানা ওজুহাতে হাদিস অমান্য করা বড় গুনাহের কাজ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুন্নাহ অনুসারে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
🔸🔹🔸🔹🔸🔹🔸
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব
-------------------
প্রশ্ন: জুমার দিন জুমার সালাত আদায়ের আগে ওয়াজ-নসিহত করার বিধান কি?
■■■■■■🔹🔸🔹■■■■■■
উত্তর: জুমার দিন জুমার নামাজের আগে ওয়াজ-নসিহত বা দরস প্রদান করা উচিৎ নয়। কারণ প্রখ্যাত সাহাবী আমর ইবনে শুয়াইব তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন,
ﻧَﻬَﻰ ﻋﻦِ ﺍﻟﺘَّﺤﻠُّﻖِ ﻳﻮﻡَ ﺍﻟﺠﻤﻌﺔِ ﻗﺒﻞَ ﺍﻟﺼَّﻼﺓِ
(রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমার সালাতের আগে (ওয়াজ-নসিহতের) বৈঠক (সভা/হালাকা ইত্যাদি) করতে নিষেধ করেছেন।”
(তিরমিযী, অধ্যায়: সালাত হা/ ৩৩২, নাসাঈ,অধ্যায়: মসজিদ হা/৭১৪, আবু দাউদ,অধ্যায়: সালাত হা/১০৭৯, হাদিসটি হাসান, সুয়ূতী ও আলবানী রহ.)
কারণ,এটি জুমার সালাতের জন্য উপস্থিত মুসল্লিদেরকে জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, নফল সালাত, কাতার বদ্ধ হয়ে বসা এবং যে খুতবা শুনার জন্য মহান আল্লাহ তার রাসূলের মাধ্যমে আমাদেরকে আদেশ করেছেন সেই খুতবা শোনার জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণে অমনোযোগী করে তোলে।
খুতবার আগে যদি নিয়মিতভাবে এবং অধিক পরিমাণে ওয়াজ-নসিহত করা হয় তবে মানুষের অন্তরে জুমার খুতবার মর্যাদা এবং প্রভাব কমে যায়। সুতরাং এটা করা হলে আল্লাহ তায়ালা যে উদ্দেশ্যে এই খুতবার ব্যবস্থা করেছেন সে উদ্দেশ্য পরিপন্থী কাজ হবে।
তাছাড়া জুমার সালাতের জন্য নির্বাচিত ব্যক্তি (ইমাম বা খতীব সাহেব)যদি খুতবার মধ্যে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়াজ-নসিহত পেশ করার প্রতি যত্নবান হন তবে খুতবার আগে অন্য কোন ওয়াজ-নসিহতের প্রয়োজন থাকে না।
তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার খুলাফায়ে রাশেদা বা সুপথ প্রাপ্ত খলিফাগণ এমনটি করতেন না। অথচ প্রকৃত কল্যাণ নিহিত রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর খুলাফায়ে রাশেদার আদর্শের অনুসরণেই মধ্যেই।
অবশ্য যদি বিশেষ কোন প্রয়োজন দেখা যায় অথবা তা যদি জুমার সালাত বা খুতবা সংশ্লিষ্ট হয় তবে এতে কোন অসুবিধা নাই।তবে সতর্ক থাকতে হবে যে, এটা যেন প্রতিনিয়ত এবং নিয়মিত না করা হয়।তাহলে এ ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ কোন সমস্যা নাই।আল্লাহই তাওফিক দানকারী।
ﻭﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻰ ﻧﺒﻴﻨﺎ ﻣﺤﻤﺪ ﻭﺁﻟﻪ ﻭﺻﺤﺒﻪ ﻭﺳﻠﻢ
■■■■■■🔹🔸🔹■■■■■■
ফতোয়া প্রদানকারী:
প্রধান: আবদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ বিন বাজ
উপ-প্রধান: আবুর রাযযাক আফীফী
সদস্য: আবদুল্লাহ বিন হাসান বিন কুঊদ।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব।
উৎস: ফতোয়া এবং গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি, সউদী আরব
------------------
শুক্রবারে কেবল সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করলেই যথেষ্ট না কি তরজমা ও তাফসীর সহ পাঠ করতে হবে?
▬▬▬➰▬▬▬
প্রশ্ন: শুক্রবারে যে সুরা কাহাফ পরার ফজিলত হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে তা কি শুধু তিলাওয়াত করলেই হবে নাকি অনুবাদ সহ পরতে হবে? অনেকে বলে যে এটার তাফসির সহ পরে বুঝতে হবে এবং আমল করতে হবে তাহলেই এই ফজিলত পাওয়া যাবে। এ কথা কি ঠিক?
উত্তর:
হাদিসে যেহেতু কেবল সুরা কাহাফ পাঠ করার কথা বলা হয়েছে তাই তা পাঠ করলেই উক্ত সওয়াব পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ- চাই তার অর্থ বুঝে পাঠ করা হোক অথবা না বুঝে পাঠ করা হোক।
আসলে কুরআন এমন একটি গ্রন্থ আল্লাহ তাআলা তা পাঠ করার মাধ্যমেই সওয়াব দান করে থাকেন। অর্থ বুঝে পড়লে যেমন সওয়ার রয়েছে না বুঝে পড়লেও সওয়াব পাওয়া যাবে।
তবে তিলাওয়াতের পাশাপাশি তার তরজমা ও তাফসীর জানার চেষ্টা করা এবং সেগুলো নিয়ে গবেষণা করা উচিৎ। এটি সমগ্র কুরআনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর মুসলিম হিসেবে অবশ্যই আমাদের জন্য কুরআনে রঙ্গে জীবন রাঙ্গাতে হবে। এটি কুরআনের প্রতি আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬➰▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
fb/AbdullaahilHadi
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব
-----------------------
জুমার দিন খুতবা এবং সালাত কি একই ব্যক্তির মাধ্যমে হওয়া আবশ্যক?
▬▬▬🌐🌀🌐▬▬▬
প্রশ্ন: জুমার দিন যে খতিব সাহেব খুতবা দিবেন তাকেই কি জুমার নামায পড়াতে হবে? একজন খুতবা দিয়ে অন্যজন নামায পড়ালে তা কি সহিহ হবে? আশা করি, এ বিষয়ে দলিল সহ বিশ্লেষণ মূলক জবাব দিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর:
জুমার দিন একজন খুতবা দিবে আর অন্যজন নামায পড়াবে –এটি সঠিক কি না এ বিষয়ে বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে।
তবে সঠিক কথা হল, এমন কোন শর্ত নাই যে, যে খুতবা দিবে তাকেই নামায পড়াতে হবে। অর্থাৎ যদি একজন খুতবা দেয় আর কোন সমস্যার কারণে অন্যজন নামায পড়ায় তাহলে তা সালাতের বিশুদ্ধতায় কোনই প্রভাব ফেলবে না। কেননা, খুতবা একটি ইবাদত আর নামায আরেকটি পৃথক ইবাদত। সুতরাং দুটি ভিন্ন ভিন্ন ইবাদত দুজনে বাস্তবায়ন করলে তা নাজায়েয হওয়ার কোন কারণ নেই।
বরং একই নামাযের মধ্যেই ইমাম সাহেবের বিশেষ কোন সমস্যার কারণে নামায চলাকালীন আরেকজনকে ইমামতির দায়িত্ব দিতে পারে। এতে যেমন নামায সহিহ হয় অনুরূপভাবে খুতবা আর সালাত আলাদা আলাদা ইবাদতে দুজন দায়িত্ব পালন করলে আরও যৌক্তিকভাবে তা সহিহ হবে ইনশাআল্লাহ।
তবে আমরা বলব, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া এমনটি করা ঠিক নয়। কোন ওজর-আপত্তি দেখা দিলেই কেবল এমনটি গ্রহণযোগ্য; অন্যথায় নয়। কেননা, আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাব যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে যিনি খুতবা দিতেন তিনিই নামায পড়াতেন। ইচ্ছাকৃতভাবে তারা কেউই এর ব্যতিক্রম করেন নি। সুতরাং এটাই সাধারণ সুন্নতি নিয়ম ও সর্বোত্তম-এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে তখন খুতবা ও নামাযে ব্যক্তির পরিবর্তন বৈধ হবে ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখ্য যে, জুমার অনুরূপ দুই ইদের খুতবার ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে ইনশাআল্লাহ।
(উৎস: সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আব্দুল্লাহ বিন বায রহ. এবং islamqa.info এর ফতোয়া অবলম্বনে লিখিত)
আল্লাহু আলাম।
➖➖➖➖➖
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
fb/AbdullaahilHadi
(লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব
------------------------
প্রশ্ন: জুমআর আগে ও পরে কত রাকআত সুন্নত নামায (কাবলাল জুমা ও বাদাল জুমা) পড়তে হয়?
------------------
উত্তর
🔸 জুমার নামায দুই রাকাআত ফরয। এর আগে দু রাকআত, দু রাকআত করে যত খুশি পড়া যায়। কাবলাল জুমা (জুমার আগে) চার রাকআত সুন্নত পড়তেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
🔸 যদি কেউ আগে ভাগে মসজিদে আসে তাহলে প্রথমে দু রাকআত তাহিয়াতুল মসজিদ পড়বে তারপর সাধ্যানুযায়ী দু রাকআত দু রাকাআত করে সুন্নত পড়তে থাকবে আল্লাহ যতটকু তওফিক দান করেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ ، وَتَطَهَّرَ بِمَا اسْتَطَاعَ مِنْ طُهْرٍ ، ثُمَّ ادَّهَنَ أَوْ مَسَّ مِنْ طِيبٍ ، ثُمَّ رَاحَ فَلَمْ يُفَرِّقْ بَيْنَ اثْنَيْنِ ، فَصَلَّى مَا كُتِبَ لَهُ ، ثُمَّ إِذَا خَرَجَ الْإِمَامُ أَنْصَتَ ، غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجُمُعَةِ الْأُخْرَى
“যে ব্যক্তি জুমআর দিন যথা নিয়মে গোসল করে, দাঁত পরিষ্কার করে, খোশবূ থাকলে তা ব্যবহার করে, তার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরে, অতঃপর (মসজিদে) যায়, নামাযীদের ঘাড় ডিঙিয়ে (কাতার চিরে) আগে যায় না, অতঃপর আল্লাহ যতটুকু চান ততটুকু নামায পড়ে। তারপর ইমাম উপস্থিত হলে নীরব ও নিশ্চুপ থাকে এবং নামায শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন কথা বলে না, সে ব্যক্তির এ কাজ এই জুমুআহ থেকে অপর জুমআর মধ্যবর্তীকালে কৃত পাপের কাফফারা হয়ে যায়।” (আহমাদ, মুসনাদ, ইবনে মাজাহ্, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, জামে ৬০৬৬নং)
ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন,
وَهَذَا هُوَ الْمَأْثُورُ عَنْ الصَّحَابَةِ ، كَانُوا إذَا أَتَوْا الْمَسْجِدَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ يُصَلُّونَ مِنْ حِينِ يَدْخُلُونَ مَا تَيَسَّرَ ، فَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي عَشْرَ رَكَعَاتٍ ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي ثَمَانِ رَكَعَاتٍ ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي أَقَلَّ مِنْ ذَلِكَ ".
انتهى من "مجموع الفتاوى" (24/ 189) .
সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা জুমার দিন যখন মসজিদে যেতেন তখন মসজিদে প্রবেশের পর যথাসাধ্য সালাত পড়তেন। কেউ পড়তেন দশ রাকআত, কেউ পড়তেন বারো রাকআত, কেউ পড়তেন আট রাকআত আর কেউ পড়তেন তার চেয়ে কম।” (মাজমুউুল ফাতাওয়া ২৪/১৮৯)
🔸 ইমাম খুতবা দেয়া অবস্থায় কেউ যদি মসজিদে আসে তাহলে কেবল দু রাকআত দুখুলুল মসজিদ/তাহিয়াতুল মসজিদ পড়বে। তারপর মনোযোগ সহকারে খুতবা শুনবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إذا جاء أحدكم والإمام يخطب - أو قد خرج - فليصلِّ ركعتين -متفق عليه
“তোমাদের কেউ যখন ইমাম সাহেব খুতবা দেয়ার সময় জুমার সালাতে উপস্থিত হয়, তখন সে সংক্ষেপে দু রাকাত সালাত আদায় করে নেয়।” (সহীহ বুখারী, নফল নামায অধ্যায় ও মুসলিম, জুমার নামায অধ্যায়)
🔸 জুমআর নামাযের পরে (বাদাল জুমা) কেউ যদি মসজিদেই সুন্নাত পড়তে চায় তাহলে চার রাকআত পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে।
عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ الْجُمُعَةَ فَلْيُصَلِّ بَعْدَهَا أَرْبَعًا رواه مسلم (881)
আর বাড়িতে গিয়ে পড়লে দুই রাকআত পড়ার কথা এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমআর নামাযের পরে বাড়িতে গিয়ে দুই রাকআত সুন্নাত পড়তেন।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رضي الله عنهما أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم : كَانَ لاَ يُصَلِّى بَعْدَ الْجُمُعَةِ حَتَّى يَنْصَرِفَ ، فَيُصَلِّى رَكْعَتَيْنِ رواه البخاري (937) ، ومسلم (882) .
(বুখারী ও মুসলিম
মোটকথা, উপরোক্ত হাদিস সমূহের আলোাকে কেউ যদি জুমার পরে মসজিদে সুন্নত পড়তে চায় তাহলে চার রাকআত পড়বে আর বাড়িতে গিয়ে পড়তে চাইলে দু রাকআত পড়বে। এটাই সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটির অভিমত।
আল্লাহু আলাম
✒✒✒✒
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব
-----------------
জুমুআ’হ, বিবাহ বা অন্য যেকোন সময়ে খুতবার শুরু কিভাবে?
নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ হচ্ছে জুমুআ’হ, বিবাহ বা অন্য যেকোন প্রয়োজনে খুতবার শুরুতেঃ
(১) সবার প্রথমে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করতেন।
(২) অতঃপর তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।
(৩) এরপর তাশাহুদ পাঠ করে আল্লাহর তাওহীদের বাণী এবং নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্য দিতেন।
(৪) এরপর তিনি তাঁর শ্রোতাদেরকে “তাক্বওয়া” অবলম্বনের উপদেশ দেওয়ার জন্য ক্বুরআনের তিনটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনাতেন।
(৫) অতঃপর “আম্মা বাঅ’দু” (পর সমাচার বা অতঃপর) বলে তিনি তাঁর মূল বক্তব্য উপস্থাপন করতেন।
নিম্নে নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যেই বাক্য ও আয়াত দ্বারা খুতবাহ শুরু করতেন তার মূল আরবী পাঠ ও বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো।
إنَّ الْحَمْدَ لِلهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلاَ مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلاَ هَادِىَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
উচ্চারণঃ ইন্নাল হা’মদা লিল্লা-হ। নাহ’মাদুহু অনাস্তাঈ’নুহু অনাস্তাগফিরুহু, অনাউ’যু বিল্লা-হি মিং শুরুরি আংফুসিনা ওয়া সাইয়্যিআতি আ’মা-লিনা। মাইয়্যাহদিহিল্লা-হু ফালা মুদ্বিল্লা লাহ, ওয়ামাই দ্বলিল ফালা হা-দিয়া লাহ। ওয়া আশহাদু আল-লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ’দাহু লা শারীকা লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহা’ম্মাদান আ’বদুহু ওয়া রাসুলুহ।
অর্থঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তার নিকট সাহায্য চাই এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহর নিকট আমরা আমাদের আত্মা এবং আমাদের মন্দ কর্মের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহ যাকে পথ দেখান তাকে ভ্ৰষ্টকারী কেউ নেই এবং তিনি যাকে ভ্রষ্ট করেন তাকে পথপ্রদর্শনকারী কেউ নেই। আমি সাক্ষি দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মাবুদ নেই। তিনি একক, তার কোন অংশীদার নেই। আর আরো সাক্ষি দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাস ও রসুল।
এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুরা নিসার ১-নং আয়াত, সুরা আলে-ইমরানের ১০২-নং আয়াত, এবং সুরা আহযাবের ৭০-৭১নং আয়াত তিলাওয়াত করতেন।
(১)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ}
অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং মুসলমান (আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে অবশ্যই মৃত্যুবরণ করো না। সুরা আলে-ইমরানঃ ১০২।
(২)
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا}
অর্থঃ হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন এবং এই দুইজন থেকে বহু নর-নারী (পৃথিবীতে) বিস্তার করেছেন। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাঞ্চা কর। আর ভয় কর জ্ঞাতি-বন্ধন ছিন্ন করাকে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন। সুরা আন-নিসাঃ ১।
(৩)
{يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَقُولُوا قَوْلاً سَدِيدًا * يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا}
অর্থঃ হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তাহলে তিনি তোমাদের কর্মসমূহকে ত্রুটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। যে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করবে সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে।” সুরা আল-আহযাবঃ ৭০-৭১।
উৎসঃ সুনানে আবু দাউদঃ ২১১৮, সুনানে আত-তিরমিযীঃ ১১০৫।
আপনারা যেকোন ভালো আলেম বা বক্তার ওয়াজ শুনলে দেখবেন, নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করে যেকোন ওয়াজ বা বক্তৃতার পূর্বে সবাই প্রথমে আরবীতে এইগুলো পাঠ করে তারপর নিজ ভাষায় আলোচনা শুরু করেন।
খুতবা, বক্তৃতা বা ভাষণের মধ্যে তাশাহুদ না পড়া ক্ষতিকরঃ
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আ’নহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যেসব খুতবায় (বক্তৃতায়) তাশাহহুদ পাঠ করা হয় না, তা কাটা হাতের সমতুল্য।” সুনানে তিরমিযীঃ ১১০৬। এই হাদীসটিকে আবু ঈসা “হাসান গারীব” বলেছেন। শায়খ আলবানী রহি’মাহুল্লাহ সহীহ বলেছেন।
আপনারাও হাদীসের এই বাক্য এবং আয়াতগুলো মুখস্থ রাখতে পারেন, যেকোন ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়ার পূর্বে সুন্নত হিসেবে পাঠ করার জন্য।
---------------------
প্রশ্ন: ‘জুমা মোবারক’ বলার বিধান কি? মোবারক শব্দের অর্থ কি?
উত্তর: মোবারক শব্দের অর্থ: বরকতময়, কল্যাণময়, শুভ। ‘জুমা মোবারক’ অর্থ: শুভ জুমা দিবস। যারা এটি বলে তাদের উদ্দেশ্য এ দিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করা।
এখন দেখি, ইসলামের দৃষ্টিতে জুমার দিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করা কতটুকু শরীয়ত সম্মত?
আমাদের অজানা নয় যে, জুমার দিন মুসলিমদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন। কেননা এ মর্মে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
هَذَا يَوْمُ عِيدٍ جَعَلَهُ اللهُ لِلْمُسْلِمِينَ ، فَمَنْ جَاءَ إِلَى الْجُمُعَةِ فَلْيَغْتَسِلْ ، وَإِنْ كَانَ طِيبٌ فَلْيَمَسَّ مِنْهُ ، وَعَلَيْكُمْ بِالسِّوَاكِ
‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য জুমার দিনকে ঈদের দিন হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। সুতরাং জুমায় শরিক হওয়ার পূর্বে গোসল করে নেবে। আর সুগন্ধি থাকলে, ব্যবহার করবে। আর অবশ্যই মিসওয়াক করবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: হা/ ১০৯৮, শাইখ আলবানী এটিকে হাসান বলেছেন- সহিহ ইবনে মাজাহ)।
তাহলে মুসলিমদের জন্য মোট ঈদ তিন দিন। বাৎসরিক ঈদ হলো, ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) এবং ঈদুল ফিতর (রমাজানের ঈদ)। আর সাপ্তাহিক ঈদ হলো, জুমার দিন।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ঈদুল ফিতর ও আজহার শেষে সাহাবিরা একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে এ বলে, শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন: ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ ‘আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের পক্ষ থেকে (নেক আমল) কবুল করুন।’ তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা সাহাবিরা জুমার দিন উপলক্ষে কোনো ধরণের শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।
আর এ কথা অজানা নয়, দ্বীনের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবিদের আদর্শের বাইরে নতুন কিছু প্রচলন করা বা আমল করার নামই বিদাত। আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَة
‘তোমরা দ্বীনের মাঝে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে, কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদাত। আর প্রতিটি বিদাতের পরিণাম গোমরাহি বা ভ্রষ্টতা।’ (সহিহ বুখারী, হা:৭২৭৭, অধ্যায়: কোরআন ও সুন্নাহকে শক্তভাবে ধরে থাকা)।
তিনি (সা.) আরো বলেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ
‘যে ব্যক্তি দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন নতুন জিনিষ চালু করল তা পরিত্যাজ্য। (বুখারী, অধ্যায়: সন্ধি-চুক্তি)।
আর সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে,
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ
‘যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার ব্যাপারে আমার নির্দেশ নাই তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: বিচার-ফয়সালা)।
কিছু মানুষকে দেখা যায়, জুমার দিন এলে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ব্লগ ইত্যাদিতে ‘জুমা মোবারক’ বলে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে পোস্ট দেয়! কেউ বা সামনা-সামনি দেখা হলে ‘জুমা মোবারক’ বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করে! এগুলো থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবিদের আদর্শের মধ্যেই আমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এর বাইরে কোনো কল্যাণ আশা করা যায় না।
আল্লাহ আমাদেরকে বিদাত থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী (দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব)।
--------------------
প্রশ্ন: জুমার খুতবার আগে সুন্নতের জন্য আলাদা সময় দেয়ার কোনও হাদিস আছে কি?
উত্তর:
সুন্নত হল, একজন মানুষ জুমার দিন জুমার সালাতের উদ্দেশ্যে যখন মসজিদে যাবে তখন খতিব সাহেব খুতবা শুরুর আগ পর্যন্ত দু রাকআত দু রাকআত করে যথাসাধ্য নফল সালাত আদায় করবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ ، وَتَطَهَّرَ بِمَا اسْتَطَاعَ مِنْ طُهْرٍ ، ثُمَّ ادَّهَنَ أَوْ مَسَّ مِنْ طِيبٍ ، ثُمَّ رَاحَ فَلَمْ يُفَرِّقْ بَيْنَ اثْنَيْنِ ، فَصَلَّى مَا كُتِبَ لَهُ ، ثُمَّ إِذَا خَرَجَ الْإِمَامُ أَنْصَتَ ، غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجُمُعَةِ الْأُخْرَى
“যে ব্যক্তি জুমআর দিন যথা নিয়মে গোসল করে, দাঁত পরিষ্কার করে, খোশবূ থাকলে তা ব্যবহার করে, তার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরে, অতঃপর (মসজিদে) যায়, নামাযীদের ঘাড় ডিঙিয়ে (কাতার চিরে) আগে যায় না, অতঃপর আল্লাহ যতটুকু চান ততটুকু নামায পড়ে। তারপর ইমাম উপস্থিত হলে নীরব ও নিশ্চুপ থাকে এবং নামায শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন কথা বলে না, সে ব্যক্তির এ কাজ এই জুমুআহ থেকে অপর জুমআর মধ্যবর্তীকালে কৃত পাপের কাফফারা হয়ে যায়।” (আহমাদ, মুসনাদ, ইবনে মাজাহ্, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, জামে ৬০৬৬নং)
ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন,
وَهَذَا هُوَ الْمَأْثُورُ عَنْ الصَّحَابَةِ ، كَانُوا إذَا أَتَوْا الْمَسْجِدَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ يُصَلُّونَ مِنْ حِينِ يَدْخُلُونَ مَا تَيَسَّرَ ، فَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي عَشْرَ رَكَعَاتٍ ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي ثَمَانِ رَكَعَاتٍ ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي أَقَلَّ مِنْ ذَلِكَ ".
انتهى من "مجموع الفتاوى" (24/ 189) .
"সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা জুমার দিন যখন মসজিদে যেতেন তখন মসজিদে প্রবেশের পর যথাসাধ্য সালাত পড়তেন। কেউ পড়তেন দশ রাকআত, কেউ পড়তেন বারো রাকআত, কেউ পড়তেন আট রাকআত আর কেউ পড়তেন তার চেয়ে কম।” (মাজমুউুল ফাতাওয়া ২৪/১৮৯)
কিন্তু মসজিদে প্রবেশ করার পর দু রাকআত সালাত না পড়ে বসে যাওয়া, বয়ান নামক বিদআতি বক্তৃতা দেয়া এবং এ সময় কেউ সালাত পড়তে চাইলে নিষেধ করা সব শরিয়া বর্হির্ভূত কাজ। আল্লাহু আলাম
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব
■■ জেনে নিনঃ জুমু‘আর দিনের বর্জনীয় কাজ!!
************************************************
■■ ----------- জুমু‘আর দিনে যা বর্জনীয় --------- ■■
■■ ০১] ঘুমের ভাব বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হওয়া উচিত নয় । তন্দ্রা ভাব হলে জায়গা পরিবর্তন করে বসা উচিত ।(সহিহঃ আবু দাউদঃ ১১১৯)
■■ ০২] খুৎবার সময় কেউ কথা বললে চুপ করুন’ এটুকুও বলা যাবে না ।
(নাসায়ীঃ ৭১৪, সহিহ বুখারীঃ ৯৩৪)
■■ ০৩] ভাগ ভাগ হয়ে, গোল গোল হয়ে বসা উচিত নয়, যদিও এটা কোন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান হোক না কেন। (সহিহ হাদিসঃ আবু দাউদঃ ১০৮৯)
■■ ০৪] মুসুল্লীদের ফাঁক করে মসজিদে সামনের দিকে এগিয়ে না যাওয়া।
(বুখারীঃ৯১০, ৮৮৩)
■■ ০৫] মুসুল্লীদের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনের কাতারে আগানোর চেষ্টা না করা।
(আবু দাউদঃ ৩৪৩, ৩৪৭)
■■ ০৬] কাউকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে বসার চেষ্টা না করা। (বুখারীঃ৯১১, মুসলিমঃ২১৭৭, ২১৭৮)
■■ ০৭] ইমামের খুৎবা দেওয়া অবস্থায় দুই হাঁটু উঠিয়ে না বসা।
(আবু দাউদঃ ১১১০, ইবনে মাজাহঃ ১১৩৪)
■■ ৮] সালাতের জন্য কোন একটা জায়গাকে নির্দিষ্ট করে না রাখা, যেখানে যখন জায়গা পাওয়া যায় সেখানেই সালাত আদায় করা। (আবু দাউদঃ৮৬২)।
▪▪অর্থাৎ আগে থেকেই নামাজের বিছানা বিছিয়ে জায়গা দখল করে না রাখা বরং যে আগে আসবে সেই আগে বসবে।
■■ ০৯] মসজিদে যাওয়ার আগে কাঁচা পেয়াজ, রসুন না খাওয়া ও ধুমপান না করা। (বুখারীঃ ৮৫৩)
▪▪কেননা, এতে মুসল্লি ও মালাইকাদের কষ্ট হয়।
●● যারা ধূমপান করেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছিঃ আজ থেকে ধূমপান ছাড়ার পরিকল্পনা করুন। এটি মাখরুহ নয়, তামাক জাতিয় সকল পণ্য পান করা হারাম ।
■■ ১০] কোন নামাজীর সামনে দিয়ে না হাঁটা অর্থাৎ
মুসুল্লী ও সুতরার মধ্যবর্তী জায়গা দিয়ে না হাঁটা। (বুখারীঃ৫১০)
■■ ১১] এতটুকু জোরে আওয়াজ করে কোন কিছু না পড়া, যাতে অন্যের সালাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে। (আবু দাউদঃ ১৩৩২)
*** আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং পরিপূর্ণ ভাবে সঠিক পথে চলার তাওফীক দিন এবং আমাদের সবাইকে ক্ষমা, কবুল ও হিফাযত করুন(আমীন)।।
#শেয়ার_করুন
©সিরাতল মুস্তাকিম

No comments:
Post a Comment