সর্বোত্তম কাহিনী
=> আল্লাহ তাআ’লা ক্বুরআনুল কারীমে অতীত যুগের ২৫-জন নবী ও রাসুলের ঘটনা আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি শান্তি ও দয়া অবতীর্ণ করুন। এছাড়াও আল্লাহ তাআ’লা ক্বুরআনে পূর্ব যুগের বিভিন্ন জাতির লোকদের এবং তাঁর কিছু নেক বান্দাদের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। এই কাহিনীগুলো আল্লাহ তাআ’লা এমনি এমনি নাযিল করেন নি, বরং এই কাহিনীগুলো বর্ণনা করার বিশেষ উদ্দেশ্যে রয়েছে। আর তা হচ্ছে, এই সমস্ত কাহিনী এবং ঘটনাগুলোর মাঝে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।
_______________________________
আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
لَقَدْ كَانَ فِى قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِّأُولِى الْأَلْبٰب
অর্থঃ নিশ্চয়ই তাদের কাহিনীগুলোতে বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। সুরা ইউসুফঃ ১১১।
সেইজন্য আমাদের উচিত ক্বুরআনুল কারীমে বর্ণিত কাহিনীগুলো পড়া, এইগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং এইগুলো থেকে শিক্ষা বা উপদেশ গ্রহণ করা।
_______________________________
=> ক্বুরআনে বর্ণিত কাহিনীগুলো জানার মধ্যে আমাদের জন্য যেই উপকার রয়েছেঃ
(১) এই কাহিনীগুলো সম্পর্কে ক্বুরআনের আয়াত এবং হাদীসের বাণী জানার মাধ্যমে আমাদের ঈমান বৃদ্ধি পাবে।
(২) নবী ও রাসুলদের জীবনীতে কঠিন সময়েও ঈমানের উপরে টিকে থাকার জন্য, পাপ কাজ বর্জন করে নেক কাজে উৎসাহী হওয়ার মতো অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়।
(৩) এই কাহিনীগুলো জানার মাধ্যমে আমাদের গল্প বা কাহিনী শোনার তৃষ্ণা নিবারণ হবে।
(৪) এই কাহিনীগুলো জানার মাধ্যমে আমরা পূর্ব যুগের ইতিহাস জানতে পারবো।
_______________________________
=> আল্লাহ তাআ’লা ক্বুরআনে যতগুলো কাহিনী বর্ণনা করেছেন, তার মাঝে ইউসুফ আ’লাইহিস সাল্লামের কাহিনীকে তিনি ‘আহসানুল ক্বাসাস’ বা সবচাইতে উত্তম কাহিনী বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আল্লাহ তাআ’লার বাণীঃ
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَآ أَوْحَيْنَآ إِلَيْكَ هٰذَا الْقُرْءَانَ وَإِن كُنتَ مِن قَبْلِهِۦ لَمِنَ الْغٰفِلِين
অর্থঃ (হে নবী!) আমি আপনার কাছে সবচাইতে উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি, ওয়াহী (নাযিল করার) মাধ্যমে আপনার কাছে এই ক্বরআন প্রেরণ করে; যদিও ইতিঃপূর্বে আপনি (এই কাহিনী সম্পর্কে) অনবহিত লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সুরা ইউসুফঃ ৩।
=> আল্লাহ তাআ’লা সুরা ইউসুফকে কেনো সবচাইতে উত্তম কাহিনী বলেছেন?
এ সম্পর্কে ইমাম আশ-শওকানী রহি’মাহুল্লাহ বলেছেন, “(সুরা ইউসুফে বর্ণিত) কাহিনীকে সবচাইতে উত্তম কাহিনী বলার কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন মত বর্ণিত হয়েছে। কারও কারও মতে, কারণ সুরা ইউসুফে রয়েছে শিক্ষা, উপদেশ, হিকমত বা প্রজ্ঞা যা অন্য কোন কাহিনীতে নেই।
কারও কারও মতে, কারণ সুরা ইউসুফে রয়েছে উত্তম কথোপকথন, ইউসুফ আ’লাইহিস সাল্লামের উপর তাঁর ভাইদের অত্যাচারের বিপরীতে সবর ও তাদেরকে ক্ষমার বর্ণনা।
কারও কারও মতে, কারণ এতে রয়েছে নবীদের কথা, সৎ লোকদের কথা, ফেরশতাদের কথা, শয়তানের কথা, জিন, মানুষ, জন্তু জানোয়ার, পাখি, রাজা-বাদশাহদের চরিত, ব্যাবসায়ী, আলেম, জাহেল, পুরুষ, মহিলাদের কথা। মহিলাদের বাহানা ও তাদের ষড়যন্ত্রের কথা।” ফাতহুল ক্বাদীর।
এছাড়াও অন্য নবীদের কাহিনীগুলোর তুলনায় ইউসুফ আ’লাইহি ওয়া সালামের কাহিনীর বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা নিন্মে উল্লেখ করা হলো।
_______________________________
প্রথমতঃ নবীগণের মধ্যে ইউসুফ আ’লাইহিস সাল্লাম হচ্ছেন একমাত্র নবী, যার সম্পূর্ণ জীবন বৃত্তান্ত একটিমাত্র সুরাতে ধারাবাহিকভাবে একটি কাহিনী আকারে বর্ণিত হয়েছে। সুরা ইউসুফের ১১১-টি আয়াতের মধ্যে ৩-১০১ নং আয়াত পর্যন্ত ইউসুফ আ’লাইহিস সাল্লামের জীবন বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইউসুফ আ’লাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেছেন, “নিশ্চয়ই মর্যাদাবান মানুষের পুত্র মর্যাদাবান, তাঁর পুত্র মর্যাদাবান, তাঁর পুত্র মর্যাদাবান। আর তাঁরা হচ্ছেন ইবরাহীমের পুত্র ইসহাক, তাঁর পুত্র ইয়া’কূব ও তাঁর পুত্র ইউসুফ।” সহীহ বুখারীঃ ৩৩৮২।
আল্লাহ তাআ’লা নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে সবচাইতে উত্তম কাহিনী শুনাবেন বলে ইউসুফ আ’লাইহি ওয়া সালামের কাহিনী বর্ণনা শুরু করেছেন। উক্ত নবীর ঘটনাবলী একত্রে সাজিয়ে একটি সুরাতে সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে বিধায় সম্ভবতঃ একারণে একে (اَحْسَنَ لْقَصَصِ) ‘সবচাইতে উত্তম কাহিনী’ বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়তঃ এর মধ্যে অতীত ইতিহাসের বাস্তব বর্ণনা এবং হিংসা ও শত্রুতার পরিণতি, আল্লাহ তাআ’লার সাহায্যের অকল্পনীয় পদ্ধতি, অপরাধ প্রবণ অন্তরের পাপাচারের কুফল এবং মানুষের জীবনের বিভিন্ন অবস্থার সুন্দর বর্ণনা ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয়তঃ অন্যান্য নবীদের কাহিনীতে প্রধানত উম্মতের অবাধ্যতা ও পরিণামে তাদের ওপর আপতিত গযবের কাহিনী এবং অন্যান্য উপদেশ ও হেকমতসমূহ প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু ইউসুফ আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কাহিনীতে রয়েছে দুনিয়ার তিক্ত বাস্তবতা, অপরাধমুক্ত জীবন পরিচালনা এবং আল্লাহ তাআ’লার প্রতি দৃঢ় আস্থার এক অতুলনীয় অনুপম উদ্দীপনা।
_______________________________
=> সুরা ইউসুফ নাযিল হওয়ার শানে নুযূলঃ
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আ’নহু সুরা ইউসুফের ৩-নং আয়াতের তাফসীরে বলেন, “আল্লাহ তাঁর রাসুলের উপর অনেকদিন থেকে বিভিন্ন আয়াত নাযিল করছিলেন। এমন অবস্থায় একদিন সাহাবারা বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আপনি যদি আমাদেরকে কোন একটি কাহিনী শোনাতেন।” তখন আল্লাহ তাআ’লা এই আয়াত নাযিল করেন এবং ইউসুফ আ’লাইহিস সালামের কাহিনী শোনান।” ইতহাফ আল খিয়ারাহঃ ১/২৩৮, ১৬২ মুস্তাদরাক আল-হাকিমঃ ২/৩৪৫, ইবনে হিব্বান আল-ইহসানঃ ৬২০৯, দিয়া আল মাকদেসীঃ আল-মুখতারাহঃ ১০৬৯।
_______________________________
#শেয়ার_করুন
©সিরাতল মুস্তাকিম

No comments:
Post a Comment