'আসহাবে কাহাফ’ বা গুহাবাসী যুবকদের আশ্চর্যজনক ঘটনা
‘কাহাফ’ বলা হয় পাহাড়ের গর্ত বা গুহাকে। অনেক দিন পূর্বে কয়েকজন যুবক ছিলো, যারা নিজেদের ‘ঈমান’ রক্ষা করার জন্যে একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদেরকে ‘আসহাবে কাহাফ’ বা গুহাবাসী যুবক বলা হয়। সুরা কাহাফের শুরুর দিকে তাদের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, এবং এই ঘটনা থেকেই সুরাটির নামকরণ করা হয়েছে সুরা আল-কাহাফ।
সাইয়্যিদিনা ঈসা ইবনে মারইয়াম আ’লাইহিস সালামকে বনী ইসরাঈলীদের নিকটা রাসুল হিসেবে পাঠানোর অনেক পূর্বে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ‘দাকিয়ানুস’ নামে একজন উদ্ধত, কঠোর প্রকৃতির, অত্যাচারী মুশরিক বাদশাহ ছিলো। সে তার জাতির লোকদেরকে শিরক শিক্ষা দিতো এবং সকলকে ‘মূর্তিপূজা’ করতে বাধ্য করতো। এ উপলক্ষ্যে দাকিয়ানুস প্রতিবছর একটা মেলা বা উৎসবের আয়োজন করতো, যেখানে সবাই মূর্তিপূজা করতো এবং তাদের দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করতো। এক বছর এমনই এক মেলায় কয়েকজন যুবক শরীক হয়েছিলো, যারা তাদের জাতির লোকদের মূর্তিপূজা এবং জাহেলিয়াতের তামাশা দেখে তাদের মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে, মূর্তিপূজা নিছক বাজে একটি কাজ। মহান আল্লাহ এই যুবকদেরকে সঠিক পথ দেখানোর ইচ্ছা করেন এবং তাদের অন্তরে এই কথাগুলো প্রক্ষিপ্ত করলেনঃ ইবাদত বা উপাসনার একমাত্র যোগ্য সত্ত্বাতো সেই মহান আল্লাহ, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি সারা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক। যুবকেরা মূর্তিপূজাকে ঘৃণা করে সেই মেলা থেকে সরে পড়ে। এক এক করে তারা কয়েকজন একটি গাছের নিচে একত্রিত হন এবং একজন আরেকজনকে মেলা থেকে চলে আসার কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন একজন বলেন, আমার জাতির প্রথা, চাল-চলন ও রীতি-নীতি আমার মোটেও ভালো লাগেনা। আসমান, জমীন এবং আমাদের ও আপনাদের সকলের সৃষ্টিকর্তা যখন একমাত্র আল্লাহ, তখন আমরা তাঁকে ছাড়া অন্যের উপাসনা কেনো করবো? তার একথা শুনে দ্বিতীয়জন বললো, আল্লাহর কসম! আমার জাতির লোকদের প্রতি এই ঘৃণাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। অনুরূপভাবে তৃতীয় একজন একই কথা বললেন। যখন সবাই একই কারণ বললেন, তখন সবার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার ঢেউ খেলে গেল। ‘তাওহীদ’ বা একত্ববাদের আলোকে আলোকিত এই যুবকেরা পরস্পর সত্য ও খাঁটি দ্বীনি ভাইয়ে পরিণত হল। তারা লোকালয়ের বাইরে একটা জায়গা নির্দিষ্ট করে নেন, যেখানে তারা একত্রিত হয়ে গোপনে আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং সমস্ত মূর্তিপূজার শিরক থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতেন। আস্তে আস্তে জাতির লোকেরা তাদের কথা জেনে যায় এবং তাদেরকে ধরে ঐ অত্যাচারী বাদশাহর কাছে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে। বাদশাহ দাকিয়ানুস তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে যুবকেরা অত্যন্ত সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে তাওহীদের প্রতি তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের কথা জানিয়ে দেয়। এমনকি তারা স্বয়ং বাদশাহ, তার সভার লোকদের এবং জাতির সকলকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর উপাসনা করার জন্য দাওয়াত দেয়। তারা মন শক্ত করে নেন এবং পরিষ্কারভাবে বলে,
“আমাদের রব্ব তিনিই, যিনি আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা। তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবূদ বানিয়ে নেওয়া আমাদের জন্যে অসম্ভব। আমাদের দ্বারা এটা কখনো হতে পারেনা যে, আমরা তাঁকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে দুয়া করবো বা ডাকবো। কেননা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আহবান করা শিরক। এটা অত্যন্ত বাজে ব্যপার, অনর্থক কাজ ও বক্র পথ বা গোমরাহী। আমার জাতির লোকেরা মুশরিক, তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে দুয়া করে বা অন্যদেরকে আহবান করে তাদের ইবাদতে মগ্ন হয়ে রয়েছে। এর কোন দলিল-প্রমান তারা পেশ করতে পারবেনা, সুতরাং তারা মিথ্যাবাদী ও অত্যাচারী।”
বর্ণিত আছে যে, যুবকদের এই স্পষ্টবাদীতায় বাদশাহ অত্যন্ত রাগান্বিত হয় এবং তাদেরকে শাসন-গর্জন ও ভয় প্রদর্শন করে। সে তাদের পোশাক খুলে নেওয়ার জন্যে আদেশ দেয় এবং তাদেরকে তাদের বক্তব্য প্রত্যাহার করার জন্যে সুযোগ দেয়। বাদশাহ মনে করেছিলো যে, তারা হয়তো ভয় পেয়ে পুনরায় মূর্তিপূজার ধর্মে ফিরে আসবে। আসলে এটা ছিলো আল্লাহ সুবহা’নাহু তাআ’লার পক্ষ থেকে বাদশাহর অবচেতন মনে তাদেরকে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য একটা সুযোগ দান। যুবকেরা যখন বুঝতে পারলো যে, সেখানে থেকে তারা দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে না, তখন তারা তাদের জাতি, দেশ ও আত্মীয় স্বজন ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যে দৃঢ় সংকল্প করেন। যখন এই যুবকেরা দ্বীন রক্ষা করার জন্যে এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে উদ্যত হন, তখন তাদের উপর আলাহর রহমত বর্ষিত হয়। আল্লাহ বলেন, “ঠিক আছে, তোমরা যখন তাদের দ্বীন থেকে পৃথক হয়ে গেছে তাহলে তাদের দেহ থেকেও পৃথক হয়ে পড়। তোমরা যাও, আর কোন পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করো। তোমাদের উপর তোমাদের রব্বের করুণা বর্ষিত হবে। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের শত্রুদের দৃষ্টি থেকে আড়ালে রাখবেন, তোমাদের কাজ সহজ করে দেবেন এবং তোমাদের শান্তির ব্যবস্থা করে দিবেন।” সুরা কাহাফ।
সুতরাং ঐ যুবকেরা সুযোগ বুঝে সেখান থেকে পালিয়ে যায় এবং একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। তাদের প্রতিবেশীরা এবং বাদশাহ লক্ষ্য করলো যে তাদেরকে আর কোথাও দেখা যাচ্ছেনা। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তাদেরকে না পেয়ে তারা ধরে নিলো তারা হয়তোবা হারিয়ে গেছে।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আ’নহুমার মতে, আসহাবে কাহাফের যুবকদের সংখ্যা ছিলো সাত জন, অবশ্য এ ব্যপারে কুরআন ও সহীহ হাদীস থেকে নিশ্চিত কিছু জানা যায়না। তাদের মধ্যে একজনের একটা পোষা কুকুর ছিলো, যে কিনা হিজরতের সময় তাদের পিছু পিছু চলে এসেছিলো। যুবকেরা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেওয়ার পরে তারা সকলেই সেখানে ঘুমিয়ে পড়েন। যুবকেরা এমনভাবে ঘুমাচ্ছিলো যে, তাদের চোখগুলো খোলা আর দেখে মনে হবে যেন তারা জেগেই আছে। আর কুকুরটি গুহার বাইরে দুই পা প্রসারিত করে বসে থেকে তাদেরকে পাহাড়া দিচ্ছিলো। এমন অবস্থায় যে কেউ তাদেরকে দেখলে হিংস্র শিকারীর দল মনে করে তাদের ভয়ে পালিয়ে যাবে। তাদের ঘুমের মাঝেই আল্লাহ তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতেন, যাতে করে মাটি তাদেরকে খেয়ে না ফেলে। আর আল্লাহ সকালে সূর্যকে উদয়ের সময় ডানদিকে এবং অস্ত যাওয়ার সময় বাম দিকে হেলে যাওয়ার জন্যে আদেশ দেন। যেন গুহাবাসীরা ঐ সময় পর্যন্ত আরাম ও শান্তিতে ঘুমাতে পারে, যতদিন পর্যন্ত তাদের ঘুমানো আল্লাহ ইচ্ছা করেন। এর মাধ্যমে আল্লাহর হিকমত, তাঁর নিদর্শন ও মহানুভবতা প্রকাশ পায়।
আল্লাহর আশ্চর্য একটি নিদর্শন এই যে, এইভাবে তারা চন্দ্র হিসাব অনুযায়ী ৩০৯ বছর পর্যন্ত একটানা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেন। কিন্তু যখন তারা জেগে উঠে, তখন ঠিক তেমনি ছিলো যেমন তারা ঘুমানোর সময় ছিলো। তাদের দেহ, চুল, চামড়া সবই ঐ আগের অবস্থাতেই ছিলো, যেমন তারা শোয়ার সময় ছিলো। ঘুম থেকে উঠে তারা পরস্পর বলাবলি কতে শুরু করলো, আচ্ছা বলোতো, আমরা কতদিন ঘুমিয়েছিলাম? তাদের কেউ বললো একদিন অথবা একদিনের কম সময়। কেননা তারা সকাল বেলা ঘুমিয়েছিলো আর যখন জেগে উঠে তখন ছিলো সন্ধ্যাবেলা। এজন্যেই তাদের মনে এমন ধারণা হয়েছিলো। যদিও তাদের নিজেদের মন বলছিলো, এতো কম সময় হতে পারেনা।
যাই হোক, তারা বুঝতে পারলো আসলে তারা কতদিন ঘুমিয়েছিলো সেটা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। সেইজন্যে তারা আর কথা না বাড়িয়ে তাদের কাছে কিছু দিরহাম ছিলো, সেইগুলো দিয়ে নিজের পরিচয় গোপন রেখে একজনকে কিছু পবিত্র খাবার কিনে আনতে শহরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলো। তারা ভয় পাচ্ছিলো যে, তাদের জাতির লোকেরা তাদের কথা জেনে গেলে পুনরায় তাদেরকে জোর করে শিরকের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে, অথবা তাদেরকে হত্যা করে ফেলবে।
বর্ণিত আছে যে, তারা তাদের মধ্য থেকে একজনকে ছদ্মবেশে এবং ভিন্ন একটা পথে শহরে পাঠায় কিছু খাবার কিনে আনার জন্যে। ঐ গুহাবাসী লোকটি দেখেন যে, শহরের কোন জিনিসই আগের মতো নেই, আর শহরের সব লোক তার অপরিচিত। তাকে কেউ চিনতে পারছেনা, তিনিও কাউকে চিনতে পারছেন না। তিনি খুব পেরেশানি বোধ করলেন এবং তার মাথা ঘুরে গেলো। কারণ তিনি ভাবছিলেন, এইতো কাল সন্ধ্যায় আমি এই শহর ছেড়ে গেলাম আর আজকে হঠাত কি হলো? গুহাবাসী লোকেরা এটা কল্পনাও করতে পারে নি যে, তাদের ঘুমের মাঝে শত শত বছর পার হয়ে যেতে পারে! তিনি ভাবলেন, তিনি হয়তোবা পাগলই হয়ে গেছেন, অথবা তাকে কোন রোগে ধরেছে, অথবা তিনি স্বপ্ন দেখছেন। একারণে তিনি ভাবলেন তার এই শহর ছেড়ে তাড়াতাড়ি চলে যাওয়াই ভালো। অতঃপর তিনি একটি দোকানে গিয়ে কিছু মুদ্রা দেন ও এর বিনিময়ে খাবার চান। দোকানদার ঐ মুদ্রা দেখে কঠিন বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং তার প্রতিবেশী অন্য দোকানদারকে সেইগুলো দেখতে দেন। এইভাবে তারা সকলেই অনেক পুরোনো এই মুদ্রাগুলো দেখে আশ্চার্যান্বিত হন এবং গুহাবাসী লোকটি এনিয়ে সবার তামাশার পাত্রে পরিণত হন। সবাই ভাবতে থাকে, লোকটি হয়তো পুরনো দিনের কোন গুপ্তধন পেয়েছে। সুতরাং, তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, সে কোথাকার, এই মুদ্রা সে কোথায় পেলো? তখন সে বললো, ভাই আমিতো এই শহরের লোক, গতকাল সন্ধ্যায় আমি এই শহর থেকে গেছি। এখানকার বাদশাহ হচ্ছে দাকিয়ানুস। তার একথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে ফেললো এবং বললো, এ তো এক পাগল লোক! অবশেষে তাকে তখনকার যুগের বাদশাহর কাছে নেওয়া হলো। বাদশাহ তাকে আসল ঘটনা জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে সব খুলে বললেন। সব শুনে বাদশাহ এবং সমস্ত জনতা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। অবশেষ সমস্ত লোক তার সংগী হয়ে বললো, আচ্ছা আমাদেরকে তোমার গুহাবাসী বাকি সংগীদের কাছে নিয়ে চলো এবং তোমাদের গুহাটি দেখিয়ে দাও। গুহাবাসী লোকটি তাদেরকে সাথে নিয়ে চললেন। গুহার কাছে পৌঁছে তিনি তাদেরকে বললেন, আপনারা বাইরে অপেক্ষা করুন, আমি আমার সংগীদের খবর দিয়ে আসি। গুহাবাসী লোকটি জনতা থেকে পৃথক হওয়া মাত্রই আল্লাহ তাদের ও গুহাবাসীর মাঝে একটি ‘গায়েবী’ বা অদৃশ্য পর্দা নিক্ষেপ করলেন। লোকেরা আর জানতেই পারলোনা যে, তিনি কোথায় গেলেন।
এভাবে আল্লাহ তাআ’লা আসহাবে কাহাফের রহস্য মানুষের কাছ থেকে গোপন করলেন। অতঃপর আল্লাহ আসহাবে কাহাফের লোকদের গুহার ভেতরে স্বাভাবিক মৃত্যু দান করেন। গুহাবাসীরা অদৃশ্য হয়ে গেলে লোকদের মাঝে কেউ বললো, সেই গুহার দরজা বন্ধ করে তাদেরকে এইভাবেই ছেড়ে দেওয়া হোক। আবার কেউ বলে, তাদের স্মৃতি রক্ষার জন্যে তাদের উপরে সৌধ নির্মান করা হোক। কিন্তু যারা ক্ষমতাশালী লোক ছিলো তারা তাদের উপরে মসজিদ নির্মান করেছিলো।
উৎস গ্রন্থঃ (১) আল-ক্বুরআনুল কারীম। সুরা আল-কাহাফঃ আয়াত ৯-২৫।
(২) তাফসীর ইবনে কাসীর, (৩) তাফসীর আহসানুল বায়ান এবং (৪) তারিখ আত-তাবারী।
আসহাবে কাহাফ বা গুহাবাসী যুবকদের কাহিনী থেকে কিছু শিক্ষা
(১) “তাওহীদ বা এক আল্লাহর উপাসনা করা এবং শিরককে ঘৃণা করা” - এটা মানুষের ‘ফিতরাত’, বা ‘মৌলিক মানবীয় একটি গুণ’ যা দিয়ে আল্লাহ প্রত্যেকটি মানুষকেই সৃষ্টি করেছেন। যাতে করে তাঁর বান্দারা সহজেই তাঁকে চিনতে পারে এবং তাঁর ইবাদতে আগ্রহী হয়। এই গুণটি ‘আসহাবে কাহাফ’ এর যুবকদের মাঝে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়েছিলো।
(২) তাগুত (আল্লাহদ্রোহী), শিরক এবং মূর্তিপূজার অনুসরণকারী জাতির লোকেরা যুগে যুগে তাওহীদবাদী লোকদের বড় শত্রু এবং সর্বদাই তাদের ক্ষতি করার জন্যে চেষ্টা করে। আসহাবে কাহাফের জাতির লোকেরা তাদেরকে ধরে নিয়ে অত্যাচারী বাদশাহর কাছে পেশ করার মাধ্যমে মুশরেকদের এই খারাপ চরিত্র ফুটে উঠে।
(৩) তাগুত (আল্লাহদ্রোহী), অত্যাচারী মুশরেক বাদশাহ, এই ধরণের নেতারা যারা মানুষকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে পূজা করতে আহবান করে, আল্লাহর দ্বীন থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে, তারা যুগে যুগে ইসলাম এবং মুসলমানদের সবচাইতে বড় শত্রু। তারা শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে মুসলিমদেরকে ঈমান থেকে, ইসলাম থেকে বিচ্যুত করে তাদের বাতিল ধর্মে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। সুতরাং, আমাদেরকে এই ধরণের নেতাদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
(৪) হক্কপন্থী লোকের সংখ্যা সবসময় অল্পই হয়ে থাকে। লোক অল্প হলেও ঈমান ও যেই জ্ঞান আল্লাহ তাদেরকে দান করেন, তার কারণে তারা তাদের পুরো জাতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী এবং আপোষহীন অবস্থান গ্রহণ করে। সাইয়্যিদিনা ইব্রাহীম আ’লাইহিস সালাম একাই তাঁর জাতির বিরুদ্ধে দাওয়াতের জন্যে যথেষ্ঠ ছিলেন। এমনিভাবে আসহাবে কাহাফের মাত্র অল্প কয়েকজন যুবক অত্যাচারী বাদশাহ এবং বিভ্রান্ত গোটা জাতির বিরুদ্ধে তাওহীদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্যে যথেষ্ঠ ছিলো।
(৫) শয়তান যাদেরকে অন্ধ করে দেয় তারা ওয়াহী, আল্লাহর বিধান বা যুক্তি-প্রমান শুনতে বা মানতে প্রস্তুত নয়, কারণ তারা তাদের বাপ-দাদাদের অনুসৃত পথ কিংবা তাদের নেতাদের চাপিয়ে দেওয়া ধর্মের প্রতি অন্ধভাবে অনুগত থাকে। একারণে তাদেরকে দলিল-প্রমান বা যুক্তি উপস্থাপন করলে তারা বধিরের মতো আচরণ করে। বাদশাহর সামনে আসহাবে কাহাফের যুবকেরা এক আল্লাহকে উপাসনা করার অকাট্য যুক্তি তুলে ধরলেও তাদের জাতি সেটাকে প্রত্যাখ্যান করে।
(৬) আসহাবে কাহাফের লোক আসলে কতজন ছিলো, তারা কোথায়, কত সালে বসবাস করতো, এইগুলো জানা আমাদের ঈমান ও আমলের জন্যে জরুরী নয়, সেইজন্য আল্লাহ এর বিস্তারিত বর্ণনা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেন নি, এবং এনিয়ে আহলে কিতাবীদের কাউকে প্রশ্ন করতেও তিনি নিষেধ করে দিয়েছেন। তবে তাদের ঘটনা থেকে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা রয়েছে, একারণে আল্লাহ তাআ’লা আসহাবে কাহাফের ঘটনা সাধারণভাবে আলোচনা করেছেন। এ আলোকে বলা যেতে পারে, আমাদের উচিৎ আমাদের জন্যে যেই জিনিসটা জানা জরুরী, শুধুমাত্র সেই ব্যপারেই প্রশ্ন করা। দ্বীন শিক্ষার্থীদের জন্য জানা জরুরী নয়, এমন অহেতুক প্রশ্ন করার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। এনিয়ে হাদীসেও সতর্কবাণীও উচ্চারিত হয়েছে।
(৭) আসহাবে কাহাফের লোকেরা একটানা ৩০৯ বছর ঘুমিয়ে ছিলেন, এরপর আল্লাহ তাদেরকে জাগ্রত করেন। এটা আল্লাহর ক্ষমতার বিশেষ একটা নিদর্শন। এর দ্বারা কাফের মুশরেকদের এই সন্দেহ দূর করা হয়েছে যে, এমনিভাবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা সমস্ত মানুষকে পুনরায় সমবেত করতে পারবেন। এটা আল্লাহর জন্য খুব সহজ সুতরাং, এনিয়ে সংশয়ের কিছু নেই।
(৮) আসহাবে কাহাফের লোকদের সাথে একটা কুকুর সংগী হয়েছিলো। নেককার মানুষদের সংগী হওয়ার জন্যে একটা সাধারণ কুকুরের কথা কুরআন মাজীদের মতো শ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাবেও উল্লেখ করা হয়েছে। এর দ্বারা প্রমানিত হয় যে, নেককার লোকদের সংস্পর্শ ও তাদের অনুসরণের দ্বারা একজন পাপী লোকও অনেক বড় মর্যাদার অধিকারী হতে পারে। সেইজন্যে আমাদেরকে মুত্তাক্বী লোকদের সাহচর্য ও বন্ধুত্বের জন্যে চেষ্টা করতে হবে। মানুষের জীবনে বড় সংগী হচ্ছে তার স্বামী বা স্ত্রী। সে হিসেবে, বিয়ের জন্যে সৌন্দর্য, সম্পদ, বংশ মর্যাদা, দুনিয়াবী শিক্ষা-দীক্ষা থেকে তাক্বওয়া, সৎচরিত্র, দ্বীনি জ্ঞানকে প্রাধান্য দিতে হবে।
(৯) সাধারণত ক্ষমতাসীন মূর্খ লোকেরাই নেককার লোকদের কবরের উপরে স্মৃতিসৌধ, মাযার বা মসজিদ নির্মান করে। অথচ ইসলামে এই কাজগুলো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ এটা নেককার লোকদেরকে পূজা করার মতো মারাত্মক ফেতনার দরজা উন্মুক্ত করে। এধরণের কাজ যারা করে, তাদের উপর আল্লাহর লানত বা অভিশম্পাত বর্ষিত হয়, যদিও তারা নেক উদ্দেশ্যে নিয়ে এটা করে থাকুক না কেনো। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ইয়াহুদী ও খ্রীস্টানদের উপরে আল্লাহ তাআ’লা লানত বর্ষণ করুন, কারণ তারা তাদের নবী ও অলীদের কবরগুলিকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।” ফাতহুল বারীঃ ১/৬৩৪।
(১০) বর্তমান যুগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিম নামধারী অনেক দেশের সরকার দেশের জনগণকে সরাসরি বা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মূর্তি, মাযার, সৌধ, মিনারের মতো ইট-পাথরকে সম্মান, শ্রদ্ধা জানানোর নামে আস্তে আস্তে সেইগুলোকে পূজা করানোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকে বিভিন্ন শিরক, বিদাত ও কবীরাহ গুনাহ ও বিজাতীয় মতবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য করছে। আমাদেরকে এমন পথভ্রষ্ট নেতা-নেত্রীদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, এবং তারা যেন জাতিকে পথভ্রষ্ট করতে না, সেইজন্য সজাগ থাকতে হবে। তাদের বিভ্রান্তিত ব্যপারে দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে জ্ঞানের আলো দিয়ে জাহেলিয়াতের অন্ধকারকে পরাজিত করতে হবে।
(১১) পূর্ববর্তী জাতির লোকদেকে ঈমান আনার কারণে অনেক কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এমনকি আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদেরকেও ইসলাম এর জন্যে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিলো। সেই তুলনায় আল্লাহ আমাদেরকে অনেক সহজতা ও নিরাপত্তা দিয়েছেন। এরজন্যে আমাদের আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত এবং এই নিরাপত্তাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামের জন্যে কাজ করা উচিত।
(১১) অনেক বলে কেয়ামতের পূর্বে আসহাবে কাহাফের লোকেরা ঘুম থেকে উঠে মানুষের কাছে আসবে। এধরণের কোন সহীহ হাদীস নেই। বরং তাফসীরের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে যে, আসহাবে কাহাফের লোকদের পরবর্তীতে গুহার ভেতরেই সাধারণ মৃত্যু হয়েছিলো।
সর্বশেষঃ আসহাবে কাহাফের লোকদের কথা আল-কুরআনে বর্ণিত ঘটনাগুলোর মাঝে অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ও খুবই হৃদয়গ্রাহী। এনিয়ে আসলে আরো অনেক কথাই বাকী রয়ে গেছে। আপনারা নির্ভরযোগ্য তাফসীরের গ্রন্থগুলোতে ও আলেমদের ওয়াজ-লেকচার থেকে আরো অনেক বেশি জানতে পারবেন, যা আপনাদের ঈমান মজবুত করবে এবং দ্বীনের ব্যপারে ইস্তিকামাহ (দৃঢ়তা) দান করবে। এনিয়ে অনেক মিথ্যা, বানোয়াট সংবাদ, ভিডিও বা ছবি ইন্টারনেটে প্রচলিত আছে, আপনারা যাচাই-বাছাই ছাড়া এধরণের মিথ্যা প্রচার-প্রোপাগান্ডা বিশ্বাস করবেন না। যারা কষ্ট করে পুরো লেখাটা পড়েছেন, আমি দুয়া করি এরজন্যে আল্লাহ আপনাদেরকে সওয়াব দান করুন এবং আপনাদেরকে সফলতা দান করুন, আমিন।
____________________
"সূরা কাহাফ ও মজার বিজ্ঞান"
মাঝহারুল ইসলাম
|১|
সূরা কাহাফ নাযিল হয় মক্কার মুশরিকরা যখন নাযার ইবনে হারিস ও উকবা ইবনে মুঈতকে মদীনার ইহুদী আলেমদের নিকট প্রেরন করে রাসুলুল্লাহ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সত্যতা জানার জন্যে। মদীনার ইহুদী আলেমদের করা প্রশ্নগুলার মাঝে একটি প্রশ্ন ছিল - “পূর্ব যুগে যেসব যুবকেরা বেড়িয়ে গিয়েছিল তাদের ঘটনা বর্ণনা করুন”
মহান আল্লাহ ইহুদীদের জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে ঘটনাটি এমন ভাবে বর্ননা করেন, যতটা না মদীনার ইহুদী আলেমরা জানতো।
ঘটনাটি একই সাথে বিস্ময়কর ও ইন্টারেস্টিং। গুহাবাসী যুবকেরা গুহায় কিভাবে ঘুমিয়ে ছিল তা বর্ননা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, “ তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত। আমি তাদের প্বার্শ পরিবর্তন করাই ডান ও বাম দিকে।” (সূরা কাহাফ :১৮:১৮)
নিদ্রিত যুবকদের মহান আল্লাহর প্বার্শ পরিবর্তন করানোর প্রয়োজন কী? তাফসীর ইবনে কাসির- এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছে “মাটি যেনো খেয়ে না ফেলে এ জন্য তাদের প্বার্শ পরিবর্তন করাতে থাকে” (তবারী ১৭/৬২০)
|২|
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আয়াতটির ব্যাখ্যা কিভাবে করে আজ আমি সেটাই তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ।
আপনি যখন অনেক্ষন ধরে, একইভাবে বসে থাকবেন অথবা শুয়ে থাকবেন, তা আপনার পায়ের ডীপ ভেইন থ্রম্বোসিস (রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাধার) সম্ভবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিবে। এই ব্লাড ক্লট ( জমাট বাঁধা রক্ত) রক্তনালির মাধ্যমে ফুসফুসে গিয়ে পালমোনারি এম্বোলিজম করে, কখনো কখনো বা মস্তিষ্কে গিয়ে রক্তনালি বন্ধ করে দিয়ে ইসকেমিক স্ট্রোক (স্ট্রোকের একটি প্রকার) করে দেয়। যা আপনাকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিবে।
এমন সাধারণত হয় কোন সার্জারীর পর রুগীকে যখন দীর্ঘ বিশ্রাম দেওয়া হয়, দীর্ঘক্ষন বিমান ভ্রমন করা, প্যারালাইসিস কিংবা গর্ভবতী "মা"দের ক্ষেত্রে।
এসব ক্ষেত্রে ডাক্তার তাদের পরামর্শ হল, কিছুক্ষন পর পর প্বার্শ পরিবর্তন করে শুতে। কাউকে বিশেষ বিচানায় ঘুমাতে বলে, রাতে ঘুমানোর সময় "পা" কয়েক ইঞ্চি উপরের দিকে রেখে ঘুমাতে বলে। যাতে করে তাদের ডীপ ভেইন থ্রোম্বোসিস হয়ে কোন সমস্যা না হয়।
গুহাবাসী যুবকেরা গুহায় কত বছর ঘুমিয়েছিল? কুরআন হতে আমরা জানি “ তারা তাদের গুহায় ছিল তিনশো বছর আরো নয় বছর” (সূরা কাহাফ:১৮:২৫) একবার চিন্তা করুন তো, মহান আল্লাহ যদি তাদের প্বার্শ পরিবর্তন করে না দিতেন? তাহলে যুবকেরা পালমোনারি এম্বোলিজম, স্ট্রোক হয়ে মৃত্যু বরন করতেন না?
|৩|
পূর্বের আলেমরা এই আয়াতটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হয়তো কিছুটা হিমসিম খেতেন। কারন আয়াতের পিছনের মজার চিকিৎসা বিজ্ঞানটি তাদের জানা ছিল না। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারনে কিছুদিন পূর্বেও মানুষ যে সমস্ত তথ্য সম্পর্কে বিভ্রান্তিতে ছিল, জ্ঞান সাধনার ফলে তার অনেকটাই সত্যের আলোতে উদ্ভাসিত হচ্ছে।
সুবহানাল্লাহ, “অতপর আমরা আমাদের কোন নিয়ামত কে অস্বীকার করবো?”
“তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্যে দয়ার বিস্তার করবেন” (সূরা কাহাফ: ১৮: ১৬) হে প্রভু আমাদের সেই দয়ায় আচ্ছন্ন করে রাখুন, যেমটা করেছেন গুহাবাসী যুবকদের।
____________________
'শেষ সময়ে কাহাফে'
মোহাম্মদ তৌহা আকবর
শুন্য
নীচের এই ভাবনায় যদি কোন ভুল থাকে তার সবটুকুই আমার পক্ষ হতে, এবং সঠিক যা আছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহই সব জানেন, আমি নই। আমার এই ভয়ংকর দুঃসাহসকে আল্লাহ ক্ষমা করুন, এবং এই কাজের পেছনের নিয়্যাতটাকে কবুল করে নিন। আমাদের সবাইকে কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী চলার সামর্থ্য দিন, আর দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। প্রত্যেক পাঠকের কাছে অনুরোধ রইলো নিজে নিজে অবশ্যই এই ব্যাপারে পড়াশোনা করবেন, এবং এই ব্যাপারে যেসব স্কলারগণ গবেষণা করেছেন তাদের মতামত জেনে নিবেন।
সুরা কাহাফ।
৪টা মাত্র ঘটনা। মাত্র এই ৪টা ঘটনা দিয়েই আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন দাজ্জালের সময়ে (অর্থাৎ সম্ভবত বর্তমান সময়েই) আমাদের কী নিয়ে ভাবা উচিৎ, এবং কী করা উচিৎ!
এক
প্রথম ঘটনায় (আয়াত নং ৯-২৬) বুঝিয়ে দিয়েছেন ঈমান রক্ষার জন্যে দু’আ করতে হবে। দরকার হলে ঈমান রক্ষায় সব বস্তু ফেলে ছুঁড়ে চলে যেতে হবে দূরে কোথাও। সবার আগে ঈমান। এই ঈমান রক্ষায় সঙ্গী-সাথীর গুরুত্বও অপরিসীম। এমন বন্ধু-সাথী যারা বিশ্বাসে-কাজে নিজেরা সচেতন, সাথীর বিশ্বাস-কার্যে সাহায্য-স্মরণিকাতেও জাগ্রত। একা একা থাকার মাধ্যমে পরাজিত না হয়ে এইরকম আধ্যাত্মিকতায় সচেতন সাথীদের সঙ্গের মাধ্যমে অশুভ ঋণাত্মক শক্তির বিরুদ্ধে নিজ নিজ বিশ্বাস-কর্মের সংরক্ষণে সদা-তৎপর থাকা, একসাথে আল্লাহর আশ্রয় আর রাহমাত প্রার্থনা করে স্থান-সময়ের তথাকথিত বাস্তবতার বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন, এই হচ্ছে প্রথম ঘটনার শিক্ষা।
এছাড়াও সময় আপেক্ষিক (ফলে, স্থানও)! সময়ের স্রষ্টা যিনি, তিনি সময়ের আপক্ষিকতার কথা পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন এই ঘটনার মাধ্যমে আজ হতে আরো দেড় হাজার বছর আগে। আইনস্টাইনেরও প্রায় ১৩০০ বছর আগে।
এই ঘটনায় পরিস্কারভাবেই আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে একই বস্তু (যেমন, দাজ্জাল) অস্তিত্বে আসার পরেও সময়ের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় অবস্থান করা সম্ভব। এমনকি অনেক বিশাল সময় পার করার পরে আমাদের মাত্রায় আত্মপ্রকাশ করে আবার দেখা দেওয়াও সম্ভব। অর্থাৎ দাজ্জাল যদি এই মূহুর্তে অস্তিত্বে থেকে থাকে, আমাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে, তবু তাকে আমরা দেখবো না। কারণ সে রয়েছে সময়ের অন্য মাত্রায়, যেখানে তার একটা সময়কাল আমাদের এক হাজার সময়কালের সমান হতে পারে। যখন আমাদের এক দিন, তার একদিনের সমান হবে তখনই তাকে আমরা দেখবো। এর আগে নয়। [দাজ্জালের সময় সংক্রান্ত হাদীসসমূহের বিশ্লেষণ দ্রষ্টব্য]
দুই
দ্বিতীয় ঘটনায় (আয়াত নং ৩২-৪৪) আল্লাহ আমাদের সামনে এক ধনী আর এক গরীবের কথোপকথনের মাধ্যমে তাদের অন্তরের অবস্থাকে তুলে ধরেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন, সত্যিকারের সফলতা কোনটা আর আমাদের অন্তরটা কার মতো হওয়া উচিৎ।
উল্লেখ্য যে, ধনী ব্যক্তিটি (বর্তমান সমাজের মানুষগুলোর মতোই) নিজের ধন সম্পদ তথা বস্তু-সামগ্রীকেই সফলতা মনে করেছিলো, নিজেকে সফল মনে করেছিলো। পরবর্তীতে সে সব কিছু হারায়, সব ধ্বংস হয়ে যায়। আমাদেরও তাই এখুনি সাবধান হওয়া উচিৎ। দাজ্জালের দেখানো সফলতা থেকে মুখ ঘুরিয়ে সত্যিকারের সফলতাকে চিনে নেয়া উচিৎ। সেইভাবেই জীবন যাপন করা উচিৎ। নচেৎ পরিণতি হবে ধনী মানুষটার মতোই ভয়ংকর।
খেয়াল করলে দেখবো, ধনী ব্যক্তিটি মুখে আল্লাহকে প্রতিপালক বললেও তার অন্তরে প্রতিপালক হিসেবে স্থান ছিলো নিজের ধন-সম্পদ আর বস্তুসামগ্রীর জন্য (যেমন, বাগান)। সে কিন্তু মূর্তি পূজা করতো না সরাসরি, অথচ খুঁটিয়ে ভাবলেই ধরতে পারবো যে তার চরম ভালবাসা, আনুগত্য, আগ্রহ আর পরম মনোযোগের জায়গাটা ছিলো বস্তুর (তথা বাগানের) জন্য, যা কিনা কেবলই ইলাহের জন্য হওয়ার কথা! মুখে ইলাহ আর প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহর কথা বললেও তার অন্তরে কিন্তু ইলাহের জায়গায় স্রষ্টার স্থান ছিলো না, ছিলো সৃষ্টির। আল্লাহ শাস্তি হিসেবে তার বাগান ধ্বংস করে দেয়ার পর তাই ৪২ নং আয়াতের শেষাংশে তার মন্তব্য পড়লে অবাক হতেই হবে। ভাবনায় হাবুডুবু খেতে খেতে নিজেকেও এই প্রশ্নটা করলে ধরা খেয়ে যেতে হবে:
“আমি তাহলে আমার রাব্বের সাথে কী কী শরীক করি?”
ঘটনাটা বুঝলে, প্রশ্নটার উত্তর নিয়ে ভাবতে জানলে, করুণ আর ক্রমাগত পরীক্ষার এই সময়ে নিজের ঈমান-তাওহীদের ভঙ্গুর অগভীর আলোহীন বুঝ নিয়ে কান্নায়-আফসোসে ভেসে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। তবে এই ব্যাপারটা আসলে খুব বেশি মানুষ বুঝে হজম করতে পারবে না, এটাও একটা শঙ্কা!
“শেষ সময়ে মানুষ সকালে সন্ধ্যায় ঈমান হারা হবে, কিন্তু বুঝতেও পারবে না”- এই কথাটার মানে কি এখন কিছুটা হলেও ধরতে পারছি আমরা? অন্তত নিজের অজ্ঞতাকে চেনার মাধ্যমে হলেও? আমি কি সত্যিই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবো যে ঈমান কী জিনিস, তাওহীদ কী জিনিস তা আমি ঠিকঠাক বুঝে নিয়েছি গভীরভাবে, যেভাবে প্রথম প্রজন্মের মানুষগুলো বুঝে নিয়েছিলেন?
তিন
তিন নং ঘটনাটা (আয়াত নং ৬০-৮২) নবী মুসা (আ) এর সাথে একজন প্রজ্ঞাবান জ্ঞানী ব্যক্তির কথোপকথন নিয়ে। মুসা (আ) নিজের বাহ্যিক জ্ঞান আর দৃষ্টি দিয়েই সবকিছু বিচার করতেন। এবং ভাবতেন তিনি অনেক জ্ঞানী। তাই উনার ভুল ভাঙ্গাতে উনাকে এক জ্ঞানী ব্যক্তির সাথে আল্লাহ দেখা করতে বলেন। সেই প্রজ্ঞাবান জ্ঞানী ব্যক্তি যাই করেন, মুসা (আ) এর কাছে বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাই ভুল মনে হয়। শেষে জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের কাজগুলোর ব্যাখ্যা মুসাকে (আ) বুঝিয়ে বলেন। হতভম্ব মুসা (আ) বুঝতে পারেন বাহ্যিক জ্ঞানের পাশাপাশি অন্তর্জ্ঞান না থাকলে ভ্রান্তি আর সত্যের ফারাক বুঝা যায় না কখনোই।
এই ঘটনার সাথে দাজ্জালের সম্পর্কটা কী? আল্লাহ এর মাধ্যমে আমাদের বুঝিয়ে দিলেন দাজ্জালের সময়ে মানুষ শুধু বাহ্যিক জ্ঞানকেই অর্থাৎ চর্মচক্ষুর পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক বস্তুবাদী জ্ঞানকেই শুধু মূল্যায়ন করবে, আর অন্তর্চক্ষুর অন্ধত্বের ফলে অন্তর্জ্ঞানহীন হয়ে গিয়ে অন্ধ আর দাজ্জালের মতোই এক চোখা (ম্যাটেরিয়ালিস্টিক) হয়ে যাবে। সত্য মিথ্যা আলাদা করতে পারবে না। তাই অন্তর্জ্ঞান থাকাটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সবচাইতে সরাসরি বিশুদ্ধ জ্ঞানের উৎসে (তথা আল-কুরআনে) ফিরে যাওয়া, নিজের ঈমান রক্ষার জন্যে, খাঁটিটা চেনার জন্যে।
চার
সর্বশেষ, অর্থাৎ চতুর্থ ঘটনায় (আয়াত নং ৮৩-৯৯) যুলকারনাইনের ঘটনা বর্ণিত আছে। আল্লাহর আদেশে যুলকারনাইন ইয়াজুজ মাজুজ নামক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী আর ভয়ংকর এক জাতিকে বিশাল এক দেয়াল তৈরী করে, সেই দেয়াল দিয়ে ঘিরে বন্দী করে ফেলেছিলেন। এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছিলেন, “এ আমার রবের অনুগ্রহ। কিন্তু যখন আমার রবের প্রতিশ্রুতির নির্দিষ্ট সময় আসবে তখন তিনি একে ধুলিস্মাৎ করে দেবেন আর আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য।” (আয়াত নং ৯৮)
শেষ সময়ে একটা ভয়ংকর জাতির আবির্ভাব ঘটার বিশদ বর্ণণা আমরা হাদীসে পাই যারা পুরো পৃথিবীতে যুদ্ধ, রক্ত আর অশান্তির বন্যা বইয়ে দেবে। মারা যাবে অসংখ্য নিরাপরাধ প্রাণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে গণণা শুরু করলে বর্তমান পর্যন্ত চালু থাকা সেই ধ্বংসযজ্ঞ পর্যবেক্ষণ করলে ভবিষ্যত ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে হালকা-পাতলা কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
শেষকথা
দাজ্জালের সাথে সম্পর্কিত হাদীসগুলো এবং সুরা কাহাফ উপমা আর বাস্তবতার মিশেলে পরিপূর্ণ। ম্যাটেরিয়ালিস্টিক সেক্যুলার পড়াশোনা, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির অগভীর জ্ঞানচর্চা এবং মিডিয়া আমাদেরকে শুধু বাহ্যিক চামড়ার চোখেই দেখতে শিখিয়েছে। আমরা গভীরভাবে ভাবতে ভুলে গেছি। ভুলে গেছি বলছি কেন, শিখতেই তো যাইনি কখনো, ঠিক না? জানিইতো না যে গভীরভাবে দেখা, ভাবা বলতে আসলে কী বুঝায়? অন্ধ হয়ে গেছে আমাদের অন্তর্জ্ঞানের চোখ। এক চোখা (যে নিজে শুধুই ম্যাটেরিয়ালিস্টিক চোখে দেখে এবং অন্যকেও সেইভাবেই দেখতে শেখায় সেই) দাজ্জালের সাথে আমাদের আজ তাই ভয়াবহ মিল।
বাঁচতে হলে আমাদেরকে ফিরে আসতে হবে গুহাবাসীদের মতোই, দলেবলে পালিয়ে আশ্রয় নিতে হবে আল্লাহর কাছেই। সেটাই সুরা কাহাফে আল্লাহ শিখিয়ে দিয়েছেন।
বলে দিয়েছেন, বাঁচতে হলে, সফল হতে হলে কর্ম করতে হবে, জীবনটাকে যাপন করতে হবে, দেখতে শিখতে হবে, ভাবতে-বুঝতে হবে আল-কুরআনের বর্ণিত পথেই। ফিরতে হবে আল-কুরআনের দিকেই। এরই ইঙ্গিত আছে এই সুরার একদম শুরুতে এবং সবার শেষে (আয়াত নং ১-৮ এবং ১০৩-১১০)।
এইবার সুরা কাহাফ বুঝে পড়ুন। অর্থ সহ পড়ুন। প্লিজ। প্রতি জুমায় হলেও নিজে পড়ুন, অন্যকেও পড়তে দিন।
অন্যকেও বাঁচার সুযোগ করে দিন। নিজে বাঁচুন।
আসুন মন থেকে পরিপূর্ণ তাওবা করে আল্লাহর কাছে এখুনই ফিরে যাই, তাঁর কাছেই নিজেকে সঁপে দিয়ে সাহায্য কামনা করি।
আজ হতেই।
____________________
সুরা কাহাফ এর প্রথম দশ আয়াত যারা মুখস্থ করতে চান তাদের জন্য :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=900358500471126&id=476371559536491
আরবী অবশ্যই অবশ্যই কুরআন থেকে মিলিয়ে পড়বেন। এটা শুধু মুখস্থ করার স্বার্থে তৈরী। তাই আরবী ছাড়া খালি উচ্চারন দেখে মুখস্থ করবেন না। আরবী দেখে উচ্চারন মিলিয়ে পড়বেন।
#শেয়ার_করুন
©সিরাতল মুস্তাকিম

No comments:
Post a Comment